পরিস্থিতি বিশ্বশান্তির অনুকূল নয়

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:০৮

রায়হান আহমেদ তপাদার

সুন্দর ও মানবিক জীবনযাপনের জন্য শান্তি মানুষকে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে অদৃশ্যভাবে প্রেরণা জোগায়। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেসব মৌলিক বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার তন্মধ্যে শান্তি অন্যতম। বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির এ যুগে সভ্যতার ক্রমসম্প্রসারণ ও মানুষের দর্শন-মনন-প্রজ্ঞার অপরিসীম বিস্তৃতি ঘটেছে বিপুলভাবে। পাশাপাশি মানুষে মানুষে হিংসা, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, অভাবনীয় স্খলন-পতন-বিভেদ-বিদ্বেষ-বিপর্যয়-বীভৎস কার্যকলাপ ইত্যাদি তামসিক উল্লাস প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত করছে শুভচেতনা, নৈতিক মূল্যবোধ।

মানুষ আজ দিশাহারা। এমনই এক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমরা শঙ্কায় অতিক্রম করছি জীবনের প্রতিটা ক্ষণ। প্রতিটি দিনকে মনে হয় ভয়ংকরতম দিন। এমন আতঙ্ক ও সংকট যেন আগে কখনো প্রত্যক্ষ করিনি। প্রতিদিন মনে হয়, জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষা-সভ্যতার অস্তিত্ব বোধহয় শেষ কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। ক্রমে নিষ্ঠুরতম অমানবিক কর্মকাণ্ডে মানবজাতি বেশি পরিমাণে উৎসাহী হয়ে পড়েছে। রক্তলোলুপ জিঘাংসু বাহিনীর বর্বরোচিত সন্ত্রাস-প্রতিসন্ত্রাসে সভ্যতার শরীরজুড়ে রক্তের আল্পনা।

প্রশ্ন জাগে মনে, আমরা কোন সভ্যতায় বসবাস করছি। একবিংশ শতকে আমরা কী এ আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সভ্যতার কাছে চরম নৃশংসতা প্রত্যাশা করেছি। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও যুদ্ধ, সংঘর্ষ বা রক্তপাত হচ্ছেই। বলা যায় এটাই এখনো বিশ্বের বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার মধ্যেই আরো একটি বিশ্ব শান্তি দিবস পালিত হলো।

কিছুকাল আগে ম্যানহাটনের এক সুধী সমাবেশে নোবেল বিজয়ী জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাস এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। গ্রাসের এই বক্তৃতাটি সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ‘টিন ড্রাম’ আর ‘ডগ ইয়ার্সের’ লেখক সে দিন তীক্ষ্ম ভাষায় একটি কথাই বারবার বলেছিলেন ‘যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়’। গ্রাস নাৎসি জার্মানির নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়েছিলেন। ইরাক যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বিশ্বে নতুন করে যে উদ্বাস্তু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তার রূপ ভয়াবহ। এই বাস্তবতার কথা মনে রাখলে বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা সুদূর পরাহতই থেকে যাবে। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শান্তির ললিত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস’। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি সেখানে শান্তি ও মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরস বলেছেন শান্তির জন্য মানবাধিকার অপরিহার্য। জাতিসংঘ মহাসচিব গত বিশ্ব শান্তি দিবসে তার বাণীতে বলেছেন, আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসে আমি যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে এবং সবার জন্য মানবাধিকার রক্ষায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাই। খাদ্য সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠার পথে বড়ো প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অশিক্ষা-কুসংস্কার দূর করা না গেলে শান্তি আসবে না। শান্তির জন্য প্রয়োজন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। আশা করা হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের যুগের অবসানের পর বিশ্বে শান্তির প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। বাস্তবে তা হয়নি।

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা সারা বিশ্বের জনগণকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রথমত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা অচিরেই সমাধান না করলে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বড় ধরনের সংকট হয়ে দেখা দিতে পারে। বিশ্বের প্রথম পাঁচ শক্তির মধ্যে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অবিলম্বে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে বসে চলতি জাতিসংঘ অধিবেশনে এর সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন। মিয়ানমার যেভাবে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লংঘন করে যাচ্ছে বিশ্ব নেতারা তাদের সতর্ক করে দিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সসম্মানে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্বসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয় ভারতের জম্মু-কাশ্মীর সম্যাসার পাশাপাশি আসামের নাগরিক সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। যদিও ভারত সরকার বলছে, এটি তাদের দেশীয় অভ্যন্তরীণ বিষয়। এরপরেও এ বিষয়টি বিশ্ব নেতাদের দেখা উচিত। এছাড়াও ফিলিস্তিনি সমস্যা, হংকং সমস্যাসহ বিশ্বের যত সমস্যা আছে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে সব সমস্যার সমাধান হলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শান্তি পাবে। শান্তির জন্য মানুষের আকুলতা চিরন্তর। খাদ্যের পরই মানুষের প্রধান অন্বেষা শান্তি। ধন, মান, সম্পদ যত কিছুই থাক শান্তি মানুষের চিরকালীন প্রার্থনা। শান্তি ছাড়া কি ব্যক্তি জীবন, কি সমাজ জীবন দুইই মূল্যহীন। মানুষ যা কিছুই করে, যা কিছুই চায় সব এই শান্তির জন্যই।

জীবনে শান্তি কত মূল্যবান তা বোঝা যায় জীবনে শান্তি যখন দুর্লভ হয়ে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর রাশিয়া তথা পূর্ব ইউরোপের লাখ লাখ মানুষ যখন অস্থির ও দিশাহারা, অসংখ্য মানুষ যখন অড্রিয়াটিক সাগর পার হয়ে পশ্চিমের দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে, যখন কিছুই আর কোথাও চলছে না, অরাজকতা, নৈরাজ্য, অপরাধ গ্রাস করছে সমাজ জীবন তখন রাশিয়ার কোনো এক বিপন্ন বিধ্বস্ত মানুষ এই বলে দুঃখ করছিলেন যে, আগে সুখ না থাকলেও শান্তি ছিল, এখন সুখ নেই শান্তিও নেই। অর্থাৎ শান্তি না থাকলে সুখও নিরর্থক হয়ে যায়। আরো আগে বিশ শতকের ষাটের দশকে কিউবা সংকটের সেই বিপর্যয়কর দিনগুলোতে সারা পৃথিবী যখন টানটান উত্তেজনা আর অস্থিরতার মধ্যে তখন কেন্ধুনডি ও ক্রশ্চেভের কাছে বার্ট্রান্ড রাসেল বিশ্বে শান্তি কত জরুরি একথা বলেই সেই ঐতিহাসিক তার বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গত শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত চলেছে স্নায়ুযুদ্ধ, সন্দেহ, অবিশ্বাস ও গানবোট ডিপ্লোম্যাসি। সেই সময়ই একজন বিখ্যাত সাংবাদিক বলেছিলেন যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পৃথিবীতে আরো একটি মহাযুদ্ধ বাধেনি ঠিকই কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পৃথিবী একটি দিনের জন্য যুদ্ধমুক্ত থাকেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর এককেন্দ্রিক বিশ^ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডাযুদ্ধের অবসান প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলে শক্তির ভারসাম্যের অভাবে দুনিয়াব্যাপী একক শক্তির প্রাধান্য ও দম্ভ। এই মনোভাব বিশ্ব শান্তির ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনেনি। বিশ্বে আবার নতুন সংঘর্ষ ও উত্তেজনা সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

ইউরোপে নতুন করে অস্ত্র মোতায়েনের বিরুদ্ধে মাত্র কিছুদিন আগেই কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে রাশিয়া। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এখনো বহু অন্তরায় বিদ্যমান। বর্তমান সিরিয়া সংকট একটি ভয়াবহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্য দিকে রাশিয়া এর বিরুদ্ধে সুচ্ছার হচ্ছে। তবে আশার কথা এই যে, পৃথিবীর মানুষ আজ আরো বেশি করে শান্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। রঁম্যা রঁলা, রাসেল, সর্বত্র বিশ্বে শান্তির জন্য যে ভূমিকা পালন করেছিলেন এখনো গুন্টারগ্রাসের মতো লেখক-বুদ্ধিজীবীরা সেই শান্তি প্রায়স অব্যাহত রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও অনেকবারই বিশ্ব শান্তির গুরুত্বের কথা বলেছেন। তিনি নিজে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির সমর্থক। বর্তমানে গান্ধীর জীবনদর্শন ও অহিংস নীতির প্রতি বিশ্বের মানুষের যে আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে তাকেও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রা রূপে অভিহিত করা যায়। এসব উদ্যোগ ও চিন্তা সত্ত্বেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পৃথিবী জোড়া এখনো অশান্তি, উত্তেজনা, সহিংসতা ও সংঘর্ষের চিত্রই প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। মানুষ যে শান্তিপূর্ণ বিশ্বের প্রত্যাশা করেছিল তা এখানো সুদূর পরাহতই রয়ে গেছে। হিংসা, হানাহানিই এখনো পৃথিবীর বাস্তবে। এই চিত্র অস্বীকার করার উপায় নেই। এজন্যই মনে হয় এত কিছুর পরও সেই আঁধার যেন গেল না। শান্তির পথে বাধা তো আরো অনেক আছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অপুষ্টি। এগুলোও শান্তির পথে কম বড় বাধা নয়।

পৃথিবীতে একদিকে প্রাচুর্য ও অপচয়, অন্যদিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করা না গেলে বিশ্বে শান্তির সুবাতাস প্রত্যাশা করা যায় না। এজন্যই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এত জরুরি। বিশ্বে নতুন করে খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার বাস্তবতায় কোটি কোটি মানুষের জীবনে আরো দুর্দশা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব শান্তির অনুকূল নয়। বিশ্ব শান্তির স্বার্থেই বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা পড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যে মানুষ খেতে পায় না, যে মানুষ অভুক্ত ও ক্ষুধার্ত তার শান্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু শান্তির আজ মানুষের প্রায় শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব শান্তি ছাড়া এই বিশ্ব সভ্যতাই অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। শান্তির কোনো বিকল্প নেই। প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব শান্তি দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রত্যেক দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করে। সারা বিশ্বের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে ২০১৯ সালের বিশ্ব শন্তি দিবস বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের সব মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করবে। কিন্তু শান্তির নামে অশান্তির বার্তা দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের পৃথিবী আগামীর ভবিষ্যৎ। সুতরাং পৃথিবীতে যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। সমাজের শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রত্যেক ধর্মেই সব ধরনের অস্ত্রবাজি, সন্ত্রাসী বোমা হামলা, সামরিক আগ্রাসন, জুলুম-নির্যাতন, অন্যের অনিষ্ট সাধন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও নরহত্যার বিরোধী। নিরীহ মানুষ হত্যাকে কোনো ধর্মই কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। পৃথিবীবাসীর স্বস্তি, শান্তি, কল্যাণ ও প্রগতিকে ত্বরান্বিত এবং নিশ্চিত করার স্বার্থে শান্তিবাদী আঙ্গিকের একটি শুভতর প্রবর্তনার বিষয়টি অবশ্যই মানবিক বিবেচনায় রাখার উদ্যোগ চাই। এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল