ব্রেক্সিট ঝড়ের কবলে বৃটিশ রাজনীতি

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৬

রায়হান আহমেদ তপাদার

একসময় রাজনীতিমনস্ক মানুষ বৃটেনের পার্লামেন্টকে ভালোভাবেই ফলো করতো, শিক্ষণীয় অনেক কিছু তাদের কাছ থেকে আহরণ করত। বৃটেনের পার্লামেন্ট বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছিল, দেশে দেশে গণতন্ত্রহীনতার সময়ে বৃটেনের পার্লামেন্ট দেখে তারা স্বস্তি পেত। কিন্তু এই বৃটেনের পার্লামেন্টেই এখন মানুষের হাসির খোরাক হচ্ছে। এবং বৃটেন দ্বিধাগ্রস্ত দেশের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। অস্থিরমতি শিশু যেভাবে কারণে অকারণে লাফিয়ে বেড়ায়, একদণ্ড স্থিরভাবে বসে না ঠিক তেমনি বৃটেনের সংসদের এমপিরা একমুহূর্তের জন্য স্বস্তি পাচ্ছেন না। এই মুহূর্তে যদি সংসদে দু’দণ্ড বসার সুযোগ পায়, পর মুহূর্তে দৌড় লাগাচ্ছে লবিতে ভোটের লাইনে দাঁড়ানোর জন্য। প্রতি ঘণ্টায় পর্দা নামছে নতুন পর্দা উঠছে কিন্তু ফলাফল শূন্য। ব্রেক্সিট চরকির মতো ঘুরছে, ঘুরছেই! ব্রেক্সিট কার্যকর প্রশ্নে একের পর এক পরাজয়ের মধ্যে হাইকোর্টের এ রায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য আরেকটি বড় আঘাত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।এ রায়ের ফলে ধারণা করা হচ্ছে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পুনরায় পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাক দিতে পারেন। ইতিমধ্যে আগামী ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত পার্লামেন্ট মুলতবি করা হয়েছে। অধিবেশন শুরু হলে নিয়ম অনুযায়ী রাণী ভাষণ দেবেন এবং এ ভাষণের উপর আলোচনা শুরু হবে।ফলে ব্রেক্সিট বাঁধাগ্রস্থ করতে বিরোধী এমপিরা তেমন বেশি সময় পাবেন না।এজন্যই মূলত বিরোধী দলগুলো সরকারী সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তবে এ রায়ের ফলে সরকারের অবস্থান আরও সঙ্গিন হয়ে পড়ল।

অপরদিকে বরিস জনসনের পার্লামেন্ট মুলতবির সিদ্ধান্তকে বেআইনী বলে ঘোষণা করেছে স্কটল্যান্ডের হাইকোর্ট। সর্বদলীয় রাজনীতিবিদদের দায়ের করা এ পিটিশনের উপর শুনানী শেষে তিন সদস্যের বিচারক দল এ রায় দেন। আদালত বলেছে, ব্রেক্সিট বিষয়ে পার্লামেন্টের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা বাঁধাগ্রস্থ করতে প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী রাণীকে ভুল বুঝিয়েছেন। সরকার এ বিষয়ে সুপ্রীম কোর্টে আপীল করবে বলে জানিয়েছে।এ রায় গত সপ্তাহে সরকারের পক্ষে যাওয়া রায়কে খারিজ করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে সেশন কোর্ট পার্লামেন্ট মুলতবির সরকারের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে রায় দিয়েছিল। শ্যাডো ব্রেক্সিট সেক্রেটারী স্যার কেয়ার স্টারমার বলেছেন, জনগণ বরিস জনসনকে বিশ্বাস করেনা।এখন কোর্ট যেহেতু তার সিদ্ধান্তকে বেআইনী ঘোষণা করেছে, এটি অত্যন্ত শক্তিশালী। সাবেক এটর্নি জেনারেল বর্তমানে স্বতন্ত্র এমপি ডমিনিক গ্রিভ মনে করেন রাণীকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের দ্রুত পদত্যাগ করা উচিত। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্টিট থেকে বলা হয়েছে, এ রায় অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে আপীল করা হবে। পার্লামেন্ট মুলতবি করা আইন সম্মত।আগামী সোমবার সুপ্রীম কোর্টে এ রায়ে বিরুদ্ধে শুনানীর দিন ধার্য করা হয়েছে।৭০ জন এমপি এবং লর্ড সভার সদস্য স্কটল্যান্ড হাইকোর্টে এ পিটিশন দায়ের করেছিলেন। তাদের মুখপাত্র স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিও এমপি জোয়ানা চেরী আশা করছেন সরকার দ্রুতই পার্লামেন্ট অধিবেশন আহবান করবে। 

অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজিওন এই রায়কে সাংবিধানিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর আচরণ ভয়ানক, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং সাংবিধানিক নিয়ম-কানুনের চরম লঙ্ঘন। বৃটেনের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আপাতত চুপ আছে, তারাও যে ভীতির মধ্যে নেই এটা বলা যাবে না। বৃটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বৃহৎ পার্টনার ছিল, বৃটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগ করলে ইউনিয়ন অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে যাবে। ইসি কোনোভাবেই এটা চাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত যদি বৃটেন চলে যায় তবু একটা ভালো সম্পর্ক যেন বজায় থাকে ইসি সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে। অন্যান্য ২৭ টি দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে যতটুকু সম্ভব সুযোগ-সুবিধা বৃটেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দিতে চাচ্ছে। বৃটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ভালোগুলো নিতে চাচ্ছে মন্দের সহযোগী হতে চাচ্ছে না। শুধু ভালো সুযোগ-সুবিধা নিবে মন্দের ধারভার নেবে না এরকম কোন চুক্তিতে আসা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্য অসম্ভব, তাই সমঝোতা চুক্তি হচ্ছে না। থেরেসা মে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যে চুক্তি করেছিল এতে বিরোধী দল খুশি না, তারা ইসির সাথে আরো গভীর সম্পর্কে বিশ্বাসী। থেরেসা মের দলের অনেকেই বরিস জনসন সহ ইসির সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে রাজি না তাই ওই চোখ দিয়ে আলোর মুখ দেখেনি এবং থেরেসা মে কে সরে যেতে হয়েছে। বৃটেন ব্রেক্সিট নিয়ে গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেছে, না গিলতে পারছে না পারছে উগলাতে। তিন বছর চলে গেছে তবু কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না। প্রতিদিন নতুন নতুন ঘটনার জন্ম হচ্ছে। 

এ পর্যন্ত দুজন প্রধানমন্ত্রী খেয়ে ফেলেছে ব্রেক্সিট।অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এই প্রধানমন্ত্রীও অচিরেই ব্রেক্সিটের বলি হয়ে যাবেন।আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ব্রেক্সিট হয়ে যাবে, তবে বরিস জনসন এর ব্রেক্সিট হবে না। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং বৃটেনের একসাথে না থাকলেও সহযোগী হিসাবে থেকে যাবে, বৃটেনের পার্লামেন্ট সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। কোন চুক্তি না হলে ৩১ অক্টোবর বৃটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে, যদিও এ সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ মনে হচ্ছে। চুক্তি ছাড়া চলে আসা বৃটেনের জন্য ক্ষতির হবে, দীর্ঘদিনের একটা সংসারে হঠাৎ বিচ্ছেদের ঝড় উঠলে যেভাবে কোনকিছু স্থির থাকে না বৃটেনের ক্ষেত্রেও তাই হবে। পুনরায় সুস্থির হতে অনেক দিন লেগে যাবে। বিচ্ছেদ প্রক্রিয়ার মধ্যে বৃটেনকে আগে আর পড়তে হয় নি, তাই বুঝে উঠতে পারছে না কিভাবে এগুবে কি করতে হবে। এই লেজেগোবরে অবস্থা সত্বর অন্ত হোক মানুষ আশ্বস্ত হোক, অনিশ্চয়তার যে কালোমেঘ বৃটেনের আকাশ ছেয়ে আছে তা দূরীভূত হোক। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এপর্যন্ত বৃটেনের দুজন প্রধানমন্ত্রী বধ করেছে, আরো দু’তিনজন বধ না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হবে না বলেই মনে হচ্ছে। বৃটেন গণতন্ত্রের দেশ, অতিরিক্ত গণতন্ত্র কেমন হতে পারে এরও উদাহরণ বর্তমান বৃটেন। ব্রেক্সিট বৃটেনকে চেপে ধরেছে, বৃটেন কিভাবে চাপমুক্ত হয় এটা একটা দেখার দৃশ্য হবে বৈকি। আপাতত বৃটেনের পার্লামেন্টে উচ্চচাপ যুক্ত নাটক অভিনীত হতে থাকুক! গণভোট যখন হয় ২০১৬ সালে তখনই বুঝা গিয়েছিল এ ইস্যু বিতর্কিত হবে কিন্তু বিতর্ক কোন পর্যায়ে যাবে এ নিয়ে কোন ধারণা ছিল না

বৃটেন বিভিন্ন বর্ণ ধর্ম এবং জাতির দেশ। হুট করে এটাকে বদলানো যাবেনা বদলানো উচিত না, আখেরে এর ফল ভালো হবে না।  শত বছরের উদারনৈতিক ঐতিহ্য রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব না, এমন প্রচেষ্টা যারা করবে তারাই বাতিল হিসেবে গণ্য হবে ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দেয়। বরিস জনসন এর পাঞ্জায় যতগুলো কার্ড ছিল একে একে খেলে যাচ্ছে তবু কোন এক্কাই কাজে লাগছে না। মরি কিম্বা বাঁচি ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগ করব, এমন ঘোষণা যে বুমেরাং হবে এমন আলামত দেখা যাচ্ছে। বরিস জনসনকে নিজের ফেলে দেয়া কথা নিজেকেই হজম করতে হবে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন নিয়ে হাজির হতে হবে। তরী পার যত সহজ হবে ভেবেছিল বৈঠা ঠেলতে গিয়ে এখন তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। সাঁতার না জানা লোক ভালভাবে বৈঠা খেলতে পারছে না, বিদ্বেষ বা খুব মনে রাখলে পার হওয়া যায়না বরিস জনসন এর উদাহরণ হতে পারে রাজনীতির গুটি খেলায় বরিস জনসন নির্বাচন চাচ্ছে, মনে করছে পপুলিস্ট এজেন্ডায় সে জিতে যাবে। বিরোধীদলও কম সেয়ানা নয়, তারা তাকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছাড়বে। সহজে ওয়াক ওভার বরিস জনসন পাবে না। নির্বাচন হয়তো হবে কিন্তু তার আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যে কোনো রকমের সমঝোতায় আসতে হবে। টালমাটাল ব্রিটিশ রাজনীতিতে মিনিটে মিনিটে নাটকীয়তা। কে ধারণা করেছিল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিন দফা পরাজয় ঘটবে একজন প্রধানমন্ত্রীর। নিজ দলে বিদ্রোহ নতুন কোন খবর নয়। কিন্তু আপন ভাই যখন দল ও মন্ত্রিত্ব ছেড়ে চলে যান তখন বিষয়টি আমলে না নিয়ে কোন উপায় নেই। ৪৪ দিন বয়সী প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন একের পর এক সংকটের মুখোমুখী। 

ব্রেক্সিট ইস্যু ব্রিটিশ রাজনীতিতে পালাবদল ঘটিয়ে চলেছে। দু’জন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিয়েছেন, নয়া নির্বাচনের দিকেও ঠেলছে পরিস্থিতি। ১৮ই অক্টোবর ভোট করতে চেয়েছিলেন বরিস জনসন। এমপিরা এতে সায় দেননি। বিশেষ করে বিরোধী নেতা জেরেমি করবিন বেঁকে বসেন। জনসন বলেছেন, এটা কাপুরুষতা। সারা বছর যেখানে আগাম নির্বাচনের কথা বলে সেখানে নির্বাচনের ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে কি আনন্দ রয়েছে। তার মতে এটা হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রতি অবমাননা। করবিন এর জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, কে বলেছে আমরা নির্বাচন চাই না। আমরা অবশ্যই নির্বাচন চাই। চুক্তিহীন ব্রেক্সিট ইস্যুটির ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন নয়। করবিন শুরুতে নির্বাচনের ব্যাপারে দোটানায় ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার করবিনকে স্মরণ করিয়ে দেন এই সময়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিলে মস্তবড় ভুল হবে। ১৫ই অক্টোবর নির্বাচনের মধ্যে বরিস জনসনের ভিন্ন কৌশল রয়েছে। এই যখন অবস্থা তখনই খবর এলো বরিস জনসনের ভাই জো জনসনের পদত্যাগ। মন্ত্রী এবং দল থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন। নয় বছর ধরে তিনি ৩ জন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রী ছিলেন। এক টুইট বার্তায় বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে পারিবারিক বিশ্বস্ততা ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে আমি চাপের মধ্যে ছিলাম।এটা আমার জন্য অসমাধানযোগ্য একটি উদ্বেগ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের যে প্রস্তাব ছিল তা পরাজিত হয়েছে বিরাট ভোটের ব্যবধানে। তাই ব্রিটেনের অন্যতম বিরোধী নেতা লিবারেল ডেমোক্রেটের উপনেতা এড ডেভি বলেছেন, জনসনকে বিশ্বাস করা যায় না। চুক্তিহীন ব্রেক্সিট যেন না ঘটে তা নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক ও কলামিস্ট
[email protected]