রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সাবধানি পদক্ষেপ চাই

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:১১

সম্পাদকীয়

ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। তবে বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে এসে আকাশভরা মেঘের কোনায় যেন আলো বিচ্যুরিত হতে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এবার হয়তো সূর্যের সঙ্গে দেখা হতে পারে। অনেক দেরিতে হলেও জাতিসংঘ বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে উঠেছে। ‘জেনোসাইড’ ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে)’ রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের বিচারের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের তদন্ত দল।

তদন্ত দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, জেনোসাইড প্রতিরোধবিষয়ক ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমার তার নিজ দেশে জেনোসাইড, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য গুরুতর দায় এড়াতে পারে না। এজন্য আইসিজেতে মিয়ানমারের বিচার হওয়া উচিত। গতকাল মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি উপস্থাপন হওয়ার কথা। বিষয়টি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের জন্য একটি সুসংবাদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে ধীরে চল নীতি গ্রহণ করায়, ধীরে ধীরে হলেও বিশ্ব সম্প্রদায় মিয়ানমারের অমানবিক আচরণের বিষয়টি অনুধাবণ করে আজ একটি ইতিবাচক সমাধানের কথা ভাবছে। আমরা আশা করতেই পারি, আগামীতে জাতিসংঘ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর মিয়ানমারে অবশিষ্ট আছে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা। সেই রোহিঙ্গারাও এখন মিয়ানমারে ধারাবাহিকভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। জেনোসাইডের ঝুঁকিতে রয়েছে। আর ওই ঝুঁকি বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরা অসম্ভব করে তুলেছে। গত বছর জাতিসংঘের এই তদন্ত দলই মিয়ানমারের শীর্ষ ছয় সামরিক কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) বিচারের সুপারিশ করেছিল। আইসিসি সাধারণত ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের বিচার করে থাকে। এখানে রাষ্ট্রের বিচারের সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের অপরাধের বিচারের সুযোগ রয়েছে আইসিজেতে। আর এবারই প্রথম জাতিসংঘ তদন্ত দল সেখানে মিয়ানমারের বিচারের সুপারিশ করল। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম দিকে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাও (ওআইসি) রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। গাম্বিয়ার নেতৃত্বে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

জাতিসংঘে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল রিপোর্টিয়ার ইয়াংহি লিও মিয়ানমারের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে মানবাধিকার পরিষদকে জানান, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত বলে দাবি করলেও বাস্তবে কিছুই করেনি। রাখাইনে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো রোহিঙ্গা যদি ফিরতেও চায়; তবে তারা কী ভরসায় তারা ফিরবে! এ প্রশ্নও রাখেন তিনি। তবে ইয়াংহি লিও বক্তব্যের পর মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ বরাবরের মতো প্রত্যাখ্যান করে। ঠিক এ রকম এক পরিস্থিতিতে বলতে হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সময় এসেছে। এবং তারা তা নেবেন বলেই বিশ্বের মানবতাবাদী সব মানুষেরই প্রত্যাশা।

এদিকে চীন তার পূর্ব অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও ইতিবাচক ভূমিকায় এগিয়ে এসেছে। গত দুদিনে চীনের একটি প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মনোভাবের কথা জানতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে তারা তাদের সাধ্যমতো সব কিছুই করছেন এবং আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে। চীনের পূর্বের ভূমিকার কথা সবারই জানা। দেশটির চিন্তার এই পরিবর্তনের পেছনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের কথা না বললেই নয়। সরকারের ধীরে চলা নীতি এবং সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলের ফলাফলে চীন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কিছুটা হলেও এগিয়ে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আমরা আশাবাদী। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় শিগগিরই এ সমস্যার একটি ইতিবাচক সমাধান হবে। তবে বাংলাদেশকে আগের মতো আগামীতেও সাবধানি পদক্ষেপ নিতে হবে।

পিডিএসও/হেলাল