মশা দমনে প্রয়োজন টেকসই ব্যবস্থা

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৩০

ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া

মশা দমনে সরকার তথা কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলেও সফলতা আশানুরোপ নয়। দেশে বর্তমানে মশার নিয়ন্ত্রণ বা দমন পুরোটাই সিটি করপোরেশননির্ভর। আমরা সাধারণ মানুষ পুরোপুরি নির্ভর করছি সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের ওপর। মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বলতে আমরা সিটি করপোরেশনকেই বুঝি। তবে মশা দমনের বিষয়টা এই একক কর্তৃপক্ষ যেভাবে দেখছে বা সার্বিকভাবে যেভাবে দেখা হচ্ছে; তাতে সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভবপর হবে বলে মনে হয় না। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মশার নিয়ন্ত্রণ বা দমনকে সাধারণভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা দরকার। মশার উৎপাত বা ডেঙ্গু/চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়লে অন্যত্র এক্সপার্ট না খুঁজে নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। মশা দমন খাতে আমরা অনেক টাকা খরচ করছি, কিন্তু সুফল পাচ্ছি না। তাই মশা দমনের বিষয়টাকে আলাদা নজর দিয়ে দক্ষ লোকবলের সমন্বয়ে যুগোপযোগী, গবেষণাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা করা দরকার। এ ব্যাপারে মশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশে-বিদেশে যারা কাজ করেছেন তাদের অভিজ্ঞতা নিতে হবে। যে করেই হোক আমাদের প্রয়োজন একটি সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বর্তমানে আমাদের দমন কার্যক্রম প্রধানত কীটনাশক স্প্রেইং/ফগিং-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মতো বলা যায়। উল্লেখ্য যে, মশার কার্যকর দমনের জন্য বেশ কিছু বিষয় আগাম জানতে গবেষণা অতীব জরুরি। যেমন : এলাকাভিত্তিক মশার উপস্থিতি বা আধিক্য, মশার রেজিসটেন্স লেভেল, কীটনাশকের কার্যকারিতা ইত্যাদি। আর সেই জায়গাটাতেই আমরা কম গুরুত্ব দিচ্ছি। নির্ভর করছি অন্যন্য প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, স্বাস্থ্য অধিদফতর ইত্যাদি) ওপর। আমাদের মশা নিধন কার্যক্রম মোটেও গবেষণানির্ভর নয়। আবার দেশে মশা নিয়ে যতটুকু গবেষণা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগে এবং তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ফলে গবেষণালব্ধ তথ্য বাস্তবে কাজে লাগতে পারছি না। তাই আমরা কীটনাশক প্রয়োগ করছি, কিন্তু মশা কিছুতেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মনে রাখতে হবে, মশা নিয়ে নিয়মিত বা রুটিনমাফিক গবেষণা, সঠিক দমন পদ্ধতি (কীটনাশক বা জৈবনাশক) বাছাই ইত্যাদি ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যকরী ও টেকসই কোনো দিনই হবে না। তাই মশার সফল নিয়ন্ত্রণে কয়েকটা বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি।

১. আমাদের মশা নিয়ন্ত্রণ (অপারেশন) ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী তথা আধুনিক করতে হবে। মশার বায়োলজি এবং কীটনাশক সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ লোকের দ্বারা পরিচালিত করতে হবে। অপারেশন টিমকে বা টেকনেশিয়ানকে কীটনাশক প্রয়োগে যথাযথ ট্রেনিং দিতে হবে। কীটনাশকের (অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) সঠিক ব্যবহার বিধি জানতে হবে। ফগার মেশিন ছাড়াও নতুন নতুন মেশিন (ইউএলবি স্প্রেয়ার) যোগ করতে হবে। কীটনাশক বাছাইয়ে আরো সতর্ক হতে হবে। একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার পরিহার করতে হবে। প্রয়োগ তালিকায় নতুন ও কার্যকরী অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড যোগ করতে হবে। কীটনাশক যাতে কোনো ভেজাল না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কীটনাশকের ভুল প্রয়োগ/অতিপ্রয়োগ চলবে না। এতে মশারা প্রতিরোধী হয় বেশি। মনে রাখতে হবে, একই কীটনাশকের ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত বা ভুল ডোজে মশারা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠবেÑ এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে। এডিসসহ অন্যান্য মশা (কিউলেক্স, এনোফিলিস ইত্যাদি) শনাক্তকরণের পাশাপাশি টার্গেট ও নন- টার্গেটস প্রজাতির রক্ষারও ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেকটা গবেষণানির্ভর হতে হয়। ভেক্টর ম্যাপিং অর্থাৎ মশার স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রজনন কেন্দ্র, পরিণত মশার উপস্থিতি বা আধিক্য ইত্যাদি চিহ্নিত করতে হবে। কিছু বেসিক বিষয়ে গবেষণা যেমন : মশারা সত্যিই কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে কি না? কোন প্রজাতির মশা কোথায় কী পরিমাণ কীটনাশক প্রতিরোধী হয়েছে? কীটনাশকের রিকমেন্ডেড ডোজ পরীক্ষাকরণ ইত্যাদি সব সময় পরিচালনা করতে হবে। বিভিন্ন টার্গেট এরিয়ায় মশা কী পরিমাণ কীটনাশক প্রতিরোধী হয়েছে এবং এই প্রতিরোধের মাত্রা (রেজিসট্যান্স রেশিও) কেমন তা গবেষণার মাধ্যমে জানতে হবে। কোন কীটনাশক (অ্যাডাল্টিসাইড/লার্ভিসাইড) কোন মশা/লার্ভাকে সফলভাবে দমন করতে পারে, তা প্রথমে ল্যাব টেস্ট করে (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) পরবর্তীতে প্রয়োগ করতে হবে।

মশা দমনে গুরুত্বপূর্ণ একটা গবেষণার বিষয় হচ্ছেÑ মশার সার্ভিল্যান্স। এডিসসহ অন্যান্য মশার (অ্যাডাল্ট এবং লার্ভা) সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম নিয়মিত (সারা বছর) পরিচালনা করতে হবে এবং তা মনিটরিং করতে হবে। অভি ট্র্যাপ (ডিম সংগ্রহের জন্য) ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির মশার উপস্থিতি জানা যেতে পারে। বিভিন্ন এরিয়ায় জমানো পানিতে লার্ভার উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হোস্ট-সিকিং মশা (মানুষ বা প্রাণীদের কামড়ায়) ও এগলেইং মশা (ডিম পারা মশা) ধরার জন্য বিভিন্ন ট্র্যাপ (মশা ধরার ফাঁদ) যেমন : লাইট ট্র্যাপ, বিজি ট্র্যাপ, গ্রাভিড ট্র্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে কোনো এরিয়ায় কী কী প্রজাতির মশা রয়েছে, এদের আধিক্য কেমন, এমনকি কোথাও জীবাণুবাহী মশা আছে কি না (ভাইরাস সার্ভিল্যান্স) তাও জানা যাবে। জীবাণুবাহী মশা শনাক্তে আরবোভাইরাল টেস্ট করতে হবে। নিয়মিত সার্ভিল্যান্স করে কোথায় কোন প্রজাতির মশা আছে, তা জেনে নির্দিষ্ট কীটনাশক (ডোজসহ) প্রয়োগে সুপারিশ করতে হবে। কীটনাশক (অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) নির্বাচন করার আগে তা প্রথমে ল্যাব টেস্ট (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) করতে হবে।

৩. মশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে কীটনাশকের (অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) পাশাপশি জৈব প্রযুক্তিনির্ভর ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার (স্ত্রী মশার উর্বর ডিম উৎপাদন ব্যাহত করে) ব্যবহার কার্যকরী হয়ে উঠছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ম্যালেশিয়াসহ অনেক দেশে এর সফল কার্যক্রম চলছে। তাছাড়া বর্তমানে মেল স্টেরাইল টেকনিক (মশাদের মেটিং হবে কিন্তু ডিম উৎপাদন হবে না) পদ্ধতির সফল ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার মশক প্রিডেটরস যেমন : মশক মাছ (গাপ্পি, গ্যামবুসিয়া ইত্যাদি) ইত্যাদির বাণিজ্যিক ব্যবহার বিদেশে প্রচলিত আছে। আমাদের দেশেও এদের ব্যবহার পরীক্ষামূলকভাবে (ল্যাব রিসার্চ করে) চালু করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

৪. এডিস একটি ঘরোয়া মশা এরা বসতবাড়িতে বা এর আশপাশে বংশবিস্তার ও উড়তেই অভ্যস্ত। তাই ব্যক্তিগত প্রোটেকশন ও সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেককে এডিস মশা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখতে হবে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্তৃপক্ষের চেষ্টা জোরাল আছে বলা যায়। তাছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিজিট করে মশার প্রজাতি, মশার আক্রমণ, জীবন-চক্র, জীবাণু-রোগ সম্পর্কে অভিহিত করা যেতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে সচেতনতা সপ্তাহ, ওপেন ডে ইত্যাদি পালন করা যেতে পারে।

মনে রাখা প্রয়োজন, মশা বা মশাবাহিত রোগ শুধু আমাদের বাংলাদেশেই সমস্যা নয়, বিশ্বের অনেক দেশে (প্রায় ১২৫টি দেশ) এ সমস্যা বিরাজমান। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ এখন মারাত্মক ডেঙ্গুপ্রবণ। এডিস প্রজাতির মশা এই ডেঙ্গু-ভাইরাস ছড়ায়। দুই দশক ধরে এডিস মশা আমাদের জন্য সমস্যা হলেও এ বছরের প্রাদুর্ভাব সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগের মোকাবিলা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও প্রোটেকশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সফল ও টেকসই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। তাই এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক

[email protected]

পিডিএসও/রি.মা