কত দূরে সড়কে শৃঙ্খলা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৪৫

মাহমুদুল হক আনসারী

সড়ক-মহাসড়ক মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। কর্মময় জীবনে মানুষকে সড়কের সহযোগিতা নিতেই হবে। পরিবহন ছাড়া মানুষ এ যুগে অচল। কিন্তু কখন এ পরিবহন ও সড়ক নিরাপদ হবে; সে কথা কেউ বলতে পারছেন না। সড়ক ও পরিবহন যেভাবে প্রতিনিয়ত মূল্যবান প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, তাতে মনে হয় এ সেক্টর এখন একটি জ্যান্ত মরণফাঁদ। পরিবহন, ড্রাইভার আর হেলপারদের কোনোভাবেই শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদে লাখো-কোটি হৃদয় ছটফট করে। একটি জীবন মানে একটি পরিবার। একটি জীবনের জীবন প্রদীপ থেমে যাওয়া মানে একটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দেওয়া। সঙ্গে অন্ধকার জীবন আর কান্না ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

বাংলাদেশের মতো সড়কে এত জীবনহানি ও দুর্ঘটনা পৃথিবীর কোথাও ঘটে বলে তথ্য পাওয়া যায় না। জনসংখ্যায় আধিক্য এ দেশে মানুষের কর্মচাঞ্চল্য এবং জীবনের তাগাদায় সড়ক ও পরিবহন ছাড়া সচল রাখা সম্ভব নয়। এর মানে এই নয় যে, সড়কে নামলেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে; সে কথা কেউ মেনে নিতে পারছে না।

পরিবহন মালিক-শ্রমিক আর যাত্রী সবাই এ দেশের জনগণ। একে অপরের পরিপূরক। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল বিশাল সড়ক সংস্কার ও নির্মাণ হচ্ছে। সড়কে শৃঙ্খলার জন্য সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় রয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক-মালিকের সংগঠন রয়েছে দেখা যায়। বিআরটিএ রয়েছে, বৈধ-অবৈধ অনিয়ম আর ফিটনেস পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। কিন্তু এতগুলো সরকারি-বেসরকারি সংস্থা-সংগঠন থাকার পরও কোনোভাবেই সড়কের দুুর্ঘটনা থামানো যাচ্ছে না।

এ ক্ষেত্রে লিখিত আইন আছে, কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ মাঠে মিলছে না। ফলে দুর্ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলছে। চলতি মাসের এক সপ্তাহের দৈনিক হিসাবে ঈদযাত্রায় কর্মস্থলে ফেরত আসা মানুষের মৃত্যু হয়েছে ৫০ জনের বেশি। আহত হয়েছে শত শত। এটা যেন এ দেশের সড়ক পরিবহনে একটি নিয়মিত স্বভাব ও কালচার। দুর্ঘটনার ঘটনায় দেখা যায় ওভারটেক ও অদক্ষ চালক দ্বারা গাড়ি চালাতে গিয়ে বেশির ভাগ যাত্রীর মৃত্যু হচ্ছে।

সড়ক-মহাসড়কের জন্য যে পরিমাণ গণপরিবহন প্রয়োজন তার চেয়ে আরো অধিক পরিবহন সড়কে থাকলেও এগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলায় বড় অভাব। চালকদের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সড়কের অনেকাংশে নিরাপত্তা ফিরে আসবে। কিন্তু সে দায়িত্ব কার হাতে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিআরটিসি, বিআরটিএ কিংবা মালিকপক্ষ কেউ যদি দক্ষ চালক-হেলপার তৈরি করার পেছনে কাজ না করে; তাহলে এর দায়দায়িত্ব কে নেবে? সড়কে শুধু পরিবহন নামিয়ে দিলেই সমস্যার শেষ নয়। বড় বড় সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ হলেই নিরাপদ সড়ক হবে, তাও না। মনে রাখতে হবে, সড়কের শৃঙ্খলার জন্য দক্ষ-সুশৃঙ্খল ড্রাইভার-হেলপার আবশ্যক।

এ বিষয়টি সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে মেনে নিতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে অথবা প্রতিকার না করে সড়ক নিরাপদ ও মূল্যবান জীবন রক্ষা করা কখনো সম্ভব হবে না। আইন দিয়ে অথবা কঠিন শাস্তির বিধান করে সড়কের শৃঙ্খলা আসবে না। যত দ্রুত সম্ভব গণপরিবহন এবং সব পরিবহনকে বৈধ লাইসেন্স ও ফিটনেসের আওতায় আনতে হবে। দুই নম্বর পথে ড্রাইভার ও পরিবহন সেক্টরের ডকুমেন্ট আদান-প্রদান কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। অযোগ্য-অদক্ষ ড্রাইভারদের হাতে কোনো পরিবহন সোপর্দ করা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। শিশু শ্রমিকদের পরিবহন থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সময়-অসময়ে দু-একটি বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে সড়কের শৃঙ্খলার কথা বলতে দেখা যায়। এ কথা দিয়ে শৃঙ্খলায় আনার বিষয় নয়। বাস্তবে মাঠে-ময়দানে কাজ করতে হবে। প্রশাসন ও পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব গ্রুপকে সমন্বয় করে সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হবে। আইন থাকুক, সেটা বড় কিছু নয়। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় অনিয়ম ঠিকই থেকে যায়। ফলে দুর্ঘটনা করেও পরিবহন সেক্টর পার পেয়ে যায়। সাধারণ মানুষ যেহেতু যাত্রী, তাদের পক্ষে যৌক্তিক কথা বলার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

কতিপয় সামাজিক সংগঠন যাত্রীসাধারণের পক্ষে থাকলেও প্রভাবশালী শক্তির বিপক্ষে এসব সংগঠন পেরে ওঠে না। যার জন্য সড়কে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো ঠিকমতো আইনি সহযোগিতা পায় না। এসব কারণে দিন দিন বেপরোয়া পরিবহন সেক্টর। সড়ক যেন মৃত্যুর ফাঁদ। এটা যেকোনো মূল্যে রোধ করা চাই। আসুন মূল্যবান জীবন বাঁচাতে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সড়কের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে সবাই চেষ্টা করি।

পিডিএসও/তাজ