সফল সন্তানদের বাবা-মায়ের মাঝে অবশ্যই থাকে এই ১৩ টি বৈশিষ্ট্য!

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ২০:৫৮

অনলাইন ডেস্ক

সকল বাবা-মায়েরাই চান যে তার প্রিয় সন্তানটি মনের মতো করে বড় হয়ে উঠুক। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তাদের সন্তান সর্বোচ্চ সাফল্য লাভ করুক। এমনটা কিন্তু সকলে সন্তানের বাবা-মায়ের একান্ত কাম্য। আপনি হয়তো ভেবে থাকতে পারেন, একজন সন্তান কে সুশিক্ষিত ভাবে বড় করে তোলার জন্যে কোন নিয়ম অথবা কোন প্রভাবকের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই একেবারেই। তবে আপনি ভুল। বহু গবেষকদের বহু বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং গবেষণার ফলাফল স্বরূপ উঠে এসেছে নিম্নোক্ত এই ১৩ টি বৈশিষ্ট্য যা বাবা-মায়েদের মধ্যে থাকলে সন্তানদের সফলতার হার বেড়ে যায় অন্য সকল সন্তানদের থেকে অনেক বেশী।
চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন ১৩ টি বৈশিষ্ট্য সফল ছেলে-মেয়েদের পিতা-মাতার মাঝেও অবশ্যই থাকে। 

১. তারা তাদের বাচ্চাদের ঘরের কাজ করতে দেন
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডীন জুলিয়া লিথকোট বলেন, “আপনার সন্তান তার এঁটো থালাবাসন যদি না ধুয়ে থাকে, তার মানে অন্য কেউ সেই কাজটা করে দিচ্ছে।“ তিনি আরো বলেন, “তারা ছোট থেকেই বুঝতে শিখে যায় যে তাদের কে যেকোন ধরণের কাজ করা থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে সে শিখতে পারে না, ঘরের কাজে নিজের কিছু অবদান রাখার জন্যে নিজের কাজটুকু নিজের করা উচিত।
লিথকোট বিশ্বাস করেন যে, যে সকল বাচ্চারা নিজের কাজ নিজে করে বড় হয় তারা চাকরি জীবনে একজন চাকরিজীবী হিসেবে ভালো কাজ করতে পারেন, অন্যান্য সকল সহকর্মীদের সাথে ভালোভাবে মিশতে পারেন এবং বুঝতে পারেন কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হবে।  

২. তারা সন্তানদের সামাজিক হতে শেখান
পেন্সিল্ভ্যানিয়া ষ্টেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সমগ্র অ্যামেরিকার কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে ২৫ বছর বয়সী প্রায় ৭০০ ছেলেমেয়ের উপর গবেষণা করে এক অভাবনীয় তথ্য পেয়েছে। সামাজিক ভাবে যে সকল শিশু অনেক বেশী সক্রিয় ছিল কিন্ডারগার্টেনে পড়া অবস্থায়, প্রায় দুই যুগ পরে পরিণত বয়সে এসে তারা অনেক বেশী সফল হয় নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে।
সামাজিকতা
প্রায় ২০ বছর ধরে করা এই গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে, যে সকল শিশুরা কিন্ডারগার্টেনে পড়া অবস্থায় সামাজিকতা খুব ভালোভাবে রক্ষা করত, স্কুলে বন্ধুদের সাথে গ্রুপ তৈরি করে কাজ করত, একে অন্যের ভালো-খারাপ সময়ে পাশে থাকত- তারা পরবর্তি জীবনে খুব দ্রুত ডিগ্রী  নিয়ে ভালো কোন চাকরীতে ঢুকে যেতে পারে। কারণ, তারা খুব ভালোমতো জানে কীভাবে মানুষের সাথে মিশতে হবে।

৩. সন্তানদের উপর অনেক বেশী প্রত্যাশা রাখেন
ইয়ুনিভার্সিটি অফ ক্যালিফর্নিয়ার প্রফেসর নীল হাফলন এবং তার সহকর্মীরা একটি জাতীয় সার্ভের কিছু তথ্য নিয়ে ২০০১ সালে জন্ম নেওয়া ৬,৬০০ জন শিশুর উপরে গবেষণা চালিয়ে আবিষ্কার করেন, যে সকল বাবা-মায়েরা সন্তানদের উপর বেশী প্রত্যাশা রাখেন, সে সকল সন্তানেরা বেশী ভালো ফলাফল করে থাকে।
কারণ, সন্তানেরা জেনে থাকে, বাবা-মা তার কাছ থেকে কতটুকু আশা করছে। এবং তারা সেইভাবেই কাজ করার চেষ্টা করে যেন প্রত্যাশিত ফলাফলের কাছাকাছি ভালো তারা করতে পারে।

৪. যেসকল বাবা-মায়ের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকে
ইয়ুনিভার্সিটি অফ ইল্লিনইস এর এক স্টাডি রিভিউতে উঠে আসে, যে সকল পরিবারের বাবা এবং মায়ের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকে না সে সকল অভিভাবকদের সন্তানরা খুব বেশী সাফল্য লাভ করতে পারে না। বাবা এবং মায়ের ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার ফলে একটা সংসার ভেঙে যায় এবং সাথে ভেঙে যায় পারিবারিক আবহ। এর প্রভাব পড়ে সন্তানের মনের উপর প্রবলভাবে। যার কারণে সেই সন্তানেরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং যে কারণে তারা খুব একটা সফল হতে পারে না।
এমন কি এক গবেষণায় এও জানানো হয়, ঝামেলা যুক্ত সম্পর্ক নিয়ে একসাথে থাকা বাবা-মায়ের সন্তানদের থেকে, সিঙ্গেল অভিভাবকদের সাথে থাকা সন্তানরা ভালো ফলাফল করে থাকে।

৫. যে বাবা-মা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন
ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের মনস্তত্ববীদ স্যান্দ্রা ট্যাং জানান, “যে সকল মায়েরা তাদের সময়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে ছিলেন, তাদের সন্তানেরাও পরবর্তিতে তাদের মায়ের মতোই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।“
১৯৯৮-২০০৭ সালের মধ্যে যে সকল বাচ্চারা কিন্ডারগার্টেনে ঢুকেছিল তাদের মধ্যে থেকে ১৪,০০০ জন বাচ্চাদের মায়ের উপর গবেষণা করে পাওয়া যায়, যাদের মায়েরা খুব কম বয়সেই বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি, তাদের সন্তানেরাও পরবর্তি সময়ে পড়ালেখাতে খুব একটা এগোতে পারেনি।

৬. খুব ছোট বয়স থেকেই সন্তানদের অংক শেখান
২০০৭ সালে অ্যামেরিকা, কানাডা এবং ইংল্যান্ড এর প্রায় ৩৫,০০০ প্রিস্কুলার এর উপর করা এক মেটা-এনালাইসিস থেকে জানা যায়, যে সকল শিশুরা খুব ছোট থেকেই অংক শিক্ষা পেয়ে বড় হয় পরবর্তিতে তারা অংকের ক্ষেত্রে অনেক বড় অবদান রাখতে পারে এবং পড়ালেখায় অনেক ভালো হয়।

৭. যাদের বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের চমৎকার সম্পর্ক থাকে
২০১৪ সালে গরীব পরিবারে জন্ম নেওয়া ২৪৩ জনের উপর এক গবেষণা করে দেখা গেছে যে, যারা তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে জন্মের পর প্রথম তিন বছরে পরিপূর্ন এবং দারুণ অনুভুতিপূর্ন সম্পর্ক পেয়ে থাকে তারা ৩০ বছর পর তাদের ব্যক্তিগত জীবনে এবং সামাজিকভাবে অনেক বেশী গুরুত্ব পেয়ে থাকে। 
পিএসওয়াই ব্লগ তার রিপোর্টে প্রকাশ করে, “যে সন্তানেরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে নিবিড় যত্ন এবং ভালবাসা পেয়ে বড় হয় তারা মানসিকভাবে অনেক বেশী শক্ত হয়ে বড় হয়।
 
৮. তারা কম স্ট্রেসড থাকেন
সাম্প্রতিক সময়ের ব্রিজিড স্কুলেটের রিসার্চ থেকে বের হয়, যে সকল মায়েরা খুব বেশী স্ট্রেস বোধ করেন সবসময়, সকল বিষয় নিয়ে তাদের সন্তানেরা কখনোই ভালোমতো কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কারণ, মায়ের স্ট্রেস সন্তানের মনের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
এই টার্মকে বলা হয়ে থাকে ‘ইমোশনাল কন্টাজিয়ন’। যার ধরণ অনেকটা ঠান্ডা লাগার মতো। অর্থাৎ, একজনের ঠাণ্ডা লাগলে ভাইরাসের কারণের পাশে যিনি থাকেন তারও ঠাণ্ডা লেগে যায়। যে কারণে অতিরিক্ত স্ট্রেসড থাকা মায়েদের এই অভ্যাস তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রতিফলিত হতে থাকে।
তাই কোন মা যদি খুব বেশী সময় ধরে স্ট্রেসড থাকেন, কোন কিছু নিয়ে সবসময় হতাশ থাকেন তবে তার বাজে প্রভাব তার সন্তানদের উপর সবসময়ই পরে থাকে।
 
৯. সাফল্য নয়, প্রচেষ্টাকেই তারা বেশী গুরুত্ব দেন
প্রায় এক যুগেরও বেশী সময় ধরে শিশু এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের উপর কাজ করা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ক্যারোল ডোয়েক বের করেছেন, প্রায় সকল সাফল্যকে দুই ভাবে দেখে থাকে।
“ফিক্সড মাইন্ডসেট” এর মানুষেরা ভেবে থাকেন তাদের সকল বুদ্ধিমত্তা এবং ক্ষমতা জন্ম থেকেই একদম নির্দিষ্ট করে দেওয়া। তাই তারা তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং ক্ষমতার সাথে মিল থাকে এমন ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র সাফল্য লাভ করতে কাজ করতে চান এবং যে কোন উপায়ে হোক হেরে যাওয়াকে এড়িয়ে চলতে চান।
“গ্রোথ মাইন্ডসেট” এর মানুষজন ঠিক তার উল্টো। তারা যে কোন ধরণের চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী এবং তারা সবসময়েই যে কোন ধরণের নতুন কিছু করতে সদা প্রস্তুত। হেরে যাওয়া কে তারা ভয় পান না। বরং হেরে যাওয়ার মধ্যে থেকে নতুন কিছু শেখা কে তারা বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।  
দুইটি আলাদা আলাদা ভাব পড়ার পর নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে বাবা-মায়েরা সন্তানের সকল প্রচেষ্টাকে বড় করে দেখে তারাই বড় হয়ে সকল বাঁধা এবং নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা প্রতিকূলতা কে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়।

 
১০. তাদের মায়েরা কর্মজীবি হয়ে থাকেন 
রিসার্চ অফ হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এর মতে, কর্মজীবি মায়েদের সন্তানরা তার প্রাপ্তবয়স্ক সময়ে অনেক বেশী সাফল্য এবং সুবিধা পেয়ে থাকেন।
স্টাডি থেকে জানা যায়, যে সকল মেয়েদের মায়েরা কর্মজীবি মহিলা ছিলেন, সে সকল মেয়েরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহনে বেশী আগ্রহী হয় এবং চাকরীর ক্ষেত্রে অন্য সকল মেয়েদের তুলনায় ২৩% বেশী আয় করে থাকেন।
ছেলেদের ক্ষেত্রেও জানা যায় যে, মায়েদের চাকরী করার কারণে ছেলেরা নিজেরাই ঘরের কাজে বেশী আগ্রহী হয় এবং ঘরের কাজ ভালোমতো পারেন। এবং তারা অন্য ছেলেদের তুলনায় বাচ্চাদের যত্ন অনেক বেশী ভালো নিতে পারেন।
 
১১. তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা অনেক ভালো হয়
স্ট্যানফোর্ড ইয়ুনিভার্সিটির গবেষক স্যান রেয়ারডন জানান, নিম্ন আয় এবং উচ্চ আয়ের পরিবারের সন্তানদের মধ্যে অর্জনের পার্থক্য প্রায় ৩০-৪০% পর্যন্ত দেখা গেছে। উচ্চ শিক্ষা এবং উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থান একটা সমাজে অনেক বড় প্রভাব ফেলে।
 
১২. তারা ‘স্বৈরাচারী’ অথবা ‘সহনশীল’ না হয়ে ‘নির্ভরযোগ্য’ হন 
১৯৬০ সালে প্রকাশিত ইয়ুনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজিষ্ট ডায়ানা বাইম্রিড বের করেন, সন্তান লালন-পালন মোট তিন ধরণের হয়ে থাকে-
সহনশীল: এই ধরণের বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের কখনোই শাসন করেন না এবং তারা ভুল কিছু করলেও কখনো কোন শাস্তি দেন না বা নিষেধ করেন না।
স্বৈরাচারী: এমন ধরণের বাবা-মায়েরা সন্তাদের সবসময় তাদের নিজেদের মনমতো চলতে বাধ্য করেন।
নির্ভরযোগ্য: এমন ধরণের বাবা-মায়েরা সন্তানদের সঠিক পথে চলে সাহায্য করে এবং সন্তানদের ভালোমন্দ সকল কিছুতে তার পাশে থাকে।
উপরের তিন ধরণের সন্তান লালন-পালন ধরণের মধ্যে নির্ভরযোগ্য সবচেয়ে দারুণ পদ্ধতি। এতে করে সন্তানদের সাথে বাবা-মায়ের বোঝাপড়া খুব ভালো হয় এবং সন্তান বিপথে যায় না।
 
১৩. তারা সন্তানদের ‘মনের জোর’ বাড়াতে সাহায্য করেন
২০১৩ সালে ইয়ুনিভার্সিটি অফ পেনসিভেনিয়ার সাইকোলজিষ্ট অ্যাঞ্জেলা ডাকওর্থ তার ক্ষমতাশালী এবং সাফল্যের চাবিকাঠি মূলক চারিত্রিক বৈশিষ্ট ‘মনের জোর’নামক টার্ম আবিষ্কারের জন্য ম্যাকআর্থ এর ‘জিনিয়াস’ পুরষ্কার পেয়েছন।
খেলাধুলা 
এই টার্ম বোজাহতে সাহায্য করে, বাবা-মায়েরা সন্তানদের মনের জোর বৃধিতে সহায়তা করে থাকার ফলে, সন্তানেরা কোন লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য পপ্রাণপণ চেষ্টা করে থাকে এবং কোন অবস্থাতেই হাল ছেড়ে দিতে চায় না

পিডিএসও/রিহাব