কারণ জানার চেষ্টা করেন না কেউ

পরীক্ষায় ফেল করে আত্মহত্যা কেন?

আলো দেখাতে পারেন শিক্ষকরা

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:৩৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

পিইসি, জেএসসি কিংবা এসএসসি। একেকটি পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বাড়ছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা। ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই জিপিএ ফাইভ ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় তৈরি হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক চাপ। আর শিক্ষাবিদদের মতে, ফল নিয়ে অতিরিক্ত হইচই এবং জ্ঞানার্জনকে চরম প্রতিযোগিতামূলক করে তোলায় হতাশা বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

এবারের প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মহত্যা করেছে ১৩ শিক্ষার্থী। গত বছরও এসএসসিতে কাক্সিক্ষত ফল না পেয়ে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছে পাঁচজন কিন্তু কেন এই চরম সিদ্ধান্ত?

শিক্ষাবিদের মতে, পরীক্ষার ফল প্রকাশ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এদেশে তা নিয়ে চলে ভীষণ রকমের মাতামাতি। গণমাধ্যমে ভালো ফল অর্জনকারীদের ওপর বেশি বেশি আলো ফেলার কারণে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে অন্যদের জগত। গত বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ মহা ধুমধামে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক সয়লাব হয়ে যায় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সন্তান, নাতি-পুতিদের সাফল্য গাথায়। অনলাইন সংবাদ ব্রেকিং নিউজ দিতে থাকে ‘দেশজুড়ে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস’। এই উচ্ছ্বাস আনন্দকে ম্লান করে দেয় শিশু শিক্ষার্থীর এসব আত্মহত্যা।

প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর ডজন ডজন ছেলেমেয়ের আত্মহননের খবর কি আমাদের একটুও উদ্বেলিত করে না? অভিভাবক-শিক্ষকদের দেওয়া চাপের কি ভূমিকা নেই শিশুদের ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বিষ খাওয়া বা গলায় দড়ি দেওয়ার পেছনে। পাস করেও শিশুরা আত্মহত্যা করছে সর্বোচ্চ গ্রেড না পাওয়ার জন্য।

তবে শুধু পিইসি, জেএসসি নয়, ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষায় মা-বাবার কাক্সিক্ষত ফলাফল না হওয়ায় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে শিশুরা। এবার এই তালিকায় যোগ হয়েছে ক্লাস থ্রি আর সিক্সের দুজন শিশু। এই দুজনকে ধরলে এখন পর্যন্ত আত্মহননের প্রকাশিত সংখ্যা ১৫ জন। যারা মারা যাচ্ছে, যাদের লাশ নিয়ে থানা-পুলিশ হচ্ছে, আমরা শুধু তাদের কথাই জানতে পারি। আত্মহত্যার চেষ্টা করার পর যারা প্রাণে বেঁচে যায়, তাদের সংখ্যা আমাদের জানার কোনো উপায় নেই।

গবেষকেরা বলছেন, প্রতি ২৫টি আত্মহত্যার চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত একজন মারা যায়। এই থেকে যাওয়া ২৪ জনকে নিয়ে কি আমাদের কিছুই করার নেই? আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য পৃথিবীব্যাপী কাজ করে সুইসাইড অ্যাওয়ারনেস ভয়েস অব এডুকেশন সংক্ষেপে এসএভিএ বা সেভ। এই সংস্থাটি জানাচ্ছে, ১০০ জন নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবলে তাদের মধ্যে গড়ে ২৫ জন শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে। সেই হিসাবে আত্মহত্যার চেষ্টায় বেঁচে যাওয়া আর আত্মহত্যার কথা ভাবাদের সংখ্যা নিয়ে শঙ্কার কারণ আছে বৈকি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যে শিক্ষার্থীরা পাস করে উল্লাস করে সেই আনন্দটা ফেল করা শিক্ষার্থীদের ওপর মারাত্মক চাপের সৃষ্টি করে। পাস কিংবা ফেল নিয়ে এগুলো বেশি না ভাবাই শ্র্রেয় বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, বর্তমানে শিক্ষা পরিণত হয়েছে প্রতিযোগিতার বস্তুতে। আর এর জন্য দায়ী স্কুল পর্যায়ে অতিরিক্ত জাতীয় পরীক্ষা ও জিপিএ ফাইভের সহজলভ্যতা। তাই কেবল ব্যক্তির উদ্যোগেই আত্মহত্যার প্রবণতা থামবে না। প্রতিযোগীপরায়ণ ব্যবস্থার মধ্যে শিক্ষার্থীদের বসবাস বদলাতে হবে।

২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার প্রায় একই রকমের সুপারিশ করেছিলেন, তিনিও সব স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে একজন করে শিক্ষাবিষয়ক মনোবিদ নিয়োগের তাগিদ দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা হয়নি চট করে, সেটা হওয়ারও নয়।

শিশুদের আত্মহত্যা থেকে রক্ষার কোনো উপায় কী নেই? বড়দের সংযত আচরণ আর উচ্চাকাক্সক্ষার পারদটা চড়তে না দিলে শিশুরা বেঁচে যায়। সব অভিভাবক চাইছেন তার কবজায় থাকা শিক্ষার্থীরা থাকুক সবার ওপরে। পত্রিকায় নিদেনপক্ষে ফেসবুকে মুখরক্ষার মতো রেজাল্ট হওয়া চাই। না হলে মুখ উজ্জ্বল করে বুক চিতিয়ে চলবে কীভাবে। এসব চাওয়ার বলি হচ্ছে তরতাজা শিশুরা। যেখানে মা-বাবা সন্তানের পরীক্ষার ফলকে সামাজিক সম্মান রক্ষার হাতিয়ার বলে মনে করেন, সেখানে অসহায় শিশুদের বাঁচানোর রাস্তা খুবই চাপা, সংকীর্ণ। এই সংকীর্ণ পথের সমাধানের আলো দেখাতে পারেন শিক্ষকরা।

পিডিএসও/তাজ