লাল ‘ডাকবাক্সে’ হারানো দিন

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:০০

কাইয়ুম আহমেদ

ইন্টারনেট-ইমেইল ব্যবহারে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন চিঠি, ডাকবাক্স, রানার বা ডাকপিয়ন বিষয়গুলো শুধুই বইয়ের পাতায় লেখা আছে।

তবে সেই দিন অন্যভাবে ফিরিয়ে আনতে লাল টুকটুকে দৃষ্টিনন্দন ভবন সাজানো হয়েছে ঢাকার আগারগাঁওয়ে। ভবনটি দেখতে অবিকল ডাকবাক্সের মতো। ডাক অধিদফতরের সদর দফতর এটি। শুধু মনোমুগ্ধকর সদর দফতর নির্মাণই নয়, ডাক বিভাগকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে নানা রকম পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ডাক বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা হচ্ছে। ডাক দ্রব্যাদি পরিবহনে কেনা হচ্ছে আধুনিক গাড়ি। গ্রামে গ্রামে পোস্ট ই-সেন্টারের মাধ্যমে মানুষকে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল সেবা। পুরোনো ডাকঘরগুলোর সংস্কার করা হচ্ছে আর ডাক কার্যক্রম গতিশীল করার জন্য নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রযুক্তিগত কারণে ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসায় আগের চেয়ে মানুষের চিঠিপত্র আদান-প্রদানের হার কমে গেছে। তবে অনলাইন শপিং করার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় পার্সেলের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাক বিভাগের কর্মকান্ডে ও ডিজিটাল পরিবর্তন আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডাক বিভাগকে আমরা প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে চাই। এজন্য পুরোনো ডাকঘরগুলোকে আমরা ডিজিটাল ডাক সেন্টারে রূপান্তরিত করছি। ডাক অধিদফতর কর্তৃক পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৪০০টি উপজেলা ও সাবপোস্ট অফিস এবং ৮ হাজার ১০০টি গ্রামীণ অ-বিভাগীয় শাখা ডাকঘরকে পোস্ট ই-সেন্টারে রূপান্তর করা হয়েছে।

আগারগাঁওয়ে ডাকবাক্সের আদলে নির্মিত ডাক অধিদফতরের সদর দফতরটি ১৪ তলাবিশিষ্ট। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ডাক ভবনের নির্মাণও শেষ। এই ভবনে আছে দুটি বেইসমেন্টসহ মিলনায়তন, সভাকক্ষ, সার্ভার, ডাক জাদুঘর, গ্রন্থাগার। এ ছাড়া ডাক অধিদফতরের অধীন জরাজীর্ণ ডাকঘরগুলো সংস্কার প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে বিভিন্ন শ্রেণির মোট ৭৯টি ডাকঘর পুনর্নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও মেরামত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে মেইল প্রসেসিং ও লজিস্টিক সার্ভিস সেন্টার নির্মাণ নামক আরো একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন আধুনিক ১৪টি মেইল প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন করা হবে। ডাক অধিদফতরের দেওয়া তথ্যে, ডাকসেবা আধুনিকায়নে বিভিন্ন ব্যবস্থা ও নতুন সেবা চালু করার ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডাক অধিদফতরের রাজস্ব আয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

২০১৬ সালের শেষ দিকে প্রায় পৌনে ১ একর জমির ওপর কাজ শুরু হয় ডাক ভবনের। প্রথমে ৮তলা নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা দাঁড়ায় ১৪তলায়। বাজেটও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯২ কোটি টাকায়। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ অর্থ।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। শেরেবাংলা নগরের এই নতুন ভবন ডাক বিভাগের কর্মীসহ সবাইকে উজ্জীবিত করবে বলে মনে করছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বললেন, এর স্থাপত্যশৈলী এমন, যা ডাক বিভাগকে সহজেই তুলে ধরতে পারছে। আইকনিক এই ভবন ডাক বিভাগের ডিজিটাল যাত্রাকে গতিশীল করে তুলবে।

এছাড়া বাংলাদেশ ডাক জাদুঘর আছে রাজধানীর গুলিস্তানে (জিপিও এলাকা হিসেবে পরিচিত)। এটি হয় প্রতিষ্ঠিত ১৯৬৬ সালে। নানা সময়ে ডাক বিভাগের ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি স্থান পেয়েছে জাদুঘরে। এখানে দেখা যাবে, ডাকবিষয়ক বেশকিছু দুর্লভ-দর্শনীয় বস্তু যা আপনাকে বিমোহিত করবে। যা এই ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে আপনাকে নিয়ে যাবে রানারের ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজার সময়ে।

মূল পোস্টাল জাদুঘরের ১ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের কক্ষটিতে প্রবেশ করতেই হাতের বা পাশে দেখা গেল রানারের অবয়ব মূর্তি। পরনে উর্দি, বর্শা ও লণ্ঠন হাতে, কাঁধে চিঠির ব্যাগ। মনের ভেতরে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য গেয়ে ওঠেন, রানার ছুটছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে, রানার চলছে, খবরের বোঝা হাতে। আর ডানে লক্ষ্য করলেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত ডাকটিকিট। পাশেই বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে লেখা চিঠি এখানে সংরক্ষিত আছে। পুরো গ্যালারি ঘুরে দেখা গেল, বিশ্বের ডাকবিভাগের ইতিহাসের পাশাপাশি বিশ্বসভ্যতায় বিবর্তনের নানা অংশ। দেয়ালে দেয়ালে রক্ষিত আছে ডাক বিভাগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের তেলচিত্র।

কালজয়ী নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র থেকে শুরু করে মহাকবি কায়কোবাদ, ডাকটিকিটের উদ্ভাবক স্যার রোনাল্ড হিল, সি ভি রমন, হেনরি ভন স্টিভেন ও মন্টেগোমারিসহ আরো অনেকেই। ডাক জাদুঘরে মহারানি ভিক্টোরিয়ার আমল থেকে শুরু করে এখনকার সময় পর্যন্ত প্রচলিত বিভিন্ন চিঠির বাক্স রয়েছে। এই জাদুঘরে মহারানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতি সংবলিত একটি চিঠির বাক্স রয়েছে, ওজন ৯ মণ। এ চিঠির বাক্সটি তৈরি হয়েছিল ১৮৯০ সালে। ইংলান্ডের বার্মিংহামের তৈরি সাত মণ ওজন করা যায়, এ রকম একটি স্কেল ছাড়াও হরেক রকমের আরো ১০ থেকে ১২টি স্কেল রয়েছে।

ডাক প্রহরীদের ব্যবহৃত ১৮৭০ সালের বর্শা, ব্যাগ, চামড়ার ব্যাগ, টুপি, পোশাক, ইংরেজ আমলের ধাতব স্ট্যাম্প প্যাড, ফ্রাংকিং মেশিন, ১৮৭৮ সালের টেবিলঘড়ি, দেয়ালঘড়ি রয়েছে। এছাড়াও পোস্টম্যান, হেড পোস্টম্যান ও অন্য ব্যক্তিদের ব্যবহৃত লণ্ঠন, বিউগল, তলোয়ার, বন্দুক, ডিমলাইট, চামড়ার ব্যাগ, মানিব্যাগ, ছুরি প্রভৃতির দুর্লভ সব সংগৃহীত রয়েছে, যা ব্রিটিশ আমলের ডাক ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে।

সরকারি ছুটির দিন ছাড়া বাকি সব দিন প্রতিদিনই সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘরের দুয়ার। কোনো প্রবেশমূল্য নেই। ডাক ভবনের তৃতীয় তলায় প্রশাসন শাখার পাশেই জাদুঘরটি অবস্থিত।

পিডিএসও/তাজ