রমজানের পুণ্যকর্মগুলো থাকুক জীবন্ত

প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৯, ১৭:০৭

মাহমুদ আহমদ

আল্লাহপাকের অপার কৃপায় আজ ২৭তম রমজান আমরা অতিবাহিত করছি। গতরাতে নফল ইবাদতের মাধ্যমে রাতকে জাগ্রত রেখেছিলাম। মানুষের জীবন, জন্ম ও মৃত্যুশাসিত। এমন কেউ নেই যাকে মৃত্যু স্পর্শ করে না।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কুল্লু নাফসিন জায়কাতুল মাউত’। অর্থাৎ ‘প্রত্যেক আত্মা মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আম্বিয়া : ৩৫)। মানুষ যেমন নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি, তেমনি নিজের ইচ্ছায় সে এ পৃথিবী ছেড়ে যেতেও পারে না। তাকে অবশ্যই আল্লাহতায়ালার নির্দেশ মানতে হবে। কিন্তু মানুষ ইচ্ছা করলে মৃত্যুকে জয় করতে পারে। মানুষ চাইলে বেঁচে থাকতে পারে শত শত বছর ধরে। আর শত শত বছর বেঁচে থাকার জন্য তার প্রয়োজন হবে এমন কিছু কর্ম করে পৃথিবীতে রেখে যাওয়া, যেগুলোর ধ্বংস বা বিলয় নেই।

ইতিহাস পাঠে জানা যায়, পৃথিবীতে মহামানবরা যে অনন্ত জীবন লাভ করেছেন, তাদের সেই পরিচয়ের মূলে রয়েছে তাদের কর্ম ও সৃষ্টি। মানুষের জন্য যারা কাজ করেন, তারাই অমরত্ব লাভ করেন। রমজানের এই দিনগুলোতে আমরা অনেক পুণ্যকর্ম করেছি, সেগুলোকে আমাদের জীবনের স্থায়ী রূপ দান করতে হবে। যদি আমরা এমনটি করি, তাহলেই এই রমজান আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হবে।

আমরা দেখতে পাই, সেই আদিম ও গুহাবাসী পর্যায় থেকে মানুষ যে বর্তমান উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে, তারও মূলে রয়েছে মানুষের কর্ম-সাফল্য। অনেকেই মনে করেন, স্মরণীয় কীর্তি সবাই রেখে যেতে পারে না। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অনাহার-অর্ধাহারের মধ্যে যাদের দিন কাটে, তাদের পক্ষে যুগান্তকারী কোনো কিছু সৃষ্টি সম্ভব নয়। আসলে এ ধারণা সর্বাংশে সত্য নয়। মানুষ যুগ যুগ বেঁচে থাকবে তার কর্মের ফলে, এমন কর্ম সমাজ থেকে মনে হয় উঠেই গেছে। আজ কারো কর্মের জন্য কেউ বেঁচে থাকে না।

কারণ, বর্তমানে এমন লোক পাওয়া খুবই কষ্টকর যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করেন। আজ আমরা সবাই নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করি। মৃত্যুর পরও আমাদের সবাই স্মরণ করুক এটা আমরা চাই না। এত এত অর্থ-সম্পদ রোজগার করছি কিন্তু পাশের ঘরের লোকটি যে না খেয়ে আছে তার খোঁজ পর্যন্ত রাখছি না। রমজানের দিনগুলোতে যদিও কিছুটা খেয়াল রাখি, বছরের বাকি দিনগুলোতে তা করি না।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুল করিম (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মৃত্যুর পর তিন রকমের আমল ব্যতীত সব রকমের আমলই বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমত, সদকায়ে জারিয়া। দ্বিতীয়ত, জনহিতকর শিক্ষা। তৃতীয়ত, এমন সুসন্তান যে তার জন্য দোয়া করতে থাকে।’ (মুসলিম)। সদকায়ে জারিয়া যার অর্থ এমন ধরনের জনহিতকর কাজ, যার সুফল বহু দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। মানবতার উপকারার্থে যেমন— পুকুর কাটা, কূপ খনন করা বা পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা করা, মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা তৈরি করা, রাস্তার পাশে ছায়াদানকারী বৃক্ষরোপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করে যাওয়া এবং এমন জ্ঞানমূলক কোনো পুস্তক রচনা করা, যার মাধ্যমে লোকরা সঠিক পথের সন্ধান লাভ করবে।

তেমনভাবে মৃতব্যক্তি যদি কাউকে সুশিক্ষা দিয়ে যায়, তার ফলেও সে প্রতিদান পেতে থাকবে। তৃতীয় যে কাজটির জন্য সে প্রতিদান পেতে থাকবে তা হলো তার নেক সন্তান, যাকে সে প্রথম থেকেই সুশিক্ষা প্রদান করেছে এবং তার চেষ্টার ফলেই সে খোদাভীরু ও দীনদার হতে পেরেছে। যত দিন পর্যন্ত এমন নেক সন্তান দুনিয়ায় জীবিত থাকবে, তত দিন পর্যন্ত তার কৃত সৎকাজের সওয়াব সেও পেতে থাকবে।

আমাদের ভাবা উচিত, আমরা সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কী রেখে যাচ্ছি? আমরা তো শুধু নিজের অহংকার আর আভিজাত্য নিয়েই ব্যস্ত, পরকালের কোনো চিন্তাই করি না। আমাদের এমন কিছু করে যেতে হবে, যাতে মরেও অমর হতে পারি। মহান খোদাতায়ালা আমাদের সবাইকে এমন কোনো কর্ম করার তৌফিক দান করুন, যার মাধ্যমে আমরা অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকব।

পিডিএসও/তাজ