মুমিনের হৃদয়ে লাইলাতুল কদর

প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৯, ১৫:২৩

মাহমুদ আহমদ

রমজানের শেষ দশকে মুমিন-মুত্তাকির জন্য বিশেষ এক রাত হচ্ছে লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর এমন এক রাত, যে রাতে আল্লাহতায়ালা তার সেসব ইমানদারের ওপর তার করুণা ধারা বর্ষণ করেন, যারা নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার ইচ্ছায় বিগলিত অন্তরে নিজেকে সমর্পণ করে আর তার আদেশাবলি পরিপূর্ণরূপে মান্য করে। এটা এমন এক রাত, যা সাধারণভাবে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তবে এর আরো অর্থ আছে যা আল্লাহর রহমান্তিত বৈশিষ্ট্যের মাঝে গভীরভাবে প্রোথিত।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-কাদরের আয়াতসমূহ দ্বারা আমাদেরকে আক্ষরিকভাবে এ কথা বোঝানো হয়েছে যে, ‘লাইলাতুল কদর’ অর্থ হচ্ছে ‘ভাগ্য নির্ধারণের রাত’। এটা হচ্ছে এমন এক রাত, যা এক হাজার মাসের চাইতেও বেশি মর্যাদাসম্পন্ন। আরবিতে এক হাজার বলতে সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যাকে বোঝায়। আর এ রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং মানবজাতির মধ্যে এক নব জীবনের উন্মেষ ঘটান।

সুরা আল কাদর প্রসঙ্গে আমরা আরো দেখতে পাই, আল্লাহতায়ালা সেই মহিমান্বিত রাতের কথা উল্লেখ করেছেন, যেই রাতে হজরত খাতামুল আম্বিয়া (সা.)-এর ওপর পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছিল এবং তিনি (সা.) সেসব মহিমান্বিত আয়াতসমূহ পাঠ করেছিলেন; যেগুলো চিরকাল সব মুমিনের অন্তরে গ্রথিত হয়ে থাকবে অর্থাৎ সুরা আলাকের প্রথম কয়েকটি আয়াত, যেখানে আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘পড়ো তোমার প্রভু প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে এক আঠালো রক্তপিন্ড থেকে, তুমি পড়ো, কেননা তোমার প্রভু-প্রতিপালক পরম সম্মানিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিখিয়েছেন, তিনি মানুষকে তা শিখিয়েছেন— যা তিনি নিজে জানতেন না’ (সুরা আলাক, আয়াত : ১-৫)।

এই আয়াতগুলো সেই সৌভাগ্য রজনিতে মহানবী (সা.) যখন হেরা গুহার মাটিতে অনন্তের ধ্যানে একেবারে তন্ময়; তখন এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়ে তার হৃদয় কন্দরে প্রথিত হয়ে যায়। এ আয়াতগুলো আল্লাহতায়ালার করুণার প্রথম নিদর্শন; যার মাধ্যমে তিনি তার প্রিয় নবীকে আশিস মন্ডিত করেছিলেন।

প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য ‘লাইলাতুল কদর’-এর আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ রয়েছে, আর তা হলো এটা এমন এক রাত, যখন মুমিন এক মহান আশীর্বাদ লাভ করতে পারে। প্রসিদ্ধ একটি হাদিস দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কদরের রাতে যে ব্যক্তি ঐকান্তিক বিশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহ্র পুরস্কার লাভের আশা করে, তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়’ (বোখারি শরিফ, প্রথম খন্ড)।

অপর এক হাদিসে মহানবী (সা.) লাইলাতুল কদর অন্বেষণের সময় কখন হবে, সে বিষয়ে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করো’ (বোখারি)। উপরোক্ত বিশ্লেষণের আলোকে প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর এটা দায়িত্ব, রমজানের এই দিনগুলোতে সে তার ইবাদত বাড়িয়ে দেবে এবং ঐকান্তিকভাবে দোয়া করবে যে, তারা যেন লাইলাতুল কদরের সুফল থেকে উপকৃত হয় এবং আল্লাহর রহমতে তাদের অতীতের সব গুনাহ মাফ পেয়ে যায়।

এক স্থানে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সারা রমজান মাসের সব নামাজ বা জামাত আদায় করে, সে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরের এক বৃহদাংশ সংগ্রহ করে। লাইলাতুল কদরের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য একজন মানুষকে মাসজুড়ে ন্যায়পরায়ণতার সর্বোচ্চ মান সংরক্ষণ করে। মহানবী (সা.) রমজানের শুরু থেকেই শেষ ১০ দিনের এ দিনগুলোতে আল্লাহর সর্বোচ্চ এবং পরমোৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ইবাদতের মাঝে অতিবাহিত করার অপরিমেয় সংকল্প করতেন। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের স্বাদ লাভে ধন্য করুন, আমিন।

পিডিএসও/তাজ