অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা পর্যটন কেন্দ্র সাজেক ভ্যালি

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৮, ১৫:৩৮

তহিদুল ইসলাম, সাজেক থেকে ফিরে

পাহাড়ে যে কত রূপ-লাবণ্য ছড়িয়ে আছে তা দেখতে হলে যেতে হবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ভারতের মিজোরামের সীমান্ত ঘেঁষা রাঙামাটি জেলার সাজেক ভ্যালিতে। এটা আর পাচটি পার্বত্য এলাকার মতো নয়। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে সাজেক ভ্যালি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। সাজেক ভ্যালি থেকে মেঘ-পাহাড়ের মিতালি দেখার সুযোগ রয়েছে।

বর্তমানে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এই উপত্যকার অবস্থান রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শত শত ফুট উঁচুতে অবস্থিত সাজেক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এর আয়তন ৭০২ বর্গমাইল, যা নারায়ণগঞ্জ, মেহেরপুর জেলার প্রায় সমান।

রাঙামাটিতে অবস্থান হলেও সাজেকে যেতে হয় খাগড়াছড়ি দিয়ে। ঢাকা থেকে বাসযোগে খাগড়াছড়ি সদর পর্যন্ত, এরপর স্থানীয় চান্দের গাড়ি ও সিএনজিযোগে সরাসরি সাজেক ভ্যালি যাওয়া যায়। তবে ভ্রমণের জন্য স্থানীয় চান্দের গাড়ি পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা রাস্তাগুলো যেন আকাশ ছুঁয়েছে। রাস্তা বেয়ে উপরে ওঠার সময় এসব রাস্তা কিছুটা হলেও আপনার বুকে কাঁপন ধরাতে পারে। আর একটু অসতর্ক থাকলে রয়েছে বিপদে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা।

খাগড়াছড়ি সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। যেতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগতে পারে। যাওয়ার পথে বাঘাইহাট পুলিশ ক্যাম্প ও আর্মি ক্যাম্প পড়ে। এখান থেকে সাজেক যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়। সাজেকে পানির অপ্রতুলতা থাকায় বাঘাইছড়ি পার হওয়ার পূর্বেই পানীয় সংগ্রহ করতে হয়।

সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা হলে পথেই অনেক নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ে, যা আপনার ভ্রমণকে করবে আরো উপভোগ্য। যেতে যেতে উঁচু পাহাড়ের পাশাপাশি পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা নদীর দেখা মিলবে। এসব নদীই পাহাড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য পানির অন্যতম উৎস। এ ছাড়া পথে পড়বে বাঘাইহাটের হাজাছড়া ঝরনা। অধিকাংশ পর্যটক ফেরার পথে ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করেন।

বর্তমানে সাজেক বেশ নিরাপদ। আর এ কারণে এখানে সারা বছরই পর্যটক সমাগম থাকে। সম্প্রতি সাজেকে শিক্ষা সফরে এসেছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এই প্রতিবেদককে সাজেকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন বিভাগটির সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ আবু তোয়াব শাকির। তিনি বলেন, ‘সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে খুবই চকৎকার একটা জায়গা।

পার্বত্য এলাকায় অন্য যেসব পর্যটনকেন্দ্র আছে সেখানে হোটেল থেকে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যেতে হয়। কিন্তু সাজেক এমন একটা জায়গা যেখানে পর্যটনকেন্দ্রেই থাকা যায়। এখানে আলাদা করে কোথাও যেতে হচ্ছে না। হোটেলের করিডোর থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। হোটেলের যে অবকাঠামো সেটা স্থানীয়দের ধাঁচে তৈরি। বাঁশের মাচার মতো জায়গায় থাকা যায়, এটা উপভোগ্য। পর্যটকরা যাওয়ায় স্থানীয়দের আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের মতো এখানেও অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েছে। যত্রতত্র কটেজ গড়ে উঠছে। ফলে আগে ভ্যালির যে সৌন্দর্য দেখা যেত এখন সেটা দেখা যায় না। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এভাবে যদি আর পাঁচ বছর অতিবাহিত হয় তবে অবস্থা আরো খারাপ হবে।’

সাজেকে পর্যটকদের জন্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও ক্রমেই বাড়ছে। আগে থেকে যোগাযোগ করলে রেস্টুরেন্টগুলোতে বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। বিদ্যুতের সুবিধা না পৌঁছলেও সোলার প্যানেল ও জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। এখানে রয়েছে অসংখ্য স্থানীয়ভাবে কাঠের তৈরি হোটেল। বর্তমানে ক্রমেই হোটেলের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই আবাসিক ভবনে বাড়তি দু’চারটি কক্ষ তৈরি করে হোটেল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এসব হোটেল থেকে সকালে পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

সাজেক নামক নদী থেকে এর নামকরণ হয়েছে। আর এই এলাকায় লুসাই, পাংখোয় এবং ত্রিপুরা আদিবাসীর বাস। পাহাড়ে বসবাস বলে এসব জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে আছে ভাবার কোনো কারণ নেই। এখানকার অধিবাসীরা বেশ আধুনিক। অনেকেই জিনস আর টি-শার্ট ব্যবহার করেন। এদের অনেকেই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এমনকি ইংরেজিতেও বেশ ভালো দক্ষতা আছে অনেকের।

সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা অবস্থিত। সাজেক রুইলুইপাড়া ও কংলাকপাড়ার সমন্বয়ে গঠিত। কংলাকপাড়ার কংলাকপাহাড় সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। পর্যটকরা হেঁটে এই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠেন। সতর্কতার জন্য অনেকেই বাঁশ কিনে সঙ্গে নেন। এটা বেশ দুঃসাহসিকতার কাজ। কারণ একটু অসচেতন হলেই যে ঘটে যেতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা।

সাজেকের অপার সম্ভাবনা থাকলেও তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না বলে মনে করেন অনেকে। তাদের মতে, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে এটি পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠত।

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক একেএম জসীম উদ্দীন বলেন, সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে পার্বত্য এলাকাটা এখনো নিরাপদ, এটা বলা যাবে না। এই দিক থেকে নিরাপত্তা নিয়ে যে সংশয় আছে তা দূর করতে হবে। আরেকটি সমস্যা হলো পছন্দ মতো খাদ্য পাওয়া যায় না। তা ছাড়া পর্যটকদের নির্দিষ্ট একটা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। হোটেলের পাশে নিচে কোথায় কী হচ্ছে তা দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু পর্যটকদের হেঁটে কিছু সময় পাহাড় থেকে পাহাড়ে বা অন্য কোথাও বেড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।

পর্যটন করপোরেশনের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। জেলা পরিষদের তেমন কোনো কার্যক্রমও চোখে পড়েনি। পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে জেলা পরিষদের কার্যক্রম যুক্ত করতে হবে। তাহলে একদিকে যেমন নিরাপত্তা বাড়বে, সুযোগ-সুবিধা বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। তবে এখনো প্রাথমিক কাজই সম্পন্ন হয়নি। সাজেকের মতো পর্যটন সম্ভাবনা সম্পন্ন জায়গা বাংলাদেশে বিরল। সরকারকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

পিডিএসও/তাজ