নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ১৭০০ ফাঁসির আসামির মামলা

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:২৮

আদালত প্রতিবেদক

বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলেও তা কার্যকরে অনুমোদন লাগে হাইকোর্টের। সেখানে রায়ের পর সংক্ষুব্ধপক্ষ যেতে পারে আপিল বিভাগে। আইনের এমন কয়েকটি চৌকাঠ পেরোনোর অপেক্ষায় আছে, মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন আসামি। সেই তালিকায় গত বুধবার যোগ হয়েছে হলি আর্টিজান হামলার সাতজন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ ব্যবস্থায় এই মামলার নিষ্পত্তির উদ্যোগ না নিলে বহুদিন লাগবে তা কার্যকর করতে। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে সারা দেশে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাও দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। দ্রুত বিচার আইনে করা চাঞ্চল্যকর মামলা তদারকির জন্য মনিটরিং টিম কাজ করছে।

আইনমন্ত্রী জানান, দেশে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন-২০০২ এর আওতায় ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ১০৩টি। তন্মধ্যে ঢাকায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৯৮৯টি।

আনিসুল হক আরো জানান, আদালতগুলো এরূপ মামলা গুরুত্ব সহকারে দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করছে। পুরোনো মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মনিটরিং সেল কাজ করছে। মনিটরিং সেল গঠিত হওয়ার পর থেকে দেশের বৃহত্তর জেলাগুলোতে পর্যায়ক্রমে ৫ থেকে ১০ বছর এবং ১০ বছরের অধিক সময়ের পুরোনো ফৌজদারি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে এবং মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সারা দেশের প্রতি জেলায় কেস ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে, উচ্চ আদালতসহ সারা দেশের আদালতগুলোতে মামলা জট নিরসনে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি অন্যতম। আদালতের বাইরে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ পদ্ধতি ব্যবহার করে আদালতে বিচারাধীন মামলার জট কমিয়ে আনা সম্ভব। মামলা বা বিরোধ নিষ্পত্তির এ অনানুষ্ঠানিক বা উপানুষ্ঠানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক দেশই সুফল পেয়েছে। বর্তমানে দেশে উচ্চ আদালতসহ নিম্ন আদালতগুলোতে প্রায় ৩৬ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এর মধ্যে তিন মাসে এডিআর পদ্ধতিতে মোট ৬০ হাজার ৬১৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে দেওয়ানি মামলা রয়েছে ২ হাজার ১০টি। এ সংখ্যাটি আইনজীবীরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। আইনজীবীদের অভিমত মামলা জট কমাতে হলে অবশ্যই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) ওপর আরো জোর দিতে হবে। এতে করে অনেকেই শুরুতেই মামলা করা থেকে রেহাই পাবেন। ফলে বাদী-বিবাদী উভয়েই উপকৃত হবেন।

দেশের ৬৪টি জেলায় এডিআর পদ্ধতিতে মোট ৬০ হাজার ৬১৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সময় চেয়ে বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ঢাকা জেলায়। সেখানে ৬ হাজার ৯৩৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আর সবচেয়ে কম নিষ্পত্তি হয়েছে লালমনিরহাট জেলায়। সেখানে নিষ্পত্তি হয়েছে একটি মামলা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় ২ হাজার ৬০৪টি, রাজশাহীতে ৯৮৩, খুলনায় ১ হাজার ৩৮২, বরিশালে ১ হাজার ২২৯, সিলেট ১ হাজার ১৪৭ রংপুর জেলায় ১ হাজার ২৩৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য জেলায় প্রচুর মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, আগের তুলনায় মামলা জট কমতে শুরু করেছে। আমাদের নজর দিতে হবে নতুন যে মামলা হচ্ছে তার চেয়ে যাতে বেশি করে নিষ্পত্তি হয়। সে দিকেই বেশি নজর দিতে হবে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির আশ্রয় নিলে মামলার জট অনেকাংশে কমে যাবে। সূত্র মতে কোনো কোনো দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে ১৫ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় লাগে। এসব মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য কেউ এগিয়ে আসেন না। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু কিছু আইনজীবী ও বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এসব মামলা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেন। মানুষ মরে যায়, অথচ দেওয়ানি মামলা চলে কয়েক পুরুষ ধরে। এ ব্যবস্থা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন। তিনি আরো বলেন, আগের চেয়ে যাতে বেশি করে মামলা নিষ্পত্তি হয় সেদিকেই বেশি নজর দিতে হবে। ট্রাফিক ভায়োলেন্স মামলাগুলো সিএমএম কোর্টে দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। আমরা কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছি।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদ বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির আশ্রয় নিলে যেমন শত্রুতা কমবে অন্যদিকে সময় ও অর্থও বাঁচবে। মামলার ভারে ন্যুব্জ উচ্চ ও নিম্ন আদালত। এসব আদালতে ক্রমাগত মামলা জট বাড়ছেই। সংশ্লিষ্ট আইনও সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সে সুফল আমরা এখনো ভোগ করতে পারিনি।

তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। অনেক মামলাতেই বিচার যখন পাওয়া যায়, ন্যায় বিচারের তখন আর কোনো প্রয়োজন বা প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। তাই, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে আমাদের বেশি নজর দিতে হবে। তবে, এ ক্ষেত্রে আইনজীবী ও বিচারকের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত বিচারককে এসব মামলায় সমঝোতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। বিচারকদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আইনজীবীদের সহযোগিতা ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব না।

পিডিএসও/তাজ