সাতক্ষীরায় মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলা খারিজ

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ১৯:২৭

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
মামলার বাদী ও স্বাক্ষীরা

সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে যৌতুকের দাবিতে মারপিটের অভিযোগে আনিফা আনজুরা প্রথার দায়ের করা মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। চীফ জুডিশিয়াল তদন্তের পর মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় বুধবার দুপুরে আদালতের বিচারক হোসনে আরা মামলাটি খারিজ করে দেন।

একই সঙ্গে আদালতের বিচারক ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা করার জন্য মামলার বাদী আনিফা আনজুরা প্রথাকে সতর্ক করেন।

আনিফা আনজুরা প্রথা সাতক্ষীরা শহরের আমতলার উত্তর কাটিয়া আবাসিক এলাকার কাজী ফসিউদ্দীন স্বপন ও রেহেনা খাতুনের ছোট মেয়ে। বাবা কাজী ফসিউদ্দীন স্বপন আশাশুনি উপজেলা এলজিইডি অফিসের হিসাব রক্ষক পদে কর্মরত। গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কুশোলিয়া গ্রামে।

সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলার বাদী আনিফা আনজুরা প্রথা দাখিলকৃত মামলায় বলেন, বিয়ের সময় আমার বাবা আমার স্বামীকে ৬ লাখ টাকার জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র দেন। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর স্বামী, শশুর, শাশুড়ি ও ননদ বিভিন্ন সময় ৫ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে চাপ প্রয়োগ করতো। এক পর্যায়ে তাকে বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গত ৭ জুলাই মাসে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন আনিফা। এছাড়া পহেলা জুলাই বিকেল ৪ টার সময় বাদীর উত্তর কাটিয়ার বাড়িতে গিয়ে যৌতুকের দাবিতে স্বামী, শশুর, শাশুড়ি ও ননদের বিরুদ্ধে মারপিটের অভিযোগ আনা হয়। একই আর্জিতে বলা হয় মারপিটের ঘটনার সময় ১১ জুলাই সকাল ১০ টা। 

গত ১৭ জুলাই ৩৪০/১৮ মামলাটি আদালতে দাখিলের পর আদালতের বিচারক মামলাটি চীফ জুডিশিয়াল তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন। এরপর সাতক্ষীরা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হারুন-অর-রশিদ মামলাটি তদন্ত করেন। তদন্তকালে তিনি মামলার বাদী, মারপিটের মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রদানকারী ডাক্তারসহ অপর তিন স্বাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহন করেন।

মামলার বাদী আনিফা আনজুরা প্রথা জুডিশিয়াল তদন্তকালে বিচারকের কাছে ১৭ জুলাইয়ের ঘটনার জবানবন্দি দেন। পরে বলেন ১১ জুলাই তারিখের ঘটনা। আসামিরা তার বাড়িতে গিয়ে মুখে চড়, কিল, ঘুষি মারে। শফিকুল, খলিলুর, জব্বার, শহিদ ও তার বাবা ফসিউদ্দীন স্বপন মারামারি ঠেকায়। সদর হাসপাতালে গেলে ডাক্তার না থাকায় মঞ্জু মেমোরিয়াল ক্লিনিকে ডা. বিপিন বিহারীকে দেখান। 

মামলার স্বাক্ষী প্রতিবেশী খলিলুর রহমান জবানবন্দিতে বলেন, তিনি কোন মারামারি দেখেননি। তাছাড়া আসামির বাবা ৫ লাখ টাকা দাবি করেছেন এটা তার বিশ্বাস হয় না। 

অপর স্বাক্ষী বাদীনির ভগ্নিপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, আসামি টাকা চেয়েছিলো তবে পরিমাণ উল্লেখ করেননি। মেয়ের কাধে চড়, কিল, ঘুষি মারে। স্বাক্ষী খলিলুর রহমান ঘটনাস্থলে ছিলেন না। 

এদিকে, বাদী ও স্বাক্ষীদের জবানবন্দিতে অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য থাকায় অধিকতর তদন্তের স্বার্থে মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রদানকারী ডাক্তার বিপিন বিহারীকে তলব করা হয়।

তিনি আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন, মেডিকেল সার্টিফিকেট তার দেওয়া। তিনি আনিফা নামের কোন মেয়েকে চেনেন না। ১১ জুলাই তিনি আনিফাকে দেখেননি। তার কাছে কেউ নিয়েও যায়নি। নারী ও শিশু কোর্টের পিপি জহিরুল ইসলামের পরামর্শে শিমুল ক্লিনিকের মালিক শহিদুল ইসলাম সার্টিফিকেট দিতে বললে তিনি মেডিকেল সার্টিফিকেটটি সরবরাহ করেন। তিনি সার্টিফিকেটে আনিফার উরুতে ও পিঠে ফোলা জখমের কথা বলেছেন। সার্টিফিকেট নিয়ে মামলা করবেন এটা তিনি বুঝতে পারেননি। 

এদিকে, ৫ স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ২৬ সেপ্টেম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এর কার্যালয় থেকে ১২১৫ নং স্বারকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হারুন-অর-রশিদ তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করেন।
 
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ডাক্তার বিপিন বিহারি সরকার মামলার বাদী আনিফা আনজুরা প্রথাকে না দেখে কিছু লোকের কুপরামর্শে ভূয়া একটি মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রদান করেন। তাছাড়া স্বাক্ষীদের বক্তব্য, নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় বাদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী-২০০৩) এর ১১(গ)/৩০ ধারায় একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। 

এদিকে, বুধবার মামলার ধার্য দিনে মামলাটি খারিজ হয়ে যাওয়ার পর মামলার বাদী আনিফা আনজুরা প্রথার বাবা কাজী ফসিউদ্দীন স্বপন বলেন, আমরা মিথ্যা মামলা করিনি। মারপিট করেছে সঠিক। আদালত কিভাবে মামলাটি খারিজ করে দিলো সেটি আমার জানা নেই।

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের অতিরিক্ত পিপি অ্যাড. তামিম আহম্মেদ সোহাগ বলেন, একটি মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করা হয়েছিলো। আদালতে সেটি মিথ্যা প্রমাণ হওয়ায় আদালত মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন। ‘পরিবারটির মানসিক চিন্তা চেতনা ভালো নয়। এরা প্রকৃত অর্থে এক ধরণের প্রতারক চক্র। যারা মানুষদের বিপদে ফেলে মীমাংসার নাম করে টাকা হাতিয়ে নিতে চায়।’ 

থানায় করা সাধারণ ডায়েরীটি তদন্ত করেছেন কাটিয়া পুলিশ ফাঁড়ির এসআই তসলিম আহম্মেদ। তিনি বলেন, তদন্তকালে তিনি বাদীর অভিযোগের কোন সত্যতা পাননি। 

পিডিএসও/অপূর্ব