আবের ভারত সফর বাতিল, গণআন্দোলনে মমতা

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৫৮ | আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:০৮

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা

বাংলাদেশের পর এবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ভারত সফর স্থগিত হয়ে গেছে। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দু’ দেশের পারস্পারিক আলোচনার মাধ্যমে এই সফর স্থগিত করা হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রবীশ কুমার বলেছেন, দু’দেশের আলোচনার মাধ্যমে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সফর স্থগিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দু’দেশের সুযোগমতো ফের নয়া দিনক্ষণ স্থির হবে।

১৫ ডিসেম্বর রোববার থেকে তিন দিনের ভারত সফরে আসার কথা ছিল জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের। গত সপ্তাহেই ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রবীশ কুমার ঘোষণা করেন, ১৫ থেকে ১৭ ডিসেম্বর ভারত সফর করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠকের কর্মসূচিও ঘোষণা করে বিদেশ মন্ত্রক। যদিও তখন বৈঠকের স্থান নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি মন্ত্রকের তরফে।

এদিকে, এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) নিয়ে পথে নামছে তৃণমূল। যার জেরে ১৬ তারিখ সোমবার গণআন্দোলনের ডাক দিয়ে বিরাট মিছিলের ডাক দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি ছাড়া সব রাজনৈতিক দল ও গণসংগঠনসহ সাধারণ মানুষকে এই মিছিলে আহ্বান জানিয়েছেন মমতা। সোমবার বেলা ১টায় আম্বেদকরের মূর্তির পাদদেশ থেকে মিছিল শুরু হবে, যা শেষ হবে জোড়াসাঁকোতে। মঙ্গলবার মিছিল হবে দক্ষিণ কলকাতায়। বুধবার জেলায় জেলায় হবে মিছিল।

এর আগে ২০ ডিসেম্বর এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) নিয়ে তৃণমূল ভবনে বৈঠক ডেকেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিঘায় শিল্প সম্মেলনে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী বলেছেন, শুরু থেকেই এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করছে তৃণমূল সরকার, আগামী দিনেও তা করবে।

ফের একবার কেন্দ্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করতে তিনি এবং তার দল দেবেন না। রাজ্যের মানুষকে মমতা বলেছেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই, যেমন শান্তিতে আছেন তেমনই থাকবেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়বলেছেন, স্বাধীনতা আন্দোলন করে যে অধিকার পাওয়া গেছে তা বজায় থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশরক্ষা করতে যদি আরেকটা স্বাধীনতা আন্দোলন করতে হয় তা তিনি করবেন। এরপরই তিনি বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি আগামী ১৭ তারিখ দিল্লি সফর বাতিল করছেন। এই পরিস্থিতি মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য , তিনি মানুষের পাশে থাকতে চান, তাই দিল্লি যাবেন না।

মমতা বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এপার বাংলার সম্পর্ক ভালো। তিনি একেবারেই মৌলবাদী নন। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বা ক্যাবের জেরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, জাপানের প্রধানমন্ত্রীও নিজের সফর বাতিল করেছেন। তিনি বলেছেন, মাথা ঠান্ডা করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নিপীড়িত-বঞ্চিতদের হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই মনে রাখুন। এরপরই মমতা সোমবার মিছিলের ডাক দেন।

অন্যদিকে,সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ মেনে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় মোদি সরকারকে সচেষ্ট হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আমেরিকা। আপাত দৃষ্টিতে মার্কিন সরকারের এই মন্তব্য আর্জি মনে হলেও, ভারতের উদ্দেশে তা কড়া বার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন বিদেশ দফতরের মুখপাত্র বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ঘিরে কী কী ঘটছে, সেদিকে নজর রাখছে আমেরিকা। ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সকলের সমানাধিকারই দুই গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি। ভারতের কাছে মার্কিন সরকারের আর্জি, সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা মাথায় রেখে তারা যেন দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করে।

এর পাশাপাশি ,নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বৈধতার চ্যালেঞ্জে একাধিক মামলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। শীর্ষ আদালতে পিটিশন দায়ের করেছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ। সিএবি-এ রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পরই তৃণমূল ও কংগ্রেসও শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সংবিধানের মৌলিক অধিকার খর্ব করছে, এই অভিযোগে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র শীর্ষ আদালতে একটি মামলা করেছেন। একই অভিযোগে পিটিশন দায়ের করেছেন কংগ্রেস সাংসদ জয়রাম রমেশও।

অন্যদিকে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে তুমুল বিক্ষোভ চলছে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে। বিশেষ করে আসাম এবং ত্রিপুরায়। আসামে নামানো হয়েছে আধা সেনা। বন্ধ ইন্টারনেট পরিষেবা। বাজারঘাট, স্কুল বন্ধ। ট্রেন চলাচলও কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিক্ষোভের আঁচ পড়ছে অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও। টানা চার দিনের বিক্ষোভের পর শুক্রবার সকাল থেকে শিথিল হয়েছে আসামের কারফিউ।সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। প্রথমে গুয়াহাটিতে কার্ফু শিথিল করা হয়। তার পর শিথিল হয় ডিব্রুগড়েও।

এদিকে, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আসামের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে সেনার হাতে। তারপর ২৪ ঘণ্টা কাটতে না-কাটতেই শিথিল হয়েছে কারফিউ।

শুক্রবার ১০ ঘণ্টার অনশনে বসেছে অল আসাম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে গুয়াহাটিতে অনশনে বসেছে তারা। সকাল ৬টা থেকে চলছে আসুর অনশন কর্মসূচি। বিক্ষোভ ও কার্ফুর জেরে কাজিরাঙা অভয়ারণ্যে আটকে পড়া বিদেশি পর্যটকদের একটি দলকে উদ্ধার করেছে অসম পুলিস। তার মধ্যে মার্কিন ও অস্ট্রেলিয়ান রয়েছে। পর্যটকদের উদ্ধার করে নওগাঁয় বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে। তাদের দিল্লি পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

উল্লেখ্য, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধী আন্দোলনে আসামে প্রাণ গিয়েছে ৫ জনের। এরমধ্যে ১ জন মহিলা। পুলিশের গুলি ও লাঠিতে আহত হয়েছেন ৫০ জন বিক্ষোভকারী। তার মধ্যে ২৫ জন গুয়াহাটির বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 

পিডিএসও/তাজ