সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরম সিবিআই হেফাজতে

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৯, ২১:২৯

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা

আইএনএক্স দুর্নীতি মামলায় সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদাম্বরমকে আরো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের হেফাজতে নিয়েছে সিবিআই। তদন্তে অসহযোগিতা এই যুক্তিতেই চিদাম্বরমকে ৫ দিনের হেফাজতে চেয়েছিল সিবিআই। অর্থাৎ ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশের সাবেক অর্থমন্ত্রীকে নিজের জোরবাগের বাড়ি ছেড়ে থাকতে হবে দেশের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই অফিসে, জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য।

গত বৃহস্পতিবার সাবেক অর্থ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরমকে আদালতে তোলার পর সিবিআই তরফের আইনজীবী সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। তার অভিযোগ, তদন্তে সাহায্য করছেন না সাবেক অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, চিদাম্বরম চুপ থাকতেই পারেন, সেটা তার সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন করলে ঘুরিয়ে উত্তর দিচ্ছেন।

তুষার মেহতা আরো বলেছেন, চিদাম্বরমকে হেফাজতে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, সিবিআই তরফে চার্জশিট কার্যত প্রস্তুত। তার সঙ্গে অন্যান্য অভিযুক্তদের মুখোমুখি বসিয়ে তদন্ত করতে চান সিবিআই ও ইডির অফিসাররা। এরপরই ৫ দিনের হেফাজতের আর্জি জানান তুষার মেহতা। চিদাম্বরমকে হেফাজতে নিলে তদন্তে কতটা সুবিধা হতে পারে এ নিয়ে বলতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় উল্লেখ করেছেন তুষার মেহতা। হেফাজতে নিলে তদন্ত আরো সহজ হয় বলে ওই রায়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল। এরপর বিচারকের কাছে তদন্তের সব নথি পেশ করেছেন তিনি।

সলিসিটির জেনারেলের সওয়ালে চিদাম্বরমের আইনজীবী কপিল সিব্বল জবাব দিয়েছেন। তার যুক্তি এই মামলায় অভিযুক্ত সবাই এখন জামিনে রয়েছে। মূল অভিযুক্ত কার্তি চিদাম্বরম, আইএনএক্সের কর্ণধার পিটার ও ইন্দ্রানী মুখার্জিও জামিনে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কপিল সিব্বল। চিদাম্বরমের ক্ষেত্রে গ্রেফতারের কী প্রয়োজন প্রশ্ন তোলেন তিনি। কপিল আরো জানিয়েছেন, আইএনএক্স মিডিয়াকে বিদেশি বিনিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র পি চিদাম্বরমের একার ছিল না। ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন বোর্ড এই সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি ওই বোর্ডের প্রধান হলেও আরো ৬ সচিবের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তাদের গ্রেফতার করা হয়নি বলে জানিয়েছেন চিদাম্বরমের আইনজীবী কপিল সিব্বল।

ওদিকে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদম্বরমের গ্রেফতারির ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র কাঁদছে। পাশাপাশি, নরেন্দ্র মোদি সরকারের তীক্ষ্ণ সমালোচক চিদম্বরমকে চুপ করাতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তোপ দেগেছেন লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীর চৌধুরী। আর রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষের দাবি, সিবিআই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তারা মাটির তলা থেকেও অপরাধীকে বের করে আনতে পারে।

আইএনএক্স মিডিয়া মামলায় চিদম্বরমকে গ্রেফতারির পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী বলেছেন, পদ্ধতিতে ভুল রয়েছে। আইনের কথা বলছেন না। কিন্তু চিদম্বরম একজন শীর্ষ রাজনীতিক, তিনি সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। যেভাবে তার বিষয়টি হ্যান্ডেল করা হচ্ছে তা খুবই হতাশাজনক। দুঃখজনকও। গণতন্ত্র কাঁদছে। বিচার বিভাগের কথা কিছু বলছেন না। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলছেন, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

এর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বহুচর্চিত সারদা আর্থিক দুর্নীতি কাণ্ডের তদন্তে রাজ্যের সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব অত্রি ভট্টচার্যের দোরগোড়ায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা, সিবিআই। বৃহস্পতিবার টানা ৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাকে। সারদা কাণ্ডের সময় তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রধান সচিব ছিলেন অত্রি ভট্টাচার্য। সারদা কাণ্ডের সময়ে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রধান সচিব ছিলেন অত্রি। সারদার বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো রাজ্য সরকারের বিজ্ঞাপন। ওই বিজ্ঞাপনগুলো থেকে আয় করত সারদাগোষ্ঠী। কার নির্দেশে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো সারদাগোষ্ঠীর সংবাদপত্রে, তা অত্রির কাছে জানতে চান তদন্তকারীরা। কত টাকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, তাও জানতে চাওয়া হয় বলে খবর। ক’দিন আগে সারদা কাণ্ডের তদন্তে ডেকে পাঠানো হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব এবং রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে।

তৃণমূলের মুখপত্র, জাগো বাংলার অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত লেনদেন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই পার্থকে তলব করা হয় বলে খবর। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সিবিআই অফিসে পৌঁছে গিয়েছিলেন কলকাতার সাবেক পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারও। পশ্চিমবঙ্গে আরেক চিট ফান্ড রোজভ্যালি দুর্নীতি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছিল তাকে।পাশাপাশি, চিদম্বরমের গ্রেফতারি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অধীর চৌধুরীও। তিনি বলেছেন, চিদম্বরম, নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাকে স্পষ্ট করেছেন। কলাম লিখেছেন, সংসদে বলেছেন। তার তীক্ষ্ণ ও তীব্র বক্তব্য চুপ করাতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এটা রাজনৈতিক বদলা।

অন্যদিকে, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদম্বরমের গ্রেফতারি নিয়ে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সিবিআইয়ের কার্যকলাপকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, সিবিআই মাটির তলা থেকে অপরাধীকে বের করতে পারে। এবার সেটা শুরু হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আদালতও জামিন দেয়নি। বোঝাই যাচ্ছে বিষয়টা কতটা গুরুতর।

এদিকে আবার কেন্দ্রীয় সরকারের সবচেয়ে কঠোর সমালোচকের মুখ বন্ধ করতেই পি চিদম্বরমকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এমনই অভিযোগ সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর পুত্র কার্তি চিদম্বরমের। চেন্নাই থেকে দিল্লি পৌঁছে সাংবাদিকদের কার্তি বলেছেন, তাকে ২০ বার ডেকে পাঠানো হয়েছে। চারবার তার বিরুদ্ধে রেইড করা হয়েছে। এখনো সিবিআইয়ের কাছে কোনো মামলা নেই। কিন্তু আইএনএক্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার ও ইন্দ্রানী মুখোপাধ্যায়, পি চিদম্বরম ও তার ছেলে কার্তির নামে অভিযোগ এনেছে। যদিও দুজনেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।

কার্তির দাবি, পিটার, ইন্দ্রানী বা তাদের সহকারীদের সঙ্গে তার কখনো দেখা হয়নি। একমাত্র সিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে তার ইন্দ্রানীর সঙ্গে দেখা হয়। কার্তির অভিযোগ, তার বাবা নয় এটা কংগ্রেসকে টার্গেট করে করা হয়েছে।

পিডিএসও/তাজ