‘এক দেশ এক নিয়ম, কাশ্মীরে করে দেখালেন মোদি’

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ১৮:২৩

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা

ভারতের কাশ্মীরে বিতর্কিত ৩৭০ ধারা তুলে দিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। এর সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীর, ২টি আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। আর এর মাধ্যমেই কাশ্মীর ইস্যুতে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিহাস তৈরি করলো বি জে পি। এক দেশ, এক নিয়ম, এক পতাকার দাবি পূরণ হলো। শুধু ৩৭০ ধারা নয়, ৩৫-এ ধারাও বাতিল করেছে কেন্দ্র সরকার। ১৯৫০ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় ৩৭০ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হলেও সেই মর্যাদা স্থায়ী ছিল না, বরং ছিল অস্থায়ী সংস্থান বা, টেম্পোরারি প্রভিশন। কিন্তু এই ধারারই ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ইচ্ছে করলে এই বিশেষ মর্যাদা তুলে নিতে পারেন। রাষ্ট্রপতির ওই ক্ষমতাকে ব্যবহার করেই  দীর্ঘদিনের দাবির সমাধান করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। অর্থাৎ নির্দেশনামায় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ সই করার পরের মুহূর্ত থেকেই রদ হয়ে গিয়েছে কাশ্মীরের বিতর্কিত ৩৭০ ধারা। এই ধারার অধীনেই ৩৫এ ধারায় ভারতীয় ভুখণ্ড থেকেও ভূস্বর্গের বাসিন্দারা যে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন, খারিজ হয়ে গেছে তাও।

সোমবার সকালে কাশ্মীর ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্যাবিনেট বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে কী বিবৃতি দেন, তা জানতে গোটা দেশ ছিল উৎসাহী। সংসদে বিবৃতি রাখতে উঠেই অমিত শাহ, নজিরবিহীনভাবে সংশোধিত জম্মু কাশ্মীর বিল পেশ করেন। রাষ্ট্রপতিকে এই বিলে সই করার সুপারিশ করে কেন্দ্র। এরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজ্যসভা। প্রস্তাবের বিরোধিতার সরব হন কংগ্রেসের গুলাম নবি আজাদ, সমাজবাদী পার্টির রামগোপাল যাদবরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই অধিবেশন মুলতুবি হয়ে যায়। পরে ফের অধিবেশন শুরু হলে, বিরোধীদের হই হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির নির্দেশনামা পড়ে শোনান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংসদে পাস হয়ে যায় বিল। ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তিতে সই করেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। এই বিলের মাধ্যমে কাশ্মীরকে পুনর্গঠন করা হবে। উপত্যকায় রইল না আলাদা সংবিধান, আলাদা পতাকা। সেই সঙ্গেই বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের বহু দিনের দাবি পূরণ করলো নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় এনডিএ সরকার।

কাশ্মীরের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা ও মেহবুবা মুফতিকে ইতোমধ্যে গৃহবন্দি করা হয়েছে । গৃহবন্দি করা হয়েছে রাজ্যের অন্য আর এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা সাজ্জাদ লোনকে। অন্যদিকে, কাশ্মীরের ভারতভুক্তির সঙ্গে ৩৭০ ধারার কোনও সম্পর্কে নেই, এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, রাজ্যসভায় বলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারত সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে ভারতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৪৭ সালের ২৭ অক্টোবর। ৩৭০ ধারা এসেছে ১৯৫৪ সালে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য, বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদ বলছেন, ৩৭০ ধারার মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, এটি সত্যি নয়। অমিত শাহ আরও বলেছেন, ৩৭০ ধারাকে ঢাল করে জম্মু ও কাশ্মীরকে দিনের পর দিন লুঠ করেছে সেখানকার তিনটি পরিবার। অমিত শাহের দাবি, প্রতিবছর কেন্দ্র সরকার প্রচুর টাকা দেওয়ার পরেও কেন জম্মু-কাশ্মীরের এই অবস্থা তা জবাব দিন, সেখানকার নেতারা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের যুক্তি এই ধারা বিলোপ করতে এক সেকেন্ডও দেরি করা উচিত নয়, এনিয়ে সংসদে বিতর্ক হওয়া উচিত। বিরোধীদের সব প্রশ্নের উত্তর সরকার দেবে।

এদিকে,জম্মু-কাশ্মীর ভেঙে দুটো আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, এবং দুই জায়গাতেই দু'জন উপ-রাজ্যপাল নিয়োগ করা হবে ঘোষণার পরেই বিরোধীতায় সরব হয়েছেন জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন দুই মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এবং মেহবুবা মুফতি। রাজ্যসভায় অমিত শাহের ঘোষণার পর ওমর আব্দুল্লা বলেছেন, কেন্দ্র জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকদের সঙ্গে ছলনা করে, তাদের ঠকিয়ে এই পদক্ষেপ করেছে। কেন্দ্রকে সাবধান করে ওমর আবদুল্লা বলেছেন এই কাজের ফল নরেন্দ্র মোদি সরকারকে ভুগতে হবে। আগামী দিনে বিপজ্জনক পরিণতির সাক্ষী থাকতে হবে বর্তমান সরকারকে। বিজ্ঞপ্তিতে জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের একতরফা এবং শকিং সিদ্ধান্ত ,আসলে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। ১৯৪৭ সালে ভারতে যোগ দেওয়ার সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি যে বিশ্বাস রাখা হয়েছিল তা, ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বেআইনি এবং অসাংবিধানিক বলেও বর্ণনা করেছেন ওমর আবদুল্লা। জানিয়েছেন, ন্যাশনাল কনফারেন্স এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাবে, আগামী দিনের কঠিন যুদ্ধের জন্যে তারা তৈরি। 

এর পাশাপাশি কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলোপ করার প্রস্তাব করার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে নিজের জামা ছিঁড়ে, সংবিধানের প্রতিলিপি ছিঁড়ে প্রতিবাদ করেছেন পিডিপি সাংসদ মীর মহম্মদ ফায়াজ। ওই ঘটনায় অবাক হয়ে যান রাজ্যসভার সাংসদরা। ফায়াজকে সভা থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন ক্ষুব্ধ চেয়ারম্যান বেঙ্কাইয়া নাইডু। সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন পিডিপি সাংসদ  মীর মহম্মদ ফায়াজ। রাজ্যসভার বাইরে এসেও বিক্ষোভ দেখান তিনি। প্রতিবাদে নিজের জামাও ছিঁড়ে ফেলেন। এদিকে, ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদ করলেও বিরোধী নেতা গুলাম নবি আজাদ পিডিপি সংসদের ওই কাজের তীব্র নিন্দা করেছেন। গুলাম নবি বলেছেন, পিডিপি সাংসদ মীর ফায়াজ ও নাজির আহমেদ সংবিধানের প্রতিলিপি ছেঁড়ার যে চেষ্টা করেছেন তা নিন্দনীয়। সাংসদরা সংবিধানের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এদিকে, বিপুল আধাসেনা নামানোর পর এবার জম্মু-কাশ্মীরের বিভিন্ন জায়গায় জারি করা হচ্ছে ১৪৪ ধারা। গৃহবন্দি করা হয়েছে রাজ্যের একাধিক নেতাকে। ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে । কেবল টিভি পরিষেবাও বন্ধ। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে পুলিসের তরফে। রাজ্যের পুলিস কর্তা ও উচ্চপদস্থ নেতাদের জন্য স্যাটেলাইট ফোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশিকা জারি না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজ্য প্রশাসন। সেইসঙ্গে স্কুল কলেজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে শ্রীনগর ও জম্মুতে ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে সব ধরনের সভা সমাবেশ ও জামায়েত। তবে রাজ্য প্রশাসন সূত্রে খবর, কোনও জায়গায় কারফিউ জারি করা হবে না। তবে রাজ্যের পরিস্থিতি কারফিউয়ের মতোই। রাতের শহরের বিভিন্ন রাস্তায় টহল দিয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। শ্রীনগরে প্রবেশ ও বাইরের পথে ব্যারিকেড দিয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এর আগে যে সমস্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে প্রশাসনকে বাধার মুখে পড়ে হয়েছিল, সেই সমস্ত এলাকার প্রতি বিশেষ নজর দিচ্ছে প্রশাসন। আগাম সতর্কতামূলক এই সমস্ত পয়েন্টে সাঁজোয়া গাড়ি মোতায়েন করা হয়েছে। টহল দিচ্ছে বাহিনী। জম্মু, রাজৌরি, ডোডা, কিস্তওয়ার, উধমপুর বনধের চেহারা নিয়েছে।

অন্যদিকে ,নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করার জন্যে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে নির্দেশ পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে কেন্দ্রের নতুন সিদ্ধান্তের পর কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে জম্মু ও কাশ্মীরের যে অধিবাসীবৃন্দ এবং ছাত্রছাত্রী রয়েছেন, তাদের  নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শান্তি বিঘ্ন বা আইনশৃঙ্খলা ভাঙার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়তে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনকে। কোনও ভুয়া খবর, যাচাই না-করা খবর, গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বার্তা যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে, শান্তি বিঘ্নিত করতে না পারে এবং সাম্প্রদায়িক হিংসার পরিবেশন তৈরি না হয়, সে দিকে নজর রাখার জন্যও রাজ্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি এই নির্দেশ পাঠানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। রাজ্যে বসবাসকারী জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষজন ও ওই রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক।

পিডিএসও/রি.মা