সবাইকে নিয়ে চলতে চান মোদি

১ দিনেই রাহুল-মমতার পদত্যাগের ইচ্ছা

প্রকাশ : ২৬ মে ২০১৯, ০৯:১৪

পার্থ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে

একই দিনে ভোটে দলের খারাপ ফলের দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন দুই বিরোধী দলের নেতা, রাহুল গান্ধী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দুজন ভোট পর্বে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন। একজন কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে, অন্যজন দল নয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে। আর শেষ পর্যন্ত কারোর পদত্যাগ গৃহীত হয়নি। সাংগঠনিক পরিবর্তনের নামে, এরপরই কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসে কোপটা পড়েছে, মাঝারি তলায়। এই উপমহাদেশে সব দেশেই যা হয়।

গতকাল শনিবার বিকালে কালীঘাটে নিজের বাড়িতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, পাঁচ মাস ধরে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না তাকে। অপমানিত বোধ করছেন। সে কারণে দলের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার ছাড়তে চেয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। তার কথায়, এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী থাকতে পারছি না, দলের সভানেত্রী থাকব। কিন্তু ওরা (পড়ুন, দলের মাঝারি-ছোট নেতারা) মানতে চাইল না। লোকসভা নির্বাচন বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে কালীঘাটের বৈঠকেই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার প্রস্তাব দেন ‘অপমানিত’ মমতা। তৃণমূল নেত্রী বলেছেন, পার্টি সিম্বল ম্যাটার করে। চেয়ার তার কাছে কিছু নয়। আগেও অনেকবার ছেড়ে এসেছেন। মমতা আরো বলেছেন, তিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পছন্দ করেন না। তার বিবেকে লেগেছে। মমতার দাবি, আসন কমলেও তৃণমূলের ভোট বেড়েছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে জিতেছে বিজেপি। ওই রাজনীতি করে সফল হয়নি তৃণমূল। তিনি মুসলিমদের তোষণ করেন বলে, বিজেপির তরফে ভোট পর্বে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার জবাব দিতে তিনি বলেছেন, হ্যাঁ, আমি মুসলিমদের তোষণ করি। যে গরু দুধ দেয়, তার লাথি খেতে রাজি। জানিয়ে দিয়েছেন ৩০ মে, পার্ক সার্কাস ময়দানে কলকাতার সবচেয়ে বড় ইফতারে তিনি যোগ দেবেন। কলকাতার মেয়র, ফিরহাদ হাকিম যে ইফতারের আয়োজক।

অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, জাতীয় উচ্চাশা আর আঞ্চলিক প্রেরণা, এই দুই নিয়েই এগোতে হবে। কোনো একটিকে উপেক্ষা করলে চলবে না। এটাই বিজেপি তথা এনডিএর নতুন স্লোগান। এই নির্বাচন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রায় দিয়েছে। এই নির্বাচন ছিল ইতিবাচক, এই জনাদেশ সব অর্থেই ইতিবাচক।

শনিবার বিকালে সভাপতি অমিত শাহের নেতৃত্বে নতুন এমপিদের সঙ্গে বৈঠকের পরে, রাতে রাইসিনা হিলসে রাষ্ট্রপতি ভবনে যান নরেন্দ্র মোদি। সব ঠিক থাকলে ৩০ মে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন তিনি। এর আগে গত শুক্রবার রীতি মেনে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। শনিবার এনডিএর শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে করেছেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে বলে খবর।

রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছে ইস্তফাপত্র দিয়ে নরেন্দ্র মোদি টুইট করেছেন, সূর্যাস্ত হয় নিয়ম মেনে। কিন্তু আমাদের কাজের ঔজ্জ্বল্য কোটি কোটি মানুষের জীবন আলোকিত করতে থাকবে। নতুন ভোর অপেক্ষা। নতুন কাজ। ১৩০ কোটি মানুষের স্বপ্ন ও নতুন ভারতের স্বপ্নপূরণে আমরা আরো বদ্ধপরিকর। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণের আগে মায়ের আশিস নেবেন মোদি। যাবেন নিজের লোকসভা কেন্দ্র বারাণসীতেও। টুইটারে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, রোববার বিকালে মায়ের আশীর্বাদ নিতে গুজরাটে যাচ্ছেন। পরের দিন সকালে যাবেন কাশীতে। তার ওপরে ভরসা রাখার জন্য ধন্যবাদ জানাবেন নিজের নির্বাচনী কেন্দ্রের মানুষকে। এর আগে গতকাল শনিবার সপ্তদশ লোকসভার বিজয়ী প্রার্থীদের তালিকা রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল। ষোড়শ লোকসভা ভেঙে দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা, শনিবার তাতে সম্মতি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।

এদিকে লোকসভা নির্বাচনের বিপর্যয়ের দায় ঘাড়ে নিয়ে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির কাছে ইস্তফা দিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। তবে প্রত্যাশা মতোই তা গ্রহণ হয়নি। শনিবার সকালে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে নিজের পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানান রাহুল গান্ধী। খবর অনুযায়ী, ইউপিএ চেয়ারপারসন সনিয়া গান্ধী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, মল্লিকার্জুন খাড়গে, গুলাম নবি আজাদ, অমরিন্দর সিং, অশোক গেহলট, আহমেদ প্যাটেলসহ অন্যদের কমিটি তা খারিজ করে দিয়েছে। প্রথমে রাহুলের পদত্যাগের খবর অস্বীকার করলেও পরে সাংবাদিক বৈঠকে তা স্বীকার করে নিয়েছেন কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সুরজেওয়ালা। লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ইউপিএ চেয়ারপারসন সনিয়া গান্ধীর কাছে ইস্তফা দেওয়ার কথা বলেছিলেন রাহুল। যদিও পত্রপাঠ তা খারিজ করে দেন সনিয়া। তবে ছেলেকে তিনি ওয়ার্কিং কমিটির কাছে প্রস্তাব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

শনিবারের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে উল্লেখযোগ্যভাবেই অনুপস্থিত ছিলেন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমলনাথ। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৪টি আসন। গতবারের তুলনায় এবার টেনেটুনে আরো আটটি আসন বাড়াতে পেরেছেন তারা। দেশজুড়ে রাহুলের মোদিবিরোধী ঝড়ে হালে পানি পায়নি। পুরোপুরি ফ্লপ রাহুলের ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’।

অন্যদিকে লোকসভা ভোটের ফল বেরুতে না বেরুতেই ফের শুরু হয়ে গেছে গোরক্ষকদের তান্ডব। মধ্যপ্রদেশের সিওনিতে নিগ্রহকারীদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে মামলাও। নিগৃহীতরা জানিয়েছেন, তাদের বাধ্য করানো হয়েছে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিতেও। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, একটি গরু নিয়ে অটো রিকশায় চেপে সিওনি দিয়ে যাচ্ছিলেন এক মহিলাসহ তিন মুসলিম। কোনোভাবে সেই খবর পৌঁছে যায় গোরক্ষকদের কানে। সঙ্গে সঙ্গে লাঠি, বাঁশ নিয়ে অটোরিকশাটিকে তাড়া করেন গোরক্ষকরা। ধরেও ফেলেন অটোরিকশার ওই তিন আরোহীকে। তার পর তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর এক এক করে ধৃতদের বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন গোরক্ষকরা। ধৃতদের দিয়েই বেধড়ক পেটানো হয় মহিলাকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তা দেখতে থাকেন পথচারীরা।

ব্যাতিক্রম নয় পশ্চিমবঙ্গও। এরই মধ্যে তৃণমূল এবং বিজেপির চার সমর্থক খুন ও আহত হয়েছেন অন্তত ৫৫ জন। পার্টি অফিস দখল শুরু হয়েছে। হিংসা রুখতে রাজ্যবাসীর কাছে শান্তির আবেদন করেছেন রাজ্যপাল কেশরিনাথ ত্রিপাঠী। নদীয়া, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, হুগলি, কোচবিহার, মেদিনীপুরসহ একাধিক জায়গায় বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের পার্টি অফিস দখল করার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন জায়গায় আক্রান্ত হচ্ছেন তৃণমূলকর্মীরা।

এবার মমতাকে ‘জয় শ্রী রাম’ লেখা কুর্তা পাঠিয়েছেন বিজেপি নেতা তেজিন্দর সিং বগ্গা। চন্দ্রকোনায় সভায় যাওয়ার আগে মমতার কনভয়ের সামনে তিন যুবকের ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দেওয়া নিয়ে সূত্রপাত। ওই তিনজনকে আটক করে পুলিশ। এরপরই বিজেপি নেতৃত্ব, এমনকি নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ বলতে শুরু করেন, জয় শ্রী রাম বললে গ্রেফতার করেছেন মমতা। অমিত শাহের রোড শোয়ে গন্ডগোল বাধানোয় দিল্লি বিজেপির মুখপাত্র তেজিন্দর সিং বাগগাকে মাঝরাতে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মমতার অভিযোগ, বহিরাগত এনে বাংলাকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে বিজেপি। সেই বাগগাই মমতাকে পাঠিয়েছেন কুর্তা। টুইটারে তেজিন্দর লিখেছেন, শুনলাম দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রতি বছর মোদিজিকে কুর্তা পাঠান। তাই ওনাকে উপহার পাঠানো আমাদের দায়িত্ব। ওনাকে জয় শ্রী রাম লেখা একটা কুর্তা পাঠাচ্ছি। অনুগ্রহ করে কুর্তাটি পরে টুইট করবেন। সাদা শাড়ি, নীল পাড়, গলায় একটা হালকা চাদর। পায়ে হাওয়াই চটি, মমতার ট্রেড মার্ক। সেই ট্রেড মার্কে এবার বিজেপির ধাক্কা।

পিডিএসও/হেলাল