আজ শেষ দফার ভোটগ্রহণ

দিল্লি দখলের লড়াইয়ে চলছে নানা সমীকরণ

প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৯, ০৯:০৭

পার্থ বন্দোপধ্যায়, কলকাতা থেকে

ক্ষমতার গন্ধ পাচ্ছেন বিরোধীরা। শেষ দফার ভোটের আগেই যেভাবে চন্দ্রবাবু নাইডু দিল্লিতে রাহুল গান্ধী, ইয়েচুরির সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তাতে নব্বই দশকের ছায়া দেখা যাচ্ছে। এই বৈঠক যদি ইঙ্গিত হয়, তবে তা যে বেশ জোরালো তার প্রমাণ ফল ঘোষণার দিনই ইউপি চেয়ারপারসন, সনিয়া গান্ধীর ডাকা বৈঠক। কংগ্রেস রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য জেদ ধরবে না, জানিয়ে দেওয়ার পরেই দিল্লির রাজনীতিতে আবার সক্রিয় সনিয়া গান্ধী। কিন্তু দিল্লিতে অ-বিজেপি সরকার গঠনে সলতে পাকানোর কাজটা যিনি শুরু করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি যাচ্ছেন কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কালীঘাটের খবর, ভোটের ফল প্রকাশের পর, মানে, ২৩ তারিখ দুপুরের পর তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো তার পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করবেন। স্পষ্ট নয়, বহুজন সমাজপার্টির নেত্রী মায়াবতীর অবস্থানও। দুজনেরই মিল হচ্ছে, ভোটের প্রচারপর্বে, যাকে বলে, মোদিবিরোধী কার্পেট বম্বিং সবচেয়ে বেশি করেছেন এই দুজনই? ২০১৪-ও ভোটের ফল বলছে, বিজেপি পেয়েছিল ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভোট। তারপর কংগ্রেস, ৮ দশমিক ৬৫। দক্ষিণের সে সময়ের আম্মার দল, এআইএডিএমকে পেয়েছিল ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোট। আর পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল, তৃণমূল ছিল চতুর্থ স্থানে, ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ ভোট নিয়ে। সংসদে আসন হিসেবে বিজেপি সিঙ্গল লার্জেস্ট পার্টি হিসেবে উঠে এসেছিল প্রায় তিন দশক বাদে। ২৮২টি আসন পেয়ে, রাজীব গান্ধীর জমানার স্মৃতিকে উসকে দিয়ে। এবার সেই ম্যাজিক ফিগার ২৭২ তো দূরের কথা, জোট, এনডিএ হিসেবেও পাবে না বলে দাবি কংগ্রেস, অ-বিজেপি দলের নেতানেত্রীদের। যার মধ্যে বিজেপির জোট শরিক শিবসেনাও রয়েছে। তুলনায় কংগ্রেসের ৪৪, এআইএডিএমকের ৩৭, তৃণমূলের ৩৪-কোনো হিসাবের মধ্যেই ছিল না পাঁচ বছর আগে।

পাঁচ বছরে ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে গেছে। চাওয়ালা মোদির ভাবমূর্তি নিয়ে শুধু বিরোধীরা নয়, প্রশ্ন উঠছে অন্যত্রও। নোটবন্দি, বিলগ্নীকরণ, রাফায়েল, এনআরসি অভিযোগের তালিকার শুরুতেই। হিন্দুত্ববাদের স্লোগান অন্তত প্রকাশ্যে বলতে শোনা যায়নি বিজেপিকে। যে কারণে বারাণসীর সংসদ সদস্য খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অযোধ্যায় গিয়ে সভা করলেও, মন্দির-মসজিদ ইস্যুতে প্রায় নীরব থেকেছেন। আসলে গণতন্ত্রের তৃতীয় স্তম্ভকে সামনে রেখে বিজেপি যে ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চেয়েছে, তা স্পষ্ট শেষ দুই বছরে। রাম মন্দির থেকে তিন তালাক, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে শবরীমালা এমনকি রাফায়েল সবকিছুতেই শেষ দুই বছরে আদালতের রায়কেই ঢাল করেছে বিজেপি। অথবা ব্যবহার করা হয়েছে নিজেদের মতো করে। বাদ যাননি সনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীও। ন্যাশনাল হেরাল্ড ইস্যুতে জামিন পর্যন্ত নিয়ে রাখতে হয়েছে দেশের সব থেকে প্রাচীন দল, কংগ্রেসের দুই সর্বোচ্চ নেতানেত্রীকে। কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে রাহুল গান্ধী মনোনীত হওয়ার পরপরই পাপ্প-র রাজনীতি থেকে সংঘর্ষের রাজনীতিতে হেঁটেছেন নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা। বৃদ্ধতন্ত্র, মার্গদর্শন এখন বিজেপির সাংগঠনিক ডিকশনারিতে। বাস্তবে পুরোটাই মোদি-শাহ শো। সুষমা স্বরাজ, নীতিন গড়কড়ি, রাজনাথ সিংরা পেছনের সারিতে।

অন্যদিকে কংগ্রেসের পরবর্তী প্রজন্মের নেত্রী হিসেবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর অভিষেক হতেই কাউন্টডাউন শুরু। আমেঠীতে কবে প্রার্থী হবেন প্রিয়দর্শিনীর নাতনি তা নিয়ে। ওয়েনাডে কংগ্রেস জিতলে প্রিয়াঙ্কাই যে প্রার্থী আমেঠীতে তা বলতে কোনো রাজনীতির পন্ডিত লাগবে না। সেই রাজনীতিক পন্ডিতরাই কিন্তু ২০১৯-এ হাতে পেন্সিল নিয়েও অঙ্কটা কষতে পারছেন না ২৩ মে’র ফল, সঠিক কী হবে তা নিয়ে। মোদি-অমিত শাহ যতই ৩০০ আসন দাবি করুন না কেন, তা যে বেশ কঠিন জানেন নাগপুরের পথপ্রদর্শকরাও। আবার কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে বলে রাহুল গান্ধী নির্বাচনী প্রচার পর্বে যতই দাবি করুন না কেন, তা যে বেশ কঠিন তা বোঝেন তারই ইলেকশন ম্যানেজাররা।

২০১৪-তে কংগ্রেসের আসন ছিল ৪৪টি। এবার সেটা খুব বেশি হলে দ্বিগুণ হতে পারে, তিনগুণ হতে পারে কিন্তু বেশ কয়েকগুণ বেড়ে গতবারের বিজেপির মতো হবে, এতটা জোর দিয়ে বলার জায়গায় নেই রাহুল গান্ধীও। সেখানে বুথ ফেরত সমীক্ষা বলছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ গতবারের ৩৩৬-এর চেয়ে কমতে পারে অন্তত ৬০টি আসন। বেশি হলে ১০০ ছাড়াবে। অর্থাৎ ম্যাজিক ফিগার থেকে একটু হলেও দূরে আটকে যেতে পারে নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয়বারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা। বেশির ভাগ ভোট সমীক্ষায় শেষ পর্যন্ত বাস্তবের সঙ্গে ফারাক রেখেই দেয়। কারণ স্যাম্পেল সাইজ, প্রশ্নের ধরন, ভৌগোলিক এবং সামাজিক ফ্যাক্টর সমেত। ২০১৪-তে ইউপিএ মানে কংগ্রেসের জোটের আসন সংখ্যা ছিল ৫৯টি। এবার দ্বিগুণ হলে ১৩৮টি। তার মানে সরকার গঠন থেকে অনেকটাই দূরে। সেক্ষেত্রে নব্বইয়ের দশকের ছবিটা আবার দেখা যাবে কিনা, সেটাই এখন চর্চায়। হিসাব বলছে, ২০১৪-তে ১২৮টি আসন ছিল বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল জয়ললিতার কাছে ৩৮টি। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ৩৪টি। এবার বাংলার দিদি বিয়াল্লিশে ৪২ স্লোগান তুলেছেন ক্ষমতায় থাকার আট বছরের মাথায়। আঞ্চলিক স্তরে তেলগু দেশম পার্টি, জনতা দল সংযুক্ত। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করলেও, এরই মধ্যেই ভোট বাজারে সক্রিয়, ওয়াইএসআর কংগ্রেস। চন্দ্রশেখর রাও ভোট শেষের আগেই যেভাবে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে ঘুরেছেন, তাতে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিজেপির শরিক নয়, চন্দ্রশেখর গেছেন অ-বিজেপি আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কার হয়ে কাজ করছেন তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী।

দেশের সবচেয়ে বেশি লোকসভার আসন যেখানে, সেই উত্তরপ্রদেশে, বুয়া-ভাতিজা জোটের পর, বিজেপির আসন কমছে, নিশ্চিত। কিন্তু অ-বিজেপি সরকার গঠনের উদ্যোগ হলে বুয়া যে ভাতিজার হাত ধরেই। থাকবেন, এমন গ্যারান্টি নেই, জানেন, অখিলেশ যাদবও। ঠিক তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানেন বিরোধীদের সেতুবন্ধনের কাজ করা অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডুও পাখির চোখ করে রেখেছেন দিল্লিকে। তেমন হলে রাজনৈতিকভাবে ঘুমন্ত দেবগৌড়াও হাজির হয়ে যেতে পারেন আসরে, বয়স এবং গ্রহণযোগ্যতা ইস্যুতে নিজে স্বীকার না করলেও, কালীঘাটের দিদিকে স্ট্রং কন্টেন্ডার মানছে দিল্লির রাজনীতিও। কেজরিওয়াল, ফারুক আবদুল্লারা দিদির পাশে এমনকি লালুর দল, আরজেডিও। কিন্তু প্রতিবেশী বিজেডি এখনো অবস্থান পরিষ্কার করেনি। যেমনটাই পরিষ্কার নয়, শিবসেনার অবস্থানও। মহারাষ্ট্রের একদা। স্ট্রংম্যান, শরদ পাওয়ারও তেমন হলে আসরে হাজির হয়ে যেতে পারেন। এই অবস্থায় ২৩ মে ভিভিপ্যাটে রি-চেকের পরেও, ইভিএমে বন্দি জনতার রায়। বিজেপি বা নন বিজেপি, যেই সরকার গড়ুক স্পষ্ট নির্দেশিকা—জনাদেশ এলে, তা দেশের পক্ষেই মঙ্গল। ফল ত্রিশঙ্কু মানেই আবারও সেইঘোড়া কেনাবেচা, সেই চাওয়া-পাওয়ার রাজনীতি; যেখানে জনাদেশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

পিডিএসও/হেলাল