১ কোটি টাকাসহ গ্রেফতার বিজেপি নেতার সঙ্গী

প্রচণ্ড রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে নরেন্দ্র মোদি

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯, ০৯:১৪

পার্থ মুখোপাধ্যায়

নগদ ১ কোটি টাকা নিয়ে আসানসোল স্টেশনে ধরা পড়েছেন বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের আপ্তসহায়ক গৌতম চট্টোপাধ্যায়। ধৃতদের দাবি, পার্টির টাকা নিয়ে আসছিলেন তারা। সেই টাকা তারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং কী উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে আসানসোল স্টেশনের পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে দেখা যায় দুই মধ্যবয়সি ব্যক্তিকে। আরপিএফ জওয়ানদের সন্দেহ হওয়ায় তারা ওই দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। রেল পুলিশ তাদের সঙ্গে থাকা মালপত্র তল্লাশি করতে গিয়ে নগদ ১ কোটি টাকা উদ্ধার করে। রেল পুলিশের ডিজি অধীর শর্মা বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ওই দুজন বলেছিলেন, এই টাকা ব্যবসার টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এই টাকা তারা তুলেছেন। কোনো ব্যাংকের নথিই তারা দেখাতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেছেন, দিল্লি থেকে তারা টাকা নিয়ে আসছিলেন দলের নির্বাচনী খরচের জন্য। আদালত তাদের চার দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার নাম লক্ষ্মীকান্ত সাউ। দক্ষিণ দিল্লি থেকে ওই টাকা আনা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ। গৌতম জেরায় নিজের রাজনৈতিক পরিচয় স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে রেল পুলিশ।

এদিকে লোকসভা ভোট যত শেষের দিকে এগোচ্ছে, বেড়েই চলেছে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি। অলওয়ার গণধর্ষণ নিয়ে বহুজন সমাজ পার্টি নেত্রী মায়াবতীর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগেও তার জবাবে রাজনৈতিকভাবে মোদিকে পাল্টা জবাব দিয়েছেন মায়াবতী। কিন্তু সোমবার ফের সেই ইস্যুতেই মোদিকে নজিরবিহীনভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন মায়াবতী। তিনি বলেছেন, বিজেপি নেত্রীরা তাদের স্বামীকে মোদির আশপাশে দেখলেই আঁতকে ওঠেন। তারা ভয় পান, এই বুঝি মোদি নিজের মতো তাদেরও বিবাহবিচ্ছেদ করে দেবেন। মায়াবতীর আক্রমণের জবাবে বিজেপির বক্তব্য ব্যক্তিগত পরিবার নয়, দেশকেই নিজের পরিবার বানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২৬ এপ্রিল অলওয়ারে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে পেছনে বসিয়ে নিয়ে বাইকে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় দুটি বাইকে চারজন তাদের পথ আটকায়। রাস্তার পাশে জমিতে নিয়ে গিয়ে মহিলাকে গণধর্ষণ করে। একজন ঘটনার ভিডিও তুলে রাখে মোবাইলে। মোবাইল ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে পরে মোটা টাকাও দাবি করে দুষ্কৃতীরা। কয়েক মাস আগেই রাজস্থানে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিল মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি। সেই সূত্রেই নরেন্দ্র মোদি, মায়াবতীকে নিশানা করে বলেন, অলওয়ার গণধর্ষণ নিয়ে মায়াবতী সত্যিই উদ্বিগ্ন হলে রাজস্থানে কংগ্রেস সরকারের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিতেন। তার জবাবে সোমবার সাংবাদিক বৈঠকে মায়াবতী পাল্টা আক্রমণ করে বলেছেন, অলওয়ার গণধর্ষণ নিয়ে মোদি নীরব ছিলেন। এখন সেটা নিয়ে নোংরা রাজনীতি করছেন, যাতে তার দল বিজেপি ভোটে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পারে। এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক। যিনি নিজেই রাজনৈতিক ফায়দার জন্য নিজের স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছেন, তিনি কীভাবে অন্য কারো মা-বোনের সম্মান করতে পারবেন।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গেও রাজনৈতিক জনসভায় প্রায় প্রতিদিনই মোদির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একাধিক সভায় ব্যক্তিগত আক্রমণ করে চলেছেন। যিনি নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছেন এবং খোঁজখবরই রাখেন না, তিনি দেশ চালাবেন কীভাবে, এই প্রশ্ন তুলেছেন। পাল্টা মোদি-অমিত শাহরাও, স্পিডব্রেকার দিদি, তৃণমূলের তোলাবাজির অভিযোগ করে তা নিয়ে সরব হয়েছেন। খোঁচা দিয়ে চলেছেন মমতার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জুড়ে। কিন্তু মায়াবতীর ব্যক্তিগত আক্রমণে সে সবই ছাপিয়ে গেলেন বলেই মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি, মেঘ ও রেডার নিয়ে মন্তব্যে বিপাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই সাক্ষাৎকারের একটি অংশ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী মোদি এমন দাবি করেছেন, যা সময় এবং ইতিহাসের বাস্তবতার সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। ১৯৮৮ সালে ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ই-মেল ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কার্যত হাসির খোরাক হয়ে উঠেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। মোদি এও দাবি করেছেন, তিনিই সম্ভবত দেশের প্রথম ব্যক্তি, যিনি ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি বালাকোটে অভিযানে যখন বিশেষজ্ঞরা খারাপ আবহাওয়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, তখন তিনিই বলেছিলেন, মেঘের আড়ালে ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানকে ধরতে পারবে না পাকিস্তানের রেডার। তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কার্যত ট্রোলড, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

এর মধ্যেই আগামী রোববার, ভারতের লোকসভা নির্বাচনের শেষ অর্থাৎ সপ্তম দফা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তার রাজনীতির পারদ চর্চা পশ্চিমবঙ্গেও। এই নির্বাচনে একটাই মন্ত্র, মোদিকে হঠাও, দেশ বাঁচাও, সোমবার মেটিয়াবুরুজের নির্বাচনী সভায় বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিশানা করে মমতা বলেছেন, রাজীব গান্ধী, নরসিংহ রাওয়ের মতো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন, কিন্তু নরেন্দ্র মোদির মতো অভদ্র প্রধানমন্ত্রী দেখেননি। গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে একহাত নিয়েছেন মমতা। বলেছেন, বাঙালির মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদি। সবসময় মিথ্যা কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এর মধ্যেই আবার সোমবার কলকাতার খুব কাছে বারুইপুরে অমিত শাহের হেলিকপ্টার অবতরণের অনুমতি মেলেনি। আর সে কারণে বাতিল হয়েছে, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির সভা। পরে জয়নগরের সভায় অমিত শাহের মন্তব্য, ওটা মমতার ভাইপোর আসন। সে জন্য ভয় পেয়েছেন মমতা। তাকে সভা করার সুযোগ না দিলেও ভাইপোর হার নিশ্চিত বলে দাবি করেছেন মোদির সেনাপতি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না নিয়ে জয়নগরের সভায় অমিত বলেছেন, সিমেন্ট কিনলে, ইট কিনলে সিন্ডিকেট ট্যাক্স দিতে হয়। আগে রাজ্যে সিন্ডিকেট ট্যাক্স লাগত। এখন ভাইপোকে ট্যাক্স দিতে হয়। ভাইপো ট্যাক্স দিতে চান আপনারা? অমিতের কটাক্ষ, একটা সময় রবীন্দ্রসংগীত ও চৈতন্য মহাপ্রভুর কীর্তন শোনা যেত বাংলায়। নতুন একটাও কারখানা তৈরি হয়নি মমতার আমলে। খালি বোমা তৈরির কারখানা তৈরি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এর মধ্যে জানা যাচ্ছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে দাঁড় করাতে চাননি নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাকে রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সোমবার বজবজের জনসভায় নিজেই সে কথা স্পষ্ট করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, আপনারা গতবার ডায়মন্ড হারবার থেকে অভিষেককে নির্বাচিত করেছিলেন। আমার অনেক কর্মী রয়েছে, অভিষেকও কর্মী, ও মন দিয়ে তৃণমূল করে। যুব শাখার দায়িত্বেও আছে। এটা ভাববেন না ও কোনো সুবিধা পায়। কষ্ট করে কাজটা করে। এরপর মমতা বলেছেন, অভিষেক স্টার ক্যাম্পেনার হিসেবে কাজ করে। ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, দেব, নুসরাত, সুব্রত বক্সী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, মলয় ঘটক, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় আছে। জেলায় জেলায় এরা গিয়ে কাজ করে। মমতার কথায়, আমি একটা সময়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুই একটা কাজ কর এবার লোকসভায় দাঁড়াস না। আমি তোকে রাজ্যসভা করে দেব, আমার হাতে আছে। লোকসভা ছেড়ে দে। সারা বাংলায় ঘুরে বেড়াতে হবে। মমতার প্রস্তাব শুনে অভিষেক জবাব দিয়েছিলেন, তিনি রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হতে চান না। ডায়মন্ড হারবারেই থাকবেন। ডায়মন্ড হারবার ছেড়ে যাবেন না। অভিষেকের জবাব পেয়ে মমতার পর্যবেক্ষণ, আমি বুঝলাম, ডায়মন্ড হারবার নিয়ে ওর ভালোবাসা আছে।

পিডিএসও/হেলাল