এবার অ্যামনেস্টির খেতাব হারালেন সু চি

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:০১ | আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ১২:৩৯

অনলাইন ডেস্ক

মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে দেওয়া তাদের সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সংস্থাটি গতকাল সোমবার এক ঘোষণায় জানিয়েছে, সু চি তার এক সময়কার নৈতিক অবস্থান থেকে ‘লজ্জাজনকভাবে’ সরে যাওয়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর সেখান থেকে নতুন করে আরো সাত লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ঘটনায় এর আগেও আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা মিস সু চিকে দেওয়া তাদের খেতাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠেছে সু চির বিরুদ্ধে।

তাদের মধ্যে রয়েছে—কানাডার পার্লামেন্টের দেওয়া সম্মানসূচক নাগরিকত্ব, ব্রিটেনের অক্সফোর্ড শহরের দেওয়া সম্মাননা, গ্লাসগো নগর কাউন্সিলের দেওয়া ফ্রিডম অফ সিটি খেতাবসহ আরো অনেক সম্মাননা। এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলো লন্ডনভিত্তিক এই সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

এর আগে জাতিসংঘও রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো বর্মী সেনাবাহিনীর অভিযানকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা বলে উল্লেখ করেছে এবং এই অপরাধের দায়ে দেশটির শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আহ্বান জানিয়েছে।

২০০৯ সালে অং সান সু চি’কে ‘অ্যাম্বাসাডর অফ কনশেন্স’ বা ‘বিবেকের দূত’ খেতাব দিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গৃহবন্দি থাকার সময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় অং সান সু চির শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। সেই সম্মাননাই এখন প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। সংস্থাটির মহাসচিব কুমি নাইডু এক চিঠির মাধ্যমে অং সান সু চিকে এই খবরটি দিয়েছেন।

তিনি লিখেছেন, আট বছর আগে গৃহবন্দি থাকা নেত্রী ক্ষমতা গ্রহণের পর তার রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার কথা ভুলে সামরিক বাহিনীর চালানো জাতিগত নিধনযজ্ঞ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে ছিলেন উদাসীন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, সংস্থার একজন দূত হিসেবে সু চির কাছে প্রত্যাশা ছিল, শুধু মিয়ানমারের ভেতরে নয়, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অবিচারের বিরুদ্ধে আপনি আপনার নৈতিক কর্তৃত্ব ও ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু আমরা গভীর দুঃখ ভারাক্রান্ত। কারণ, আপনি আর আশা, সাহস এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেন না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আপনাকে দেওয়া ‘অ্যাম্বাসেডর অফ কনসায়েন্স’ সম্মাননা অব্যাহত রাখার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না, লিখেছেন সংস্থাটির মহাসচিব কুমি নাইডু।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, অং সান সু চির নেতৃত্বে বেসামরিক সরকার মিয়ানমারের ক্ষমতায় আসার পর তার প্রশাসন একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিল। রোহিঙ্গাদের ওপর অভিযানের কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি বলছে, গত বছর নিধনযজ্ঞ চলার সময় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা করেছে হাজারো মানুষ। ধর্ষিত হয়েছে অগণিত নারী ও শিশু, আটক ও নৃশংসতার হাত থেকে রেহাই পায়নি বৃদ্ধ, শিশু এবং কিশোরও। শতাধিক গ্রাম আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় অস্বীকার করে অং সান সু চি ও তার দফতর তাদেরকে রক্ষা করেছেন। সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গাদের পক্ষে অং সান সু চির দাঁড়ানোর ব্যর্থতাই এর মূল কারণ। ভয়ঙ্কর নিপীড়ন এবং নির্যাতনের এইসব ঘটনা অস্বীকার করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশে কিংবা রাখাইন রাজ্যে অবস্থানরত লাখো রোহিঙ্গার জীবনমান উন্নয়নের বা পরিবর্তনের আশা ক্ষীণ। নৃশংসতা থামাতে ভবিষ্যতে সরকারের উদ্যোগ কেমন হতে পারে তা সহজেই বোঝা যায় যখন একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের কথা অস্বীকার করে রাষ্ট্রযন্ত্র।

সংস্থাটি বলছে, সামরিক বাহিনীর বিস্তর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আইন তৈরি ও সংশোধনের বেশ কিছু ক্ষমতা ছিল বেসামরিক সরকারের হাতে। কিন্তু অং সান সু চির সরকার ক্ষমতা গ্রহণের দু’বছরের মাথায় মানবাধিকার কর্মী, শান্তিকর্মী ও সাংবাদিকদের হুমকি, ভয়, হয়রানি এমনকি কারাবরণও করতে হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, অং সান সু চি সাহায্য করুণ আর নাই করুন, মিয়ানমারে বিচার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে তারা তাদের লড়াই অব্যাহত রাখবে। সূত্র : বিবিসি

পিডিএসও/হেলাল