অবশেষে পার্টি অফিসে উঠেছেন মানিক সরকার

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৮, ২০:১৯

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতের সম্পদহীন এক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার অবশেষে ঠাঁই নিয়েছেন পার্টি অফিসে। টানা ২০ বছর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে রাজ্যের অন্যতম রাজনৈতিক সংগঠন সিপিএমের সভাপতিও। ১৯৯৮ সাল থেকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই নেতার নিজের কোনও গাড়িও নেই। এখন তার ব্যাংকে যে রুপি গচ্ছিত আছে তা আগের চেয়েও কম। ২০১৩ সালের নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামা থেকে জানা গেছে, তখন তার ব্যাংক হিসাবে ছিল ৯ হাজার ৭২০ রুপি।
অবশ্য তিনি তার মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে একটি বাড়ি পেয়েছিলেন। তাও আবার একা নন। ৪৩২ বর্গফুটের সেই টিনশেডের বাড়িটি পেয়েছেন তার বোনের সঙ্গে যৌথভাবে। শহরের বাইরে কৃষ্ণনগরে বাড়িটির অবস্থান। সেদিক থেকে এককভাবে একটি বাড়িরও মালিক নন ২০ বছরের এই মুখ্যমন্ত্রী। নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের শপথ নেওয়ার একদিন আগে গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি ছেড়ে আসেন ত্রিপুরার সরকারি বাসভবন। তার নতুন আবাস দলীয় কার্যালয়ের অতিথি ভবন। দলের সিদ্ধান্তেই তিনি অতিথি ভবনে উঠেছেন।
খবরে প্রকাশ, গত ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজেপির কাছে পরাজিত হয়েছে সিপিএম। নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব আজ শুক্রবার শপথ নিয়েছেন। তার আগে গতকালই মার্কস অ্যাঙ্গেলস সরণিতে সরকারি বাড়ি ছেড়ে দিলেন মানিক সরকার। সিপিএমের স্টেট পার্টি সেক্রেটারি বিজন ধর জানান, দলের গেস্ট হাউসের একটি কক্ষে স্ত্রী পাঞ্চোলি ভট্টাচার্যকে নিয়ে থাকবেন সদ্য সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী।
সিপিএমের অফিস সেক্রেটারি হরিপদ দাস জানিয়েছেন, দলীয় কার্যালয়ের রান্নাঘরে তৈরি খাবারই খাবেন মানিক সরকার। তিনি বলেন, এর মধ্যে কিছু বই, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিস ওই কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন মানিক সরকার। তবে সরকার থেকে বরাদ্দ পেলে নতুন বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে পারেন তারা। এর আগে পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মানিক সরকারের স্ত্রী জানান, মার্ক্স রচনাবলিসহ বেশ কিছু বই রাজ্য সরকারের বীরচন্দ্র স্টেট সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ও সিপিএমের দলীয় লাইব্রেরিতে দিয়েছেন তারা।
মানিক সরকার ভারতের সবচেয়ে কম সম্পদশালী মুখ্যমন্ত্রী। তার হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ মাত্র ১ হাজার ৫২০ রুপি এবং ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা আছে ২ হাজার ৪১০ রুপি। নির্বাচনের আগে ধনপুর আসনের প্রার্থিতার জন্য দেওয়া হলফনামায় সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব তুলে ধরেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার ৬৯ বছর বয়সী এই পলিটব্যুরো সদস্য।
চাকরি শেষে পাওয়া অর্থের বদৌলতে সম্ভবত ব্যাংক হিসাবে ১২ লাখ টাকা গচ্ছিত রয়েছে মানিকের স্ত্রীর। রয়েছে ৬০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি বাড়িতেই থাকতেন নিঃসন্তান মানিক সরকার। কোনও দেহরক্ষী নেই তাদের। নেই কোনও গাড়ি। দলীয় রীতি মেনে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া সরকারি ভাতার সবটাই তিনি দলকে দিয়ে দেন।
সিপিআই-এমের নেতা হরিপদ দাস বলেন, দলের রীতি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া বেতনের পুরো ২৬ হাজার ৩১৫ রুপিই মানিকদা দলের তহবিলে দিয়ে দেন। আর দলের কাছ থেকে ভাতা বাবদ ৯ হাজার ৭০০ রুপি নেন। আমরা মানিকদার সাধারণ জীবনযাপন অনুসরণ করার চেষ্টা করি। টিফিন হিসেবে তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার মুড়ি। মানিকদার স্ত্রী পাঞ্চোলি ভট্টাচার্য কখনও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন না। তিনি রিকশা ও পাবলিক বাসেই যাতায়াত করেন বেশিরভাগ সময়। এই প্রসঙ্গে মানিক জানিয়েছিলেন, সবচেয়ে দরিদ্র মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাকে নিয়ে হওয়া আলোচনায় তিনি মজা পান।
খুব সাধারণ ঘরে জন্ম মানিক সরকারের। তার বাবা ছিলেন দর্জি আর মা সরকারি কর্মচারী। মাত্র ২৯ বছর বয়সে ছাত্রনেতা থেকে সিপিএমের ত্রিপুরা রাজ্য কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৮০ সালে আগরতলা থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন তিনি। আর ৪৯ বছর বয়সে মানিক সরকার অভিষিক্ত হন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী পদে।
ত্রিপুরায় ২৫ বছরের বাম শাসনামলের ভেতর ২০ বছরই মানিক সরকার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ‘চল বদলাই’ স্লোগান দিয়ে জয়ের কাছাকাছি থাকা বিজেপির জন্য সহজ ছিল না তাকে পরাজিত করা। ত্রিপুরার জন্য নির্ধারিত সমন্বয়ক বিজেপি নেতা সুনীল দেওধরের কথাতেও সেটা স্পষ্ট। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে ত্রিপুরাতে জয়ী হওয়াই সবচেয়ে কঠিন।’ কেন্দ্রে যখন বিজেপির অটল বিহারী বাজপেয়ী ছিলেন তখন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মানিক সরকার।

পিডিএসও/মুস্তাফিজ