করুন করোনা, বইয়ের করুণা

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২০, ১৯:১৯ | আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২০, ২০:০৭

অলাত এহ্সান

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড়ভাই বিজ্ঞানের ভালছাত্র ছিলেন। সেই সুবাদে (সম্ভবত) সরকারি বিজ্ঞানাগারে চাকরি হলো তার। যেই তিনি চাকরিটা পেলেন, অমনি তার পড়াশোনা লাটে উঠল। বিজ্ঞানের বই পড়লেন মানিক, কিন্তু তার চাকরির দৌড় ছিল না।

শাহবাগে জাতীয় গ্রন্থাগারের সামনে সকাল থেকে শতগজি ব্যাগের সারি, তা কেবলই মহার্ঘ্য বিসিএসের জন্য, তার বেশি নয়। এই যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা-ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস সহ নানা বিষয়ে বিস্তর ছেলেপুলে বের হচ্ছে, তারা কি চাকরির পর কিছুমাত্র বই পড়েন? তথাকথিত মেধাবীদের অবস্থা আরো বাজে। বড় ডিগ্রি থাকার পরও বিজ্ঞান মনস্ক নয়, চাকরির পরীক্ষা ছাড়া তাদের পাঠের আর দৌরাত্ম নেই। আরজ আলী মাতুব্বর বলেন, ‘বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে, জ্ঞানের কোনো ডিগ্রী নেই; জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন।’

ছাত্রদের কথা ছাড়, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা কি পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোনো বই পড়েন? সেই যে কলেজ ছাড়া সময় শেষ পাঠ্য বই আর চাকরি নেয়ার সময় নিয়োগ গাইড পড়ে ছিলেন, তারপর আর কোনো খবর আমরা জানি না। অথচ ততদিনে দুনিয়া কত বদলে গেছে। আমার বিস্ময় জাগে, প্রতিদিন নতুন কিছু না পড়ে অতগুলো জিজ্ঞাসু চোখের সামনে দাঁড়ায় কি করে? হিম্মত একটাই, ওই কোমলমতি মনকে মেরে-ধমকে তাদের মতো ভোঁতা করে দিবেন, আর উপশম হিসেবে দেখাবেন চাকরির লোভ। প্রেমেন্দ্র মিত্র যাদের বলেছেন, ‘কেবল কেরানী’। মাঝে মাঝে মনে হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ‘কাঠামোগত মৃত্যুর কারখানায়’ পরিণত হয়েছে। দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরকে ‘স্বশিক্ষিত’ বলেও তাদের শিক্ষাদানকে মহিমান্বিত করতে পারলেন না। সেই আরজ আলী স্কুল-কলেজের চেয়ে লাইব্রেরিকে উপরে স্থান দিতেন। অথচ হাইস্কুলের লাইব্রেরিগুলোর অযত্ন-অবহেলায় সৌচাগারের চেয়েও বাজে অবস্থা।

দেশের শিক্ষার হার নাকি ৬৫.৫%, সাক্ষরতা আরো বেশি। কি মানে বহন করে এর? এত এত ডিগ্রি আছে, কিন্তু পাঠ অভ্যাস নেই। এই ‘শিক্ষিত’ মানুষ যদি বছরে অন্তত ১টা বই পড়তেন, তার সংখ্যা কত হয় ভেবেছেন! কত অযুহাতই ছিল। কে যেন বলেছিলেন, বাঙালির (ডান-বাম) দুই হাতের চেয়ে ‘অযুহাত’ই বড়। এই করুন করোনার দিনে বইয়ের করুণায় সময় কাটানোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায় আর কি হতে পারে। আরো সুবিধা হলো, অনলাইনেই বই কিনে ঘরে বসেই গ্রহণ করা যায়। অথচ বিক্রির অভাবে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রসিদ্ধ সব বইয়ের দোকান।

কাঁটাবনের দীপনপুর, কবিতা ক্যাফে, নালন্দা বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন ভেঙে ফেলা হয়েছে দেশের প্রাচীন নিদর্শন, স্থাপনাগুলো; বিপর্যস্ত প্রকৃতি। কনকর্ড এম্পোরিয়ামেও সেই গুমোট হাওয়া ঘোরপাক খাচ্ছে। বন্ধ হতে পারো আরো কিছু প্রকাশনী। এই দুরাবস্থার মধ্যেই ভাল খবর হলো কাঁটাবনের ‘প্রকৃতি প্রকাশন’ আবার খুলতে শুরু করেছেন সৈকত হাবিব ভাই। তিনিই আমার একমাত্র গ্রন্থ ‘অনভ্যাসের দিনে’র প্রকাশক। তার বন্ধ দিনে আমার আশ্রয় ছিল পশ্চিমবঙ্গে বইয়ের সমাহার ষড়ৈশ্বর্য মুহাম্মদ ভাইয়ের ‘উজান প্রকাশন’। অন্যান্য প্রকাশনীর বই স্টল তো আছেই। সবাই অনলাইনে বই বিক্রি শুরু করেছেন। তাই বই কিনুন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিদ্ধস্ত ঘরবাড়ির চেয়েও ভয়াবহ এক অবস্থা দেখে ছিল বিশ্ব। সবাই মানসিক বৈকল্যে ভুগছেন, বিষাদের ভেতরেই বেড়েছে অমানবিকতা। শিশু ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা বেশি খারাপ। মনোবিদ-গবেষকরা দেখালেন, যুদ্ধের সময় ঘরে বন্দি থেকে থেকে এই অবস্থা। সমাধান হলো, গৃহবন্দি দিনে বই পড়লেই এই অবস্থা অনেকাংশে এড়ানো যেতো। করোনা শেষে আমাদেরও না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অবস্থায় পড়তে হয়। ইতোমধ্যেই তার নমুনা দেখা যাচ্ছে। গৃহাবস্থানের দিনে পাঠ্য বইয়ের বাইরে মননশীল বই পড়াই হতে পারে এ অবস্থা এড়ানোর বড় উপায়। 

এতদিন ধরে, অন্তত পাঁচ ফুটের অধিক লম্বা দেহের উপরে যে মাথার ভার বহন করলেন, তার ভেতর একতাল মগজ সুরক্ষিত আছে, তাকে ব্যবহার করুন। নয়তো বৃথাই এই ভার বহন করা। তাই বই পড়ুন।

লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক