আমার বইমেলা পর্ব-৭

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩:৫৬ | আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:১৭

জোবায়ের মিলন

একদিন একদিন করে এক সপ্তাহ পেরিয়ে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ দ্বিতীয় সপ্তাহে পড়েছে। এর মধ্যেই ভরে উঠেছে বইমেলা। চতুর্দিক থেকে মেলায় আসছে পাঠক, লেখক প্রকাশক। ভ্রমণ পিপাসু, দর্শনার্থীরা। গ্রন্থপ্রেমীদের ভিড়ে ভরপুর মেলা প্রাঙ্গণ। স্টলের পর স্টল সাজিয়ে বসেছে বই প্রকাশকেরা। তাতে পাঠকের, লেখকের, উৎসুক আগ্রহীদের অভাব নেই। বিকালে গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

মেলা এবার বৃহৎ পরিসরে। আগের চেয়ে আয়তনে বেড়েছে তিনভাগের একভাগ। বাংলা একাডেমি উঠান থেকে প্রকাশকেরা পুরোপুরি এখন উদ্যানে। অল্প সংখ্যক সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সবাই ঐতিহাসিক স্থান সোহরাওয়ার্দীতে। কিছু বছর আগে মেলা বাংলা একাডেমি অঙ্গন থেকে উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ‘মেলার অনিষ্ট হলো’ বলে বলে কথার খই ফোটে। অগ্নি-আগুন কথা ঝরে। এখন সর্বাঙ্গে মেলা সম্প্রসারিত স্থানে। অনিষ্টের বদলে মেলা চলছে সহি-সালামতে। সেই সঙ্গে  লিটলম্যাগও বহেড়াতলা ছেড়া মূলধারার সঙ্গে একাত্ব।

বিস্তৃত মাঠে অমর একুশে গ্রন্থমেলা অর্থাৎ বইমেলা এখন বিশাল। তারপরও মেলায় লোক ধরে না। এতে লোক কোথা থেকে আসে! বইয়ের প্রতি এতে লোকের টান! এতে লোক বইয়ের সঙ্গে যে কোনোভাবেই আছে; ভাবতে অবাক লাগছে, কিন্তু আছে। চোখে দেখছি। সন্ধ্যার পরে গায়ে গায়ে গা লেগে চলছে পাঠক, লেখক, প্রকাশক। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো বইপ্রেমিক; উৎসুক। দেখা যায় ভিন্ন ভাষার বিদেশিও। হন হন করে ছুটছে। হাতে বইয়ের ব্যাগ। মেলার মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই—এ বইমেলা। মনে হয় উৎসব।

এও সত্য, একুশে বইমেলা এখন আর শুধু লেখক বা পাঠক বা প্রকাশকের মধ্যে বৃত্তাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে সর্বসাধারণের মধ্যে। সব ধরণের লোক এখানে আসে। সব পেশার, সব নেশার লোকও আসে। ঘুরে ঘুরে এসব লোক দেখি। দেখে দেখে পড়ি। 

শিশুরাও আসে মেলায়। গত কয়েক বছর থেকে শিশুদের জন্য নেওয়া হয়েছে আলাদা করে ভিন্ন রকম উদ্যোগ। অন্যদিন বিকাল ৩টা থেকে মেলার দুয়ার খুললেও শুক্র ও শনিবার শিশুদের জন্য অনন্য আয়োজন শিশু প্রহরের দরজা খোলে সকাল ১১টায়। চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এখানে থাকে শিশুদের বই, খেলার নানান ব্যবস্থাও। শিশু আর অভিভাবকের কলতানে কলকল রব বয় মেলা অঙ্গনে। এ এক অন্যরকম সৌন্দর্য। ফুলের কলির মতো শিশুদের কত রকম যে ওড়াওড়ি, ঘোরাঘুরি, দৌড়াদৌড়ি, আবদার, বায়না, মান, অভিমান, খিলখিল হাসাহাসি—এক কোণে দাঁড়িয়ে এসব দেখি, ওদেরকে দেখি। ভালোলাগে। 

রোজ শত নতুন বই প্রবেশ করে মেলার স্টলে স্টলে। মেলার একদিকে সে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আরেক দিকে ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে লেখকে লেখকে কথা। আরেক দিকে মোড়ক উন্মোচন। অন্যদিকে জমা পড়া বইয়ের নাম ঘোষণা। কোণা কোণায় চলে আড্ডা। গরম গরম টুকটাক খাবারও পাওয়া যায় পূর্বদক্ষিণ কোণে। পশ্চিম দিকে। আছে বাংলা একাডেমির তথ্য কেন্দ্র। স্বল্প হলেও আছে নিরাপত্তাকর্মী।

কত মানুষের আনাগোনা মেলাজুড়ে। বড় বড় প্রকাশনী হিমশিম খেয়ে উঠছে ক্রেতা সামলাতে। ক্লান্ত বদন হলেও, তাদের ঠোঁটে খুশির হাসি। ছোট ছোট প্রকাশনী ধীরে-স্বস্তিতে বিক্রি করছে। চলছে সবকিছু মোটামোটি। প্রথম দিন থেকে বই বিক্রিলব্ধ অর্থের আয়ের সূচক ঊর্ধ্বমুখী। তা বাড়ছে ধীরে ধীরে।

প্রতিদিনই মেলায় আসছে সদ্য পুষ্ট বই। পুরনো লেখকের সঙ্গে নতুন লেখকের হচ্ছে সংযোগ। নতুনদের বইও চলছে মোটামুটি। কখনো কখনো লেখক কিনছে লেখকের বই, কখনো কনিষ্ঠ লেখক জ্যেষ্ঠ লেখকের হাতে নিজের বই উপহার দিয়ে করছে করমর্দন। চলতে চলতে অচেনা বন্ধু দেখা পাচ্ছে বন্ধুর, সংযোগহীন স্বজনের সঙ্গেও দেখা হয়ে যাচ্ছে স্বজনের। সব মিলে একুশে বইমেলায় বইয়ের মহোৎসব। উৎসব জমেছে, জমে উঠবে আরও। 

অমর একুশে গ্রন্থমেলা—এ যেন বাঙালি সাহিত্যানুরাগের প্রাণ পেরিয়ে প্রাণান্তরের মিলন মেলা। বইমেলা যেন সর্বস্থরের মানুষের আনন্দের মেলা। এ বড়ই আনন্দের।

চলতি সময়ে একুশে গ্রন্থমেলা সাধারণের মধ্যে প্রবেশের যে শ্রম, যে পরিশ্রম—তা প্রশংসার দাবি রাখে নিঃসংকোচে। একইভাবে ভয়েরও সংশয় কম নয়। মহৎ উদ্দেশ্যের যেকোনো কিছুই যখন হাতের মুঠো থেকে পুরো হাতে ছড়িয়ে পড়ে, বিস্তার লাভ করে, গণমানুষের কাছে চলে যায়তখন অনেক সময় শুভ দিকের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রণের দিকটি হয়ে যায় কঠিন। সে দিকটি হেলায় অবহেলা করা সমীচীন নয়। যারা কর্তা-কর্মে আছেন তারা দেখবেন, ভাববেন। চিন্তা করবেন। পরিকল্পনা সাজাবেন। সাফল্যের হাসির সঙ্গে অসাফল্যের খুঁটিনাটির নোট নেবেন—অধিক সাফল্যের জন্য। 

একুশে গ্রন্থমেলা দিনকে দিন জাহির হোক, ছড়িয়ে পড়ুক, দেশ থেকে দেশে। তবে তা অবশ্যই আয়তন আর বিক্রিলব্ধ অর্থের হিসাবে নয়; মান ও গুণের বিশদ বিচারে। আমার প্রাণের মেলা, আমার সৃজনশীল বইয়ের মেলা, আমার অমর একুশে গ্রন্থমেলা একুশের রঙ ধারণ করে বেঁচে থাকুক মানুষের মনে, প্রাণে। এ আমার প্রার্থনা।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সংবাদকর্মী
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল