আমার বইমেলা পর্ব-৫

প্রকাশ | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪:১৯ | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:৫৪

জোবায়ের মিলন

যে বইটা পড়বে না সে বইটা কিনবে না। অকারণে অপচয়ের মানে হয় না। মেলায় এসছো, আসো। যে কেউ আসতে পারে। আসতে নিষেধ নেই। ভ্রমণের হরেক উপ-স্থানের মতো বইমেলাও তোমার একটি স্থান হতে পারে। দর্শনীয় অনেক স্থানের মতো এখন বইমেলাও একটি। স্মৃতিতে গেঁথে রাখার মতো তো বটেই।

লেখক, প্রকাশক, প্রচ্ছদ কারিগর তোমার পরিচিত, বন্ধু, আপনজন, কাছেরজন, চেনাজন হতেই পারে! কাছেই রাখো, কাছেই থাকো, দূরে যাওয়ার হেতু নেই। কিন্তু ক্ষতি! কী করে হতে পারে? তুমি তো তোমার চেনা-জানা প্রিয় মানুষটির ক্ষতি করতে পারো না, পারো কি? না, মোটেও না। শুধু অনুরোধে, লজ্জায়, চোখশরমে বই কিনে আদতে কোনো লাভ আছে কী? তার চেয়ে তোমার যা পছন্দের, শখের, উপভোগের—তুমি তা করো।

বইমেলায় আসলেই একটি/একাধিক বই কিনে, বইয়ের বাহারি ব্যাগ বহন করে পাঠক সাজার দরকার নেই। বাজারে কদরি সাজাও এক প্রকার হীনতা। মুখের উপর মুখ সেঁটে কত দূর যাওয়া যায়, বেশি দূর না। কয়েক কদম হাঁটলেই তা ধরা পরে যায়। সিগারেটে অনভ্যস্ত তরুণ বা তরুণীটি যখন বন্ধু-আড্ডায় নিজেকে সমকক্ষ বা অতিস্মার্ট সাজাতে গিয়ে মধ্যমা আর তর্জনীর ফাঁকে সিগারেটের শলাকা পুরে নম্র ঠোঁটের ভাঁজে সামিল করে টান দেয়, তখন কিন্ত মোটেও লুকোনো যায় না তার সত্য চেহারা। যে কেউ বুঝে যায় তার কৃত্রিমতা। তখন ধুমপায়ীকে সাধারণ যতটুকু না গালমন্দ করে, তার চেয়ে অধিক গালমন্দ করে তাকে, মনে মনে।

পাঠক, পাঠক সাজার দরকার নেই। শখের ক্রেতা হবার দরকার নেই। প্রকাশককে লাভবান করার দরকার নেই বইয়ের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে। বইয়ের সভ্যনগরে দরকার বইয়ের সুশীল পাঠক। বইমেলা, বইয়ের মেলা। বই জ্ঞানের আঁতুরঘর, জ্ঞানীর উপসনালয়। সে বইটি তুমি কেনো, যে বইটি তোমাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর মানসিক ও মানবিক হতে একবিন্দু জ্ঞান দিয়েও সহায্য করবে। সে বইটি তুমি কেনো, যে বইটি তোমার হাত থেকে উপহার পেয়ে অন্যজন জ্ঞানের আধারে প্রবেশ করবে। খামোখা অপ্রয়োজনীয় আর অপাঠ্য বইটি কেন কিনবে, শুধু  কাউকে খুশি করার জন্য! এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে, মারাত্মক হচ্ছে বইয়ের বাজার, তা কি অনুমান করতে পারছো? কেবলই মুখ রক্ষার্তে যার বই তুমি কিনলে সে মোটেও ভাবতে পারলো না, তার বই কতটা মানযোগ্য। বিক্রির বরকত দেখে সে হয়তো পরের বছরও আরেকটি ভুলবালের বই নিয়ে আসবে।


এক স্টলে দেখলাম গাইড বই বিক্রি হচ্ছে, কী অদ্ভুত! এর নাম কি অমর একুশে গ্রন্থমেলা, এই কি এর মর্মকথা? সতর্ক হতে হবে—বইমেলা যেন না হয় বারোয়ারি মেলা


লোক দেখাতে, শখের বশে, আর্থিক দম্ভে, সামাজিক স্ট্যাটাসের লোভে যে লেখক মানহীন বই লেখে তাদের পরিহার হোক; অনুরোধে ঢেঁকি গিলে আর অন্য কিছু হলেও বই না বরং ওই অর্থ দিয়ে কেনা হোক খোঁজ, খবর নিয়ে একটি ভালো বই। তবে কি নতুন লেখকের বই চলবে না! কেউ কিনবে না? কেন না। অবশ্যই কিনবে। দুই চার পাতা পড়ে, বুঝে, দেখে কিনবে। প্রয়োজনে সময় নিয়ে নেড়েচেড়ে কিনবে। শুধুই বন্ধু বলে না, পরিচিত বলে না, অনুরোধে ঢেঁকি গিলে না। ঘুরতে ঘুরতে না, মিথ্যা পাঠক সাজতে না, গার্লফ্রেন্ডকে দেখাতে না, তোষামদি করতে না। যাচাই-বাছাই করে ভালো বই কিনলে ভালো লেখকেরাও উদ্বুদ্ধ, বইয়ের মতো বই কেনা হলে বইয়ের নামে বস্তাপচা আলুপটল সেও দূর হবে। শখের লেখক, সঙের লেখকদেরও শখ মিটবে, গু গোবর লিখে যে লেখক হওয়া যায় না তা বুঝবে। ...বুঝা উচিৎ, বই সেই পণ্য না, যে পণ্য বাণিজ্য মেলায় চলে।

বাংলা একাডেমির প্রতি উদাত্ত্ব আহ্বান; বইমেলার আয়তনেরর দিকে নয়, বইয়ের মানের দিকে নজর দিন। বইমেলায় কী বই আসছে তা পুলিশের বোঝার কথা না, তা বুঝার কথা মেলা কর্তৃপক্ষের। বই যদি হয় মেধা গঠনের, জাতি গঠনের হাতিয়ার তবে বই বিক্রি নয়, মেধাবী বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোই উচিৎ। পাঠকের কাছে পৌঁছানের কৌশল না বাড়িয়ে মেলায় লোক সমাগমের পলিসি বাড়ালে হিতে বিপরীত হবে একটা সময়; যখন আফসুস ছাড়া উপায় থাকবে না। এ বছর এক স্টলে দেখলাম গাইড বই বিক্রি হচ্ছে, কী অদ্ভুত! এর নাম কি অমর একুশে গ্রন্থমেলা, এই কি এর মর্মকথা? সতর্ক হতে হবে—বইমেলা যেন না হয় বারোয়ারি মেলা।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সংবাদকর্মী
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল