১৬ ডিসেম্বরের অপেক্ষায়

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৩:৫৪

মাহাথির মোবারক

গফুর মিয়া গোয়াল ঘর থেকে দুটো গরু বের করে মাঠে নিয়ে যাবে—এমন সময় মানুষের চিৎকারের আওয়াজ তার কানে ভেসে আসলো। পাকসেনারা বাংলার খেটে-খাওয়া মানুষদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কোথাও শান্তি নেই, চারদিকে শুধু চিৎকার আর গুলির শব্দ। অসহায় মানুষগুলোর লাশ একে একে নদীর ধারে, রাস্তার ধারে পরে আছে। এমন কোন মানুষ নেই যে, এই লাশগুলোর জানাযা দিবে কাফনের কাপড় পড়াবে।

কোন কোন লাশ কুকুরে শকুনে খাচ্ছে। মানুষের লাশের গন্ধে চারদিকে বাতাস দূষিত হচ্ছে। কেউ হারাচ্ছে বাবা কেউ হারাচ্ছে মা, কেউ আবার ভাই-বোন সন্তান হারিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পাগলের মতো ঘুরছে। গফুর মিয়া তখন কোন উপায় না পেয়ে চোখ থেকে পানি ঝরছে। বাংলা মাতৃভূমি রক্ষার জন্য সাথে সাথে নিজের হাতের গরুগুলো ছেড়ে দিয়ে হাতে লাঠি নিয়ে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে চলে গেল।

কিছু দূর যাওয়ার পরই রাস্তার পাশে তার বড় ছেলের লাশ পড়ে থাকতে দেখলো। হাতের লাঠি ফেলে দিয়ে গফুর মিয়া ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলল, দেশের তরে যে জীবন বাজি রেখে মৃতু্বরণ করে সেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। আজ তোমার মৃত্যুতে আমার আফসোস বা কান্না নেই, কারণ তুমি মাতৃভূমির জন্য শহীদ হয়েছো। এ বলে ছেলের লাশ সেখানে রেখে লাঠি হাতে নিয়ে সামনে চলতে লাগলো। কিছূ দূর যাওয়ার পর পূর্ব বাংলাদেমের ক্যাম্পে বাঙালিদের সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধ শুরু করে দিলো।

বাড়ি থেকে গফুর মিয়ার কাছে খবর পাঠানো হলো, তার বউ আর যুবতী মেয়েকে পাকসেনারা তুলে নিয়ে গেছে। গফুর মিয়ার চোখে তখনো কোন পানি নেয়, মুখে শুধু একটাই কথা—ইনশাআল্লাহ মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেই ছাড়বো। বাঁচলে গাজী আর মরলে শহীদ।

দীর্ঘ ন'মাস যুদ্ধ করে যখন পাকসেনারা বাংলার মানুষের কাছে হার মেনে মাথা নিচু করে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যেতে লাগলো, তখন মানুষ বুঝতে পারলো হয়তো আল্লাহর সাহায্য আমাদের উপর এসেছে। হয়তো আমরা নিজেদের রক্তের বিনিময়ে এ দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি। গফুর মিয়া এবার হাতের রাইফেল আর বন্ধুক জমা দিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলো আর কান্বায় ভেঙে পড়লো তাদের বাড়ির কোন চিহ্ন নেই। পাড়া প্রতিবেশী কেউ নেয়, কোন বাড়িঘরও নেয়। আছে শুধু মানুষের লাশের স্তুপ। সবখানেই মৃত্যু হয়ে মানুষগুলো পড়ে আছে। নিজের বাবার কবরটাও নেই। কে যেন ভেঙে ফেলেছে। বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান কেউ নেই, কোথায় তারা? কি হলো তাদের? বাড়ির পেছনেই আদরের ছোট্ট মেয়ে মারিয়ার মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে পড়ে আছে। গফুর মিয়া মারিয়াকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লো, গালে চুমু দিয়ে বলতে লাগলো মা!  উঠো দেখো তোমার বাবা এসেছে। তুমি না বলেছিলে, বাজার থেকে পুতুল নিয়ে আসতে। এনেছি, উঠো মা। কিন্তু গফুর মিয়ার ডাকে সাড়া দিলো না মারিয়া।

১৫ ডিসেম্বরের রাতে সারা রাত চোখে ঘুম নেই গফুর মিয়ার। সে শুনেছে কাল সকালেই নাকি মাতৃভূমির বিজয় ঘোষণা হবে! রক্তে মাখা লাল সবুজের পতাকা দেখে  মনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট মুছে যাবে। সারা রাত অপেক্ষার পর সকাল বেলা যখন ১৬ ডিসেম্বর বার্তা নিয়ে সুর্যটা পূব আকাশে উদিত হলো, একটু পরই রক্তে ভেজা লাল সবুজের পতাকা মুক্ত আকাশে উঠানো হবে, ঠিক সেই সময়ের অপেক্ষা করতে করতে গফুর মিয়ার মৃত্যু হয়। ভাগ্য হলো না তার রক্ত ভেজা লাল সবুজের পতাকাটি দেখা। যে পতাকার জন্য সে নয় মাস যুদ্ধ করে নিজের পরিবার হারিয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল