মিথ্যার দাপটে সত্য আজ কাঠগড়ায়

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৪০

আকরামুল ইসলাম

মিথ্যার দাপটে সত্য দাঁড়িয়েছে আজ আদালতের কাঠগড়ায়। এমন ঘটনা অহরহ গোটা সমাজে। মিথ্যা আর ক্ষমতার দাপটে দুর্নীতিবাজরা আজ বুক উচিয়ে, মাথা নুইয়ে পড়ছে সত্যরা। সত্য হারাচ্ছে মিথ্য্যার আড়ালে। সত্যের বাহক গড়াগড়ি দিচ্ছে আদালতের কাঠগড়ায়।

সাংবাদিকের ওপর হামলা মামলার ঘটনা নতুন নয়। সম্প্রতি সাতক্ষীরার সাংবাদিক পরিবারের সদস্যের নামে আদালতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে মামলা করেন তিনি।

মামলার আসামি সাতক্ষীরার স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন সংবাদকর্মী হিসেবে পরিচিত বরুণ ব্যানার্জী। তিনি একাত্তর টিভির সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ও অনলাইন দৈনিক সাতক্ষীরার সম্পাদক। শুধু এই পরিচয়ই নয় তিনি সাতক্ষীরার পরিচিত সাংস্কৃতিক সংগঠন দীপালোক একাডেমীর পরিচালক, জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সদস্য। সামাজিক সংগঠন ভালোবাসার মঞ্চের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক।

অন্যদিকে, মামলাকারী সাতক্ষীরা সদরের ঘোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মোশা। আগে খুব বেশি সম্পদশালী না হলেও বর্তমানে সম্পদের হিসাব জানা নেই স্থানীয় বাসিন্দাদের। হঠাৎ যেন আলাদ্বীনের চেরাগ হাতে পেয়ে কোটি কোটি টাকা, দাপট আর প্রভাবশালীর খাতায় নাম লিখিয়েছেন।

বিপক্ষের কথা আর আত্মসমালোচনা আমরা এখন আর শুনতে চাই না। অর্থ আর ক্ষমতার দাপটে শুধু জয়গান শুনতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ভুল ধরলে বা সমালোচনা করলেই রক্তচক্ষু দৃষ্টি পড়ে তীক্ষ্ণভাবে সমালোচকের দিকে। নিজের ভুলটা না শুধরেই হামলে পড়ি। সাংবাদিক বরুণ ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটির ঘটনাও ঠিক একই রকম। মামলাটি যেন সাংবাদিক পরিবারের ওপর অশুভ আঘাত।

বরুণ ব্যানার্জীর বড় ভাই সুনীল ব্যানার্জী ছিলেন রাজধানীর স্বনামধন্য সাংবাদিক। দৈনিক বাংলা ও জনকণ্ঠের কূটনৈতিক প্রতিবেদক ছিলেন তিনি। আরেক ভাই প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক কল্যাণ ব্যানার্জী রয়েছেন ডেইলি স্টারের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি হিসেবেও। অপর ভাই অ্যাড. অরুণ ব্যানার্জী দৈনিক জনতার কলাম লিখতেন এখন বাসসের সাতক্ষীরা প্রতিনিধির দায়িত্বে রয়েছেন।

সাতক্ষীরা জেলাসহ দেশজুড়ে এই সাংবাদিক পরিবারের উপর মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাড়িয়ে সহায়তা করা নেশা এই পরিবারের। সেক্ষত্রে মানুষের ভালোবাসা আর দোয়া কুড়িয়েছেন। তবে সংবাদকর্মী হওয়ায় পেছনে থেকে ছুরি মারাদের সংখ্যাও নেহাতই কম হয়নি। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে গেলেই তো একপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষরাই পেছন থেকে ছোবল মারতে দাঁড়িয়ে থাকে সবসময়। এমনই ঘটনার জন্ম হলো আদালতে মামলার মধ্য দিয়ে।

ঘোনা ইউনিয়নের যুবলীগের সাধারণ আলমগীর হোসেনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ক্ষোভ আর অভিযোগের ঝুঁড়ি খুলে বসেন চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মোশার বিরুদ্ধে। এই যুবলীগ নেতা বলেন, তিনি সুবিধাবাদী মানুষ। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভোলটাও পাল্টে ফেলেন। ১৯৯৬ সালে ঘোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ফজলুর রহমান মোশা। দলীয়ভাবে নির্বাচিত হননি। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ছাতা ধরেন সেদিকে।

এরপর ২০০২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি জামায়াত নেতা খালেক মন্ডলকে ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে চিঠি দেন। চিঠিতে উল্লেখ করেন, আমি আপনার ছোট ভাই। আগে যা করেছি ভুল করেছি। এখন থেকে আপনার সংগঠন ও আপনার সঙ্গে থেকে কাজ করবো। এরপর আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসলে তিনি পুনরায় সব ভুলে ঝুঁকে পড়েন সরকারি দলে। এভাবেই তার পথচলা। আর্থিক অবস্থা আগে ভালো ছিল না তবে বর্তমানে প্রচুর অর্থের মালিক। ঢাকায় ফ্লাট, সাতক্ষীরা কোর্টের পাশে ৫ তলা বাড়ি, ঘোনা বাজারের পাশে চারতলা বাড়ি, ঘোনার গ্রামের বাড়ির বৈঠকখানাটি দুই তলা, দাঁদভাঙ্গা বিলের ২শ বিঘা খাস জমিতে মাছের ঘের।

আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড কমিটির সদস্য না হয়েও ২০১৬ সালে নৌকার টিকিট পেয়ে যান অদৃশ্যভাবে। আবারো নির্বাচিত হন চেয়ারম্যান। তার বিরুদ্ধে আদালতে দুর্নীতির মামলা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা মামলাও চলমান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঘোনা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মোশার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ফোন কলে তিনিও আন্তরিক হয়ে বলার আগ্রহ প্রকাশ করেই ফোনকলের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বোঝা গেল তিনি তার বিরুদ্ধাচরণ কথা শুনতে অভ্যস্ত নন। যিনি পশ্চাতভাগে নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অগ্রভাগে এসেছেন। সত্য সংবাদ প্রকাশে তিনি তো ক্ষেপে যাবেনই। চোরকে চোর বল্লে, চোর তো ক্ষেপে যাবেই। সত্যরা গড়াগড়ি খাবে আদালত পাড়ায় আর মিথ্যারা দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াবে রাস্তায়। তবে শেষভাগে হবে মিথ্যের পরাজয় আর সত্যের জয়।

লেখক : সাংবাদিক

পিডিএসও/তাজ