বাংলাদেশ তুমি কার?

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৪৯

মেহেদী হাসান, শিক্ষার্থী(শাবিপ্রবি)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ঘোষণা করেছিলেন : আমাদের সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে এবং কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়। এই মুহূর্তে আমরা শত্রুতা করতে যাবই বা কেন! স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার করছি আমরা। এখন আমাদের নজর উন্নয়নের দিকে, সংঘাতের দিকে নয়। জিডিপিতে বিগত ১০ বছরের মোট প্রবৃদ্ধির হারে সারা বিশ্বে সবার ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৮.২ শতাংশ। যা বিশ্বের সকল দেশের জন্য ঈর্ষনীয়। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। প্রকৃতপক্ষেই, এই মুহূর্তে কোনো দেশের সঙ্গে শত্রুতা আমাদের মানায় না, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে তো মোটেই না। তাছাড়া, অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক দিক বিবেচনায় সে সামর্থ্যও আমাদের হয়নি।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন এশীয় অর্থনীতিতে শীর্ষ এবং ভারত তৃতীয় অবস্থানে। এশীয় অর্থনীতিতে এই দুই দেশের তীব্র প্রতিযোগিতা বর্তমানে প্রতিদ্বন্ধিতায় রূপ নিয়েছে। এই প্রতিদ্বন্ধিতা শুধু অর্থনৈতিক খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়ার এই দুই বৃহৎ দেশ একই অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় আঞ্চলিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকবার মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে, সংঘর্ষ এমনকি যুদ্ধেও লিপ্ত হয়েছে। অরুণাচল ও আকসাই চীন নিয়ে বিরোধের জেরে ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সে যুদ্ধে চীন জয়লাভ করে এবং আকসাই চীন দখল করে নেয়। চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশ না হলেও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে চীনের দাপটে ভারত একরকম কোনঠাসা বলা চলে। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ঘাটলে আমরা এমনটাই দেখতে পাই।

ভারত আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের অবস্থান এই দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। একমাত্র পানিবণ্টন বাদে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তেমন মনোমালিন্য নেই। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার ফলস্বরূপ ভারতও বাংলাদেশের কাছ থেকে কখনো অসহযোগিতা পায়নি। অন্যদিকে ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের গুরুত্বও ভারতের কাছে সবচেয়ে বেশি। কারণ বাংলাদেশের সহযোগিতা ছাড়া ভারতের পক্ষে তার ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যসমূহে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়াতে ভারত খুব সহজে অনুন্নত ও দুর্গম ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যসমূহে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। বাংলাদেশ ভারতের একটি অন্যতম বাজার। এছাড়াও ভারত বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পায়। এসব কারণেই ভারত কখনোই চাইবে না বাংলাদেশে তাদের প্রভাব হ্রাস পাক কিংবা অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করুক। বিশেষ করে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের উপর ভারতের কড়া নজর রয়েছে।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে সীমান্তঘেষে ভারতের আসাম রাজ্য। এখানে অসমিয়াদের পাশাপাশি বসবাস করে প্রচুর বাঙালি, হিন্দিভাষী ও অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।  অসমিয়ারা মনে করে আসাম শুধু তাদের। বাঙালিদের আসাম থেকে বিতাড়নের জন্য বারবার সরকারি প্রশ্রয়ে দাঙ্গা বাধানো হয়েছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৩টি বড় দাঙ্গায় হতাহত হয়েছে বহু বাঙালি, আর বহু বাঙালি হয়েছে সর্বস্বান্ত। এটা স্বীকৃত যে আসামের স্থানীয় ও ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদরা অসমিয়াদের এই বাঙালিবিদ্বেষ টা কে পুজি করে রাজনীতি করে আসছে। আসামের সর্বশেষ নাগরিকপঞ্জি(এনআরসি) থেকে ১৯ লাখ ৬ হাজার মানুষকে বাদ দেয়া হয়েছে যাদের বেশীরভাগই বাঙালি। অসমিয়ারা মনে করে এসব বাঙালিরা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ করেছে। আসামের অর্থমন্ত্রী তো বলেই বসলেন যে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদপড়াদের ফিরিয়ে নিতে নাকি বাংলাদেশকে অনুরোধ করবেন। তবে বিজেপি সরকার এই ১৯ লাখ মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দুদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করার মত অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিবে না। তবে মনে হচ্ছে মোদী সরকার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখতে এই ইস্যুটাকে ‘দাবার ঘোড়া’ হিসেবে জীবিত রাখছে।

অপরদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মরীয়া চীন। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা সফরে এসে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এছাড়াও চীন বাংলাদেশের উপকূলে গভীর সমুদ্রে একটি বন্দর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু প্রতিবেশী ভারতের আপত্তিতে বাংলাদেশ এতে অনীহা প্রকাশ করে। চলতি বছরের ১ জুলাই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর আমন্ত্রণে চীন সফরে গিয়েছিলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি আশা প্রকাশ করেন আগামী এক থেকে দেড় দশকে চীন বাংলাদেশে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে ৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এসমস্ত বিষয়সহ বেল্ট-রোড়-ইনিশিয়েটিভে যোগদান এবং চীনের কাছ থেকে সমরাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন কেনার বিষয়টি ভারত মোটেও ভালো চোখে দেখে না। ভারত এটাকে নিজেদের নিরাপত্তার হুমকি মনে করে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘রোহিঙ্গা সংকট’। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ কূটনৈতিক অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে মিয়ানমারের উপর কিছু চাপ আসলেও তা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যথেষ্ট ছিল না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নাটকীয় নীরবতা আমাদেরকে অবাক করেছিল। জাতিসংঘ আনান কমিশনের মতো একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করেও নিরাপত্তা পরিষদে চীনের বাংলাদেশ বিরোধী ভেটোর জন্য রোহিঙ্গ সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়। এ সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রও কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি। শেষমেষ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মধ্যস্থতার আশ্বাস দেন। যারা সমস্যা সৃষ্টি করে তারাই এর ভালো সমাধান করতে পারে। চীনের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক গুরু-শিষ্যের মতো। চীনের কোনো সুপারিশ মিয়ানমার ফেলবে বলে মনে হয় না। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ চীনের মুখাপেক্ষী হোক চীন হয়তো সেটাই চাচ্ছিলো। শোনা যাচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন চলছে। এই বৈঠকে চীন যদি বাংলাদেশের কাছে কিছু দাবি করে তাহলে বাংলাদেশকে ভারতের ‘দাবার ঘোড়া’ এর কথা মাথায় রেখেই সম্মতি দিতে হবে। নইতো যেই লাউ সেই কদু অবস্থা হতে পারে।

আসামে নাগরিকপঞ্জি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এই দুই ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমান সময়ে বেশ কূটনৈতিক চাপে আছে। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ যে কূটনৈতিক অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে তার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে চাই না। এই চাপ সামলাতে বাংলাদেশকে এখন থেকেই তৎপর হতে হবে। ভারতকে বুঝাতে হবে যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে তারাও যেন এগিয়ে আসে। এটাও বুঝাতে হবে যে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদপড়া মানুষদেরকে যদি বাংলাদেশের দিকে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া হয় তাহলে শুধু বাংলাদেশ নয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গসহ এ সমগ্র অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। আর চীনের সাথে সমঝোতায় যত কম ছাড় দিয়ে চীন দ্বারা মিয়ানমারকে রাজি করানো যায় সেটাই মঙ্গলকর।

যেখানেই গুড়, সেখানেই পিপড়া। অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার, পণ্যের বিশাল বাজার ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ যে দক্ষিণ এশিয়া তথা এশিয়ার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে তা এশিয়ার দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারত ও চীনের বাংলাদেশপ্রীতি দেখেই বুঝা যায়। বাংলাদেশ এখন নব্য এশিয়ান টাইগার। বর্তমান সরকার খুব সূক্ষভাবে দুই দেশের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য করে চলছে যা প্রশংসার দাবিদার। যে দেশের সাথেই আমরা সমঝোতা বা চুক্তি করিনা কেন খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বার্থটুকু যেন নিশ্চিত হয়। রাষ্ট্রের জন্য বৃহত্তর স্বার্থ যে দেশের কাছ থেকে পাবে বাংলাদেশ সে দেশেরই ভালো বন্ধু হবে।

পিডিএসও/রি.মা