কেনো আত্মহত্যা?

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৪০

গোলাম মাওলা শাকিল

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ঈদুল আযহার ছুটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কুড়িগ্রাম যাচ্ছিলাম। রাজশাহী এসে বাস বদলে রংপুরের বাসে উঠে যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পার হচ্ছিলাম, ফেসবুক লগ ইন করার সাথে জানতে পারলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আকতার জাহান আত্মহত্যা করেছেন। 

পুলিশ তার কক্ষ থেকে যে সুইসাইড নোটটা আবিষ্কার করেছে সেখানে মিসেস জাহান গোটাগোটা অক্ষরে সুইসাইড নোটে লিখেছেন, 'আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। শারীরিক, মানসিক চাপের কারণে আত্মহত্যা করলাম।' খুব বেদনায় পুড়ছিলাম।  

তার সেই আত্মহত্যার খবর আলোচিত হচ্ছিল ১০ সেপ্টেম্বর। দিনটি 'বিশ্ব আত্মহত্যা নিরোধ দিবস' হিসেবে পালিত হয়। অধ্যাপক জাহানের অপঘাতে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলেই বিবেচনা করা সঠিক কিনা প্রশ্ন উঠেছিল। 

এ ঘটনার পরে বাংলাদেশে আবারও কিছুদিন আত্মহত্যা বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়, কারণ ঐ বছরের মে মাসে সাবেরা হোসেন নামের একজন মডেল আত্মহত্যা করার পর বিষয়টি নিয়ে কিছুদিন ঝড় উঠে। 

বাংলাদেশে এই আত্মহত্যার প্রবণতা এতোটাই বেশি যে, ২০১৫ সালে হু-র (WHO) প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, সারা বিশ্বে আত্মহত্যার হারে বাংলাদেশ দশ নম্বর স্থানে। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ এর ২০১৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে আত্মহত্যার হার ৭ দশমিক ৩। 

আর বেশিরভাগ সুইসাইডের মূল কারণ খুবই সামান্য বিষয় কিংবা মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা। সুইসাইড নোট তাই বললেও কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও কারণ থাকেনা সুইসাইড নোটে। কিন্তু খোঁজা দরকার সুইসাইড নোট নয়, সমাজে বিরাজমান কারণ।

সাম্প্রতিক বিষয় বাদ দিয়ে যদি অধ্যাপক জাহানের আত্মহত্যার কারণটা দেখতে যাই, তিনি রাবির যে বিভাগের শিক্ষক ছিলেন একই বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যানকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। বৈবাহিক জীবনে তাদের ১৬ বছরের একটা ছেলে থাকলেও সেই দাম্পত্য জীবন টিকেনি, যখন তার স্বামী ছাত্রী থেকে শিক্ষক হয়ে যাওয়া এক সহকর্মীকে বিয়ে করেন। 

পরবর্তীতে সেই একই বিভাগে চাকরি করে যাওয়া, কর্মক্ষেত্রে ঈর্ষা, শিক্ষক হিসেবে আবাসিক বাসা পেতে প্রাক্তন স্বামীর নানান অসহযোগীতা, একাকী জীবন যাপন এবং সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলেও যে বিষয়টা সবচেয়ে সত্য তার যে সরাসরি ছাত্রছাত্রী ছিলেন যারা কিনা তার মৃত্যুর পর ক্যাম্পাসে মোমবাতি জ্বালিয়েছিল, এরাই বিভাগের বিভিন্ন দেয়ালে কাণাঘুষা করতো, 'তানভীর স্যারটা (অধ্যাপক জাহানের সাবেক স্বামী) একটা জিনিস, সাবেক এবং বর্তমান দুই বউ নিয়েই দারুণ চাকরি করে যাচ্ছে।' 

বিভাগের দেয়ালের আনাচে কানাচে সহকর্মীদের টিপ্পনীতে তিনি প্রায়শই থাকতেন। বর্তমান সময়ে এই বিষয়টাকে যদি 'ট্রলিং' বলি জীবনে এমন একজন সফল মানুষের দুঃখজনক হলেও অপমৃত্যুর একটা বড় কারণ ছিলো। তিনি একাকীত্বের লড়াইয়ে মানসিকভাবেই হেরে গিয়েছিলেন। তাই সন্তানের কথাও ভাবনায় আসে নাই সমাজের বিরুপতায়।

ভয়েস অব আমেরিকার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ব্রিটেনে  আত্মহত্যার ৮৭ শতাংশ কারণ 'ট্রলিং'। ব্যক্তিগতভাবে সবার সব কিছুকে নিছক তামাশা ভাবে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা থাকার কথা নয়। 

আত্মহত্যা প্রবণতা যেকোনও জীবন বিমুখ একা বাস করা মানুষের আসাটা অস্বাভাবিক নয়। প্রাসঙ্গিক বিষয় বলার একটাই কারণ, অধ্যাপক জাহানের মতো সফল মানুষেরা যেখানে জীবন ভালোবাসতে পারছেনা সমাজের ধোয়াশা থেকে তবে জীবন নিয়ে লড়াই করা তার শিক্ষার্থীদের কি অবস্থা এই রাষ্ট্রে !

চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দশ মাসে আট জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা খুব হতাশাজনক। আর এই তরুণদের আত্মহত্যার মূল কারণই হলো হতাশা, চাকরি, প্রেমে বিচ্ছেদ সবচেয়ে বড় বিষয় প্রত্যাশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫-৩০ বছরের বয়েসী সাবেক হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা গ্রামের বাড়িতে যায়না অনেক দিন, পরিবারের সাথে কথা বলা ভুলে যায় একসময়, সময় কাঁটায় একাকীত্বের কারণ শুধু একটা চাকরি।

এরা শিক্ষা সফরে গিয়ে শিক্ষা নেওয়ার বদলে প্রেমিকার সাথে এক ঘণ্টা কোনও ঝোপে হারিয়ে যায় আর পরবর্তীতে বিচ্ছেদের নীল দংশনে আকাশ বড় করে দেখা জানেনা, পাহাড়ের কাছ থেকে দৃঢ়তা কিংবা সমুদ্রের গভীরতা থেকে শিক্ষা নিতে পারেনা কারণ সফরের সময়টা তারা ওইভাবে কাঁটায় না। পরিশেষে নিজেকে বিসর্জন। 

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত ২০ বছর যাবত কোনো ঠিকমতো গবেষণা নাই, এর শিক্ষার্থীরা কারও সাথে প্রতিশোধ, প্রতিরোধ, দেখিয়ে দেওয়া হিসেবে বেঁচে নিয়েছে MP3 দিন রাত মুখস্থ করা, তাই এর ব্যপ্তিতে ব্যাঘাত ঘটলেই এই তরুণরা হতাশায় আত্মহত্যা বেঁচে নিচ্ছে। এই অধিকাংশ তরুণ যাদের অন্তত জীবনের কিছুটা সময় পড়া উচিত ছিলো কলা, বিজ্ঞান, দর্শণ, সাহিত্যের জীবনাভূতি, গভীরতা ; তারা সেটা করবে না। 

তারা সফলতাকে জীবনের একটি নির্দিষ্ট বয়সে বেধে নিয়েছে। অথচ হওয়ার কথা ছিলো উল্টো। আমি সবসময় ভাবি একজন মানুষের হতাশাবোধ আসবে ৬৫ বছরের পর, যখন সে জীবনের অনেক সময় পার করেও সফলতা বা শান্তির দেখা পাইনি৷

সেখানেও কেএফসি'র বুড়ো কর্নেল সন্ডার্স আছেন, তিনি ষাটের পর সফল হয়েছিলেন। জীবনে একজন তরুণের উদ্দীপনা আনতে কেন সফল মানুষের ফেসবুক ফলোয়ার হতে হবে ! তার মেধা, বুদ্ধি, জন্মগ্রহণই তো এখানে বড় উদ্দীপক হওয়ার কথা।

কিন্তু তার জীবনে উদ্দীপক নাই। 

শুধু নজরুল, ঈশ্বরচন্দ্র, রামমোহন, ক্ষুদিরামের জন্মমৃত্যু সালে সীমাবদ্ধ না থেকে তাদের জীবন সংগ্রামটা ভাবলে এই হতাশা আশার কথা নয়৷ বিশ্বনবীর জীবনী কি এই দেশের তরুণরা একবারও পড়েনা, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হয়েও তিনি কি ক্ষুধার কষ্ট পাননি, তার শরীর দিয়ে রক্ত ঝড়ে নাই, মরুভূমির বন্ধুর পথে তিনি কি খালি পাঁয়ে হাটেন নাই। জীবনে তারচেয়ে বেশী সংগ্রাম আর কে করেছে? বিদ্রুপ, কটাক্ষ, যন্ত্রণা আর এমন করে কে পেয়েছে? শিক্ষা নেওয়ার জায়গা কেন মোটিভেশনাল স্পিকাররা ! 

আর জীবনে হতাশা কাহার নাই, কাহার ছিলো না ! হতাশার দিনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ গাইতেন, ' যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে। ' 

দুঃখের দিনে নজরুল গেয়েছেন, ' দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার হে। ' 

এইসব কাদের জন্য তাদের জীবন বিসর্জন ! তাদের তো এতো একাডেমিক শিক্ষাও ছিলোনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আশাবাদী জায়গা পৃথিবীর কোথাও আছে কিনা আমি সন্দিহান। সেখানের এই শিক্ষার্থীরা MP3 খোলার আগে, চাকুরীর জন্য জীবনে হারার আগে  কেন একবার পড়ে দেখেনা সমরেশের দায়বন্ধন' যেখানে সুপ্ত ভালোবাসা বিসর্জন দিতে গিয়ে নায়ক বলেছিল, ' একটা চাকুরীই কি জীবনের সব৷'

নারীর জন্য জীবন বিসর্জন দেওয়ার আগে একবার সুনীল থেকেও ঘুরে আসা যায়, ' খাঁটি অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব গভীরে ডুব দিয়ে দেখেছি দেয়াশলাই জ্বেলে, ও গাঁয়ে আমার কোনো ঘড়বাড়ি নাই। ' এইসব তারা কাদের জন্য লিখছেন। রবীন্দ্রনাথ সহস্র প্রেমের কবিতা লিখেছেন কিন্তু দিনশেষে তিনিও গেয়েছেন, ' আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়। ' 

বারবার লাজুক লজ্জা লুকানো প্রেমিকার জন্য নয়, তিনি আর যাইহোক উপলব্ধি করেছেন স্রষ্টা হিয়ায় লুকিয়ে ছিলোই দেখা হয় নাই৷ আপনিও উপলব্ধি করুন একবার। স্রষ্টা আছেন তাকে জানান। তিনি নিরাশ করবেন না।

পৃথিবী ছাড়ার আগে আরেকবার নদীর মাঝে একটা বিকেল দেখে আসুন, মাথার উপর ঘরে ফেরা পাখির অজস্র চিৎকার, শরীরের উপর দিয়ে ফিনফিনে কুয়াশার গড়িয়ে পড়া কিংবা নদীর মাঝেই নির্জন পৃথিবী। আকাশটা যখন অতি দ্রুত নীচে নেমে আসবে, চারপাশে যখন দৃষ্টি যাবেনা। অন্ধকার গাছের মাথা থেকে যখন ঝুরুঝুরু নদীর জল ঝরবে। সূর্যটা যখন একটি দিনের জন্য হারিয়ে যাবে। সত্যি বলছি পৃথিবীর এমন রুপ দেখে জগতের উপর কোনো অভিমান আর থাকবেনা।  

পরিবারের সাথে কথা বলুন। নিজেকে সময় দিন। সমালোচনাকে এক হাত নিয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যয় নিন। জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিন। ভালো ভাবে, আনন্দে বেঁচে থাকার চেয়ে বড় কিছু অর্জন জীবনে থাকতে পারেনা। 

আর মন দিয়ে নিজের কাজটা করে যেতে হবে। আমেরিকান জনৈক  রাগবি কোচের একটা উক্তি পড়েছিলাম। তিন বলেছিলেন- আমরা যখন অন্যের সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের কাজে ব্যাঘাত ঘটাই, তখন আমরা নিজে পরাজিত হয়ে সমালোচনাকারীকে জয়ী করি।

পরাজয় নয়। জীবনানন্দ' চারটা নারকেল হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে রেলট্রাম্পের নীচে যদি জীবনের কাছে না হারার প্রত্যয় নিতেন তবে তিনি দেখে যেতেন কি চিত্ররূপময় তার কবিতা ছিল, মানুষ তাকে কত ভালোবেসে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু আফসোস ! 

অপেক্ষার প্রহর অনেক কঠিন, বিষাদ নীলিমার ছায়ায় ঘেরা পলে পলে অনুভব হলেও নীরবে স্রষ্টাকে ডাকুন, আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন পবিত্র কোরআন শরীফে সূরা ইনসিয়াহরাতে কথা দিয়েছেন, ' নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। অতএব, যখন অবসর পান পরিশ্রম করুন। এবং আপনার পালনকর্তার প্রতি মনোনিবেশ করুন। নিশ্চয়ই তিনি আপনাকে নিরাশ করবেন না।

স্রষ্টার প্রতিজ্ঞা হে তরুণ ! বিশ্বাস রেখো। রাষ্ট্র কিছু দিক বা না দিক তিনি দিবেনই। তোমার ব্যপ্তি ছড়াবেনই। দাতে দাত চেপে বেঁচে থেকে দেখো তোমার আগামী ভোরটা কত সুন্দর। শুধু অপেক্ষা মাত্র। কাল বা পরশু।

পিডিএসও/রি.মা