দু’চোখ মেলে দেখেছিলাম হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:৩০

অলোক আচার্য, গণমাধ্যকর্মী

অদেখাকে দেখার ক্ষেত্রে আমার চিন্তা চেতনায় কেবল কবিগুরুর সেই কবিতার লাইন মনে পরে। ”দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে বাহির দুই পা ফেলিয়া, একটি ঘাসের ওপর একটি শিশির বিন্দু।” বিশ্বাসও করি তাই। ঘরের সৌন্দর্য না দেখে বাইরের সৌন্দর্য দেখে কি লাভ? তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যাই দেশটাকে দেখতে। ঘর থেকে দুই পা ফেলে দেখার ইচ্ছে হয় বারবার।

আমাদের প্রেসক্লাব থেকে গত বছর ঘুরে এসেছি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার অন্তর্গত অন্যতম ঐতিহ্য পাকশীতে শত বছরের ঐতিহ্য হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখতে। প্রতিদিন দূর দুরান্ত থেকে অগণিত পর্যটক একবার এই ঐতিহ্য দেখতে ছুটে আসে পরিবার পরিজন বা বন্ধুদের সাথে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজও দেখা হয় সেই সাথে লালন শাহ সেতুও দেখা হয়ে গেলো। কারণ এর পাশেই যে আধুনিককালের আমাদের দেশের আরেক স্থাপনা লালন শাহ সেতু অবস্থিত। আমি সেখানে আগেও গিয়েছি কয়েকবার। তবু দেখা যেন শেষ হয় না! হওয়ার কথাও নয়। এত বিশাল লোহার সেতু আর কি চমৎকার শৈলী!

আমার বাড়ি পাবনা জেলায় হওয়ায় সেখানকার দুরত্ব বেশি নয়। তবে সবার সাথে ঘুরে বেড়ানোর লোভ কি আর সামলানো যায়। আমরা প্রেসক্লাবের ২৫ জন সাংবাদিক এক সকালে রওনা দিলাম পাকশীর উদ্দেশ্যে। মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম সেখানে। আমাদের সাথে রান্নার বাবুর্চি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ছিল। সেগুলো গুছিয়ে দিয়ে বের হলাম আশপাশ দেখতে। যতবার সেখানে গিয়েছি ততবার মুগ্ধ হয়েছি। এত নিপুন এবং দক্ষ কাজ দেখে! এখানে কিছু তথ্য দেয়া দরকার। ১৯০৭ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এবং ঈশ্বরদী উপজেলার মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে একটি ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা চুড়ান্ত করে কতৃপক্ষ। ১৯১৪ সালের শেষ দিকে ব্রিজটির কাজ শেষ হয়। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে ডাউন লাইন দিয়ে প্রথম মালগাড়ি চালানো হয়। সে সময় ব্রিজটি ট্রেন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। তার নামানুসারেই ব্রিজটি নামকরণ করা হয়। তখনকার সময় ব্রিজটি তৈরিতে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ টাকা। 

শত বছর পার করে আসা এই ব্রিজটি যতবার দেখি ততবার এক ধরনের আনন্দ বোধ করি। আমরা বর্ষা মৌসুম শেষে বেড়াতে যাওয়ার জন্য পদ্মার জল ছিল অনেক দূরে। ব্রিজের নিচে অনেকদূর হেঁটে গেলে পদ্মার দেখা পাওয়া যায়। সেখানে সারি সারি নৌকা বাধা। সুযোগ রয়েছে নৌকায় চড়ে পদ্মার মাঝে চর থেকে ঘুরে আসার। অনেকেই সে সুযোগ নিচ্ছে। ব্রিজের নিচ দিয়ে বহু অস্থায়ী খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। সার বেধে ঘুরতে আসা সবাই পদ্মার দিকে যাচ্ছে। কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে আবার কেউ এদিক ওদিক ঘুরে ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করছে। মাথার ওপর দিয়ে যখন ট্রেন চলে যায় তখন ওপরের মানুষগুলো নিচে দর্শনার্থীদের দিকে তাকিয়ে থাকে। দর্শনার্থীরাও তাকিয়ে দেখে সে যাত্রা। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের বামদিকে তাকালেই চোখে পরে লালন শাহ সেতু। পাশপাশি দুই সেতু দুই সময়ের স্থাপনার স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুটা উঁচুতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের একপাশে উঠলাম। ভেতরে চলাচল নিষেধ তাই পাশ থেকেই প্রেসক্লাবের সবাই ছবি তুললাম। সেখান থেকে সৌন্দর্যটা অন্যরকম। তারপর বিকেলের আলো নিভতে শুরু করলে আমরা আবার ফিরতি যাত্রা করলাম। পেছনে পরে রইলো একটি দিনের স্মৃতি। আবারো হয়তো সেখানে ঘুরতে যাবো। তবে প্রতিবারই অনূভুতি একেবারে আলাদা। 

পিডিএসও/রি.মা