জীবন গদ্য : নিয়তির পালা বদল

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৯, ১৬:১৫

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান, কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

প্রায় বিশ বছর আগের ঘটনা। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে আমার বন্ধু আশিক একটি মেয়ের সিরিয়াস প্রেমে পড়ে। এটাই ছিল আশিকের প্রথম প্রেম আর মেয়েটি ছিল আমাদেরই ক্লাসমেট মুন্নি। তখন আশিকের কোনও কাজে মন বসে না, রাতে ঘুম আসে না, খুব উদাস উদাস ভাব। মজনু হয়ে শয়নে স্বপনে, দিবস রজনী মুন্নির চিন্তায় থাকে মগ্ন। যেন সে প্রেমের আটলান্টিক মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। আশিক বিভিন্নভাবে আচার আচরণে, অঙ্গভঙ্গিতে মুন্নিকে ভালোবাসার কথা বুঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। ক্লাস রুমে বসে মুন্নিকে শুনিয়ে গান গাইতো, 'আমি পাথরে ফুল ফোঁটাবো, শুধু ভালোবাসা দিয়ে', 'তোমার দিল কি দয়া হয় না'। তবুও তার সব প্রচেষ্টাই মুন্নির বোধের কাছে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। মুন্নি না বুঝলেও ইতোমধ্যে ক্লাসের প্রায় সবাই সেটা বুঝে গেছে।

প্রেমের ব্যাপারে সহযোগিতা করার জন্য কখনো বন্ধুর অভাব হয়না। আশিকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ওর করুণ অবস্থা দেখে আমরা কজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এগিয়ে গেলাম। আবার কেউ কেউ টিপ্পনি কেটে বলছে, ক্লাস নাইনে উঠেই লাইনে উঠে গেছো বন্ধু, একদম আশিকে বেঁহুশ। আমরা আশিককে পরামর্শ দিলাম, মুন্নিকে সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব দিতে। মেয়েরা সাহসী ছেলে পছন্দ করে এবং সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব দিলেই ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমাদের সামনে আশিক নিজেকে বাঘের বাচ্চা হিসেবে জাহির করলেও মুন্নিকে প্রপোজ কারার প্রসঙ্গে সে হয়ে যায় বিড়ালের বাচ্চা, মিঁউ মিঁউ অবস্থা। আমাদের চাপাচাপিতে কয়েক বার চেষ্টা করেছিল বটে কিন্তু মুন্নির কাছে যাওয়ার আগেই সারা শরীরে অটোমেটিক ভাইব্রেশন শুরু হয়ে যায়। একবার প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অতিরিক্ত টেনশনে বমি করতে করতে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। তাই এই বুদ্ধি আর কাজে এলো না। তখন সবাই মিলে পরামর্শ দিলাম, যেভাবেই হোক মুন্নির মন জয় করতে হবে। মুন্নি যা যা পছন্দ করে, সেই পথ ধরে এগিয়ে গেলেই ওর মন জয় করা সম্ভব। সবাই মিলে তথ্য নিয়ে জানতে পারলাম, মুন্নি গান শুনতে, কবিতা লিখতে ও বই পড়তে ভালোবাসে আর তার প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আমাদের পরামর্শ মতো আমাদের এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শিলার মাধ্যমে আশিক পাঁচটি অডিও গানের ক্যাসেট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি প্রেমের উপন্যাস ও একটি প্রেমের কবিতা সমগ্র কিনে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিল। এখানেও সে ব্যর্থ কারণ মুন্নি বেশ অপমান ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে আশিকের উপহার ফেরত পাঠাল। প্রেমিক হৃদয় অত্যন্ত বেহায়া প্রকৃতির, এইসব অপমান গায়ে মাখে না। চন্ডিদাসের মতোই প্রেমের বরশি হাতে লেগে থাকে। তাই এবার আমরা পরামর্শ দিলাম, আশিককে রবী ঠাকুর হতে হবে, মানে কবিতা লিখতে হবে। মেয়েদের মন জয় করতে শরীরের রক্ত দিয়ে প্রেমের কবিতা কিংবা কাব্যিক চিঠি অব্যর্থ ওষুধ হিসেবে কাজ করে। ওর টুকটাক লেখালেখির অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রেমের কবিতা লেখার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। অনেক চেষ্টা করেও প্রেমের কবিতা লিখতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত কবিগুরু রবী ঠাকুরের কাছেই আশ্রয় নিল। অনেক সাহস সঞ্চার করে শরীরের রক্ত দিয়ে উনার লেখা 'আমার এ প্রেম নয়তো ভীরু' কবিতার আদলে একটা প্রেমের কবিতা লিখে ফেললো। তারপর আবারো শিলার মাধ্যমে কবিতার চিরকুটটা মুন্নির কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমরা সবাই বলেছিলাম, এই রক্তমাখা চিরকুট দেখলেই মুন্নি তোর প্রেমে পড়ে যাবে, কবিতা পড়তে হবে না। আমাদের কথা শুনে আশিক তখন এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করার আনন্দ অনুভব করছিল।

বিধি বাম থাকলে যা হয়, আশিকের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে ছিল। যা আমরা কেউ কল্পনাও করিনি, তারচেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতার কারণে এবার শিলা সরাসরি মুন্নির হাতে না দিয়ে ওর মলাটে বাঁধা রসায়ন বিজ্ঞান বইয়ের ভেতরে চিরকুটটা ঢুকিয়ে রাখলো। একটু পরে রসায়ন বিজ্ঞানের স্যার আসলেন ক্লাস রুমে। তিনি এসে আমাদের কাছে বই চাইলেন। মুন্নি তার রসায়ন বিজ্ঞান বইটি স্যারের কাছে দিয়ে আসলো। তখনো আমরা কেউ জানতাম না, এই বইয়ের ভেতরেই যে ওই চিরকুটটা আছে। স্যার পৃষ্ঠা উল্টে নির্ধারিত চ্যাপ্টারে পড়া শুরু করলেন। কিছু সময় পর তিনি বই হাতে উঠে দাঁড়িয়ে ব্লাক বোর্ডে লিখতে লাগলেন। এমন সময় হঠাৎ বইয়ের ভেতর থেকে কবিতার চিরকুটটা মেঝেতে পড়ে গেল। ওই চিরকুট মেঝেতে দেখে আমাদের সবার আকাশ থেকে মাটিতে পড়ার অবস্থা। আশিকের তখন কলিজা শুকিয়ে কাঠ। স্যার চিরকুটটা মেঝে থেকে তুলে লাল রক্তে লেখা প্রেমের কবিতা ক্লাস রুমে জোরে জোরে পড়লেন। কবিতার দুটি লাইন সম্ভবত এমন ছিল, 'আমি তোমার রবী ঠাকুর হতে চাই, তোমার মনের ঘরে দিও মোরে ঠাঁই'। তখন আমরা কজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা বাদে বাকি সবাই অট্টহাসিতে মেতে উঠেছে। যেন ক্লাসে একটা কমেডি শো চলছে। আর আশিক তখন লজ্জায় ও ভয়ে কুঁকড়ে কুঁকড়ে কাঁপছে। সম্ভব হলে সে তখন মেঝে খুঁড়ে কেঁচোর মতোন মাটির নিচে ঢুকে যেত। কবিতার নিচে আশিকের নাম লেখা ছিল, তাই কবিতার কবিকে খোঁজে বের করতে কষ্ট হলো না। রসকষহীন রসায়ন স্যার ওর চুলের মুঠি ধরে বললেন, রবী ঠাকুর হতে চাস, ওরে আমার প্রেমিক রবী ঠাকুর। তারপর বেদম মারতে মারতে হেড স্যারের রুমে ঢুকিয়ে স্মরণ কালের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ধোলাই দিলেন। ধোলাই শেষে স্কুলের মাঠে কানে ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হল স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত। সেইদিন বাসায় ফিরে ওর বাবার কাছেও রাম ধোলাই খেল। এতো অপমান সহ্য করতে না পেরে আশিক হারপিক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তবে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এই যাত্রায় বেঁচে যায়। এই ঘটনা পুরো এলাকায় বাতাসের বেগে ছড়িয়ে গেল এবং স্থানীয় সংবাদপত্রেও চলে আসে। তারপর থেকে আশিকের নাম পড়ে গেল প্রেমিক রবী ঠাকুর।

এই ঘটনার পর লজ্জায় আশিক অনেকদিন ঘর থেকে বের হয় নাই। দীর্ঘদিন স্কুলে আসে নাই। পরবর্তীতে স্কুলে থাকাকালীন আর কখনো মুন্নির দিকে মুখ তুলে তাকিয়েও দেখে নাই। আমরা ওর কাছে মুন্নির প্রসঙ্গে কোন কথা বললে বেশ বিরক্ত প্রকাশ করতো। ধরেই নিয়েছিলাম, এই ঘটনার পর আশিকের উপর ভর করা প্রেমের ভূত পালিয়েছে। কথায় আছে, পিরিতি কাঁঠালের আঠা, লাগলে পরে ছাড়ে না। আশিক সাময়িক ভাবে ভালোবাসার আগ্নেয়গিরি ছাই চাপা দিয়ে রেখেছিল মাত্র। অন্যদিকে, রক্তে লিখা কবিতার জন্য না হউক, ওই ঘটনার পর মুন্নির মনে আশিকের প্রতি কিঞ্চিত পরিমাণে দয়া মানে ভালোবাসার উদয় হয়েছিল। ওরা ভার্সিটিতে যাওয়ার পর আমাদের সুপরামর্শ ও সহযোগিতা ছাড়াই দুজনের মাঝে সুগভীর প্রেমের সম্পর্ক রচিত হয়। এখন মুন্নি দুই সন্তানের জননী আর ওই দুই সন্তানের জনক আমাদের বন্ধু প্রেমিক রবী ঠাকুর আশিক। ভালোই চলছে ওদের সুখী দাম্পত্য জীবন। আশিক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক এবং মুন্নি একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যাংকার। এখন আমাদের সমাজের মানুষ ওদের নিয়ে অনেক গর্ব করে। কয়েক বছর আগে আমাদের স্কুলের রি-ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে স্কুলের কৃতি ছাত্র হিসেবে আশিককে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। খুব মজার ব্যাপার হচ্ছে, কাকতালীয় ভাবে স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক হিসেবে আশিকের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন আমাদের সেই রসকষহীন রসায়ন বিজ্ঞান স্যার। যিনি প্রায় বিশ বছর আগে আশিকের জীবনে রচনা করেছিলেন এক বিভিষিকাময় অধ্যায়। এ যেন বিধাতার নিজ হাতে লেখা নিয়তির পালা বদল।

পিডিএসও/রি.মা