ধর্ষণ এবং পুরুষসমাজ : পরিপ্রেক্ষিত ১৯৭১

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ১৮:৫৪

সৈয়দ আমিন আল আনাস

স্বাধীনতার পূর্বে পাক হানাদার আর রাজাকারদের ধর্ষণকাণ্ড ছিলো বিশ্ব মানবতার একটি ঘৃনত অধ্যয়। স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশত বছর পার হতে না হতেই আমাদের এই সোনার বাংলা আবার পড়েছে ধর্ষণ বা ধর্ষকদের কবলে। বাংলাদেশে ধর্ষণের যে ব্যাপকতা তা কিস্তু নতুন কোনও বিষয় নয়। বিগত বছর গুলোতে বাংলাদেশে ধর্ষণের হার আশংকাজনক ভাবে বেড়ে চলেছে। ছয় বছরের মেয়ে শিশু থেকে শতবর্ষী বৃদ্ধা কেউ বাদ যাচ্ছে না পুরুষের এই বিকৃত যৌন লালসা থেকে। 

কিন্তু আসুন একটু অন্য ভাবে এই কথা গুলো বলি বা বোঝার চেষ্টা করি। পাকিস্তান রাস্ট্রকে আমরা বাঙালি জাতি আজো ঘৃনার দৃষ্টিতে দেখি কারণ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা লাখ লাখ বাঙালি মা-বোনকে ধর্ষণসহ অমানবিক নির্যাতন ও গণহত্যা চালিয়েছিলো। বস্তুত: পৃথিবীর ইতিহাসের জঘণ্যতম গণহত্যা করেছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী। আজকের পাকিস্তান আর ১৯৭১ এর পাকিস্তান নিশ্চয়ই এক নয়। ১৯৭১ এ পাকিস্তানের এই জঘণ্য ভূমিকার বিরুদ্ধে রাস্ট্রিয়ভাবে ক্ষমা চাওয়ার জন্য পাকিস্তানের বিশিষ্ট সাংবাদিক হামিদ মীরসহ বহু মানবাধিকার কর্মী বিগত বছর গুলিতে পাকিস্তান সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন। মনে করি, পাকিস্তান সরকার যদি ক্ষমা চায় তাহলেও কি আমাদের সেই ঘৃনার পরিবর্তন হবে? নিশ্চয়ই না। 

এবার আসা যাক ধর্ষণ এবং পুরুষ সমাজের কথায়। বর্তমানে বাংলাদেশের ধর্ষণকারী পুরুষদের শ্রেণিতে যাদের দেখা যায় তা দেখে আমরা হতবাক হচ্ছি প্রতিনিয়ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা রাস্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে অবস্থান করছে। বর্তমানে ধর্ষক বা ধর্ষণকারীদের এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে সচিব, ডাক্তার, বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাদ্রাসার পিন্সিপ্যাল, মসজিদের ইমাম, পুলিশ- যারা কিনা সমাজের ও রাস্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ তারাই জড়িয়ে পরছে ধর্ষনের মত একটি ঘৃনিত কাজের সাথে। 

যাই হোক ধর্ষক পুরুষের কিছু শ্রেণির দিকে তাকাই:  বাংলাদেশের অন্যতম সনামধণ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুন্নেসো স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক পরিমল জয়ধরের ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরা। ধর্ষণের সেঞ্চুরি পালনকারী ধর্ষক মানিকের ধর্ষণের শিকার হয়েছিল জাহাঙ্গির নগর বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। (মানিক কি মানবতা বিরোধী অপরাধের অপরাধী নয়? তাকে কি বিশেষ ট্টাইব্যুনালে বিচার করা দরকার নয়?)। মনে আছে বগুড়ার রাজনৈতিক নেতার কথা। যে কি না ধর্ষণ করে থেমে ছিলেন না, ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে ও তার মাকে মাথা নেড়া করে শহর ছাড়া করার চেষ্টা করছিলেন। অথবা মনে পড়ে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের ধর্ষণকাণ্ড। চলন্তবাসে, ট্রেনে, নির্জন রস্তায় পুরুষরাই ধর্ষণ করছে। উচ্চবিত্ত শ্রেণি, উচ্চশিক্ষত শ্রেণি, বখাটে, সম্মানিত শিক্ষক, সম্মানিত ইমাম-সব পুরুষরাই ধর্ষণ করছে। ধর্ষণের ভয়াবহ বিস্তারে ধর্ষণের ঘটনা গুলির দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া যেমন দায়ী তেমনি দায়ী পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার- যা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সরাসরি প্রভাব। সে জন্যই নারীর পোষাক নিয়ে প্রশ্ন, চলা ফেরার ও স্বাধীনতার বিপক্ষে পুরুষের একটি বড় অংশ। সুযোগ পেলেই ভিড়ের মধ্যে, বাসের ভিড়ে নারীর শরীরে হাত দিচ্ছি, কর্মস্থলে যৌন হয়রানি করছি আমরা পুরুষরাই। 

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সবাই কি ধর্ষণ করেছিলো? কিন্তু আমরা পুরো পাকিস্তানি জাতিকেই আর ভালো চোখে দেখতে পারিনা তাইনা? তাহলে যে শিশুটি মসজিদের ইমামের দ্বারা বা বিদ্যালয়ে শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে সে তার বাকি জীবনে পুরুষ জাতিকে, সকল শিক্ষক বা ইমামকে ঘৃনা করাই স্বাভাবিক- সেজন্য আপনি বা আমি খুব ভালো মানসিকতার হলেও কোনও কিছু যায় আসেনা। প্রতিটা নারীর চোখে পুরুষরা হয়ে উঠছে সুযোগ সন্ধানী অথবা সম্ভাব্য ধর্ষক।
 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ের সময়ে ধর্ষণ প্রতিরোধে পুরুষের ভূমিকার কথা বলছিলেন- যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তবে দু:খজনক হলেও সত্য যে, রাজনৈতিক শক্তির অধিকারী পুরুষরা কিন্তু আরো বেপরোয়া। দলের নেতাকর্মী ধর্ষণ করলে বহিস্কার করা হয় কিন্তু দলের নেতাকর্মীরা ধর্ষণ করবেনা এমন বাস্তব সম্মত উদ্যোগ নেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। পুরুষদের আসলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে শুধু ফেসবুক স্ট্যাটাস নয় বরং প্রত্যেকে স্ব-স্ব অবস্থানে সচেতন থাকা, অপরকে সচেতন করা, যে কোনও ধরনের যৌন হয়রানীর ঘটনা (ভিড়ের মধ্যে, বাসের ভিড়ে, কর্মস্থলে) আমার আপনার সামনে ঘটতে দেখলে প্রতিবাদ করুন, সকলে এগিয়ে আসুন প্রতিবাদে- প্রয়োজনে সরকারের ৯৯৯ নম্বরে এ কল করে জানিয়ে দিন। নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে পুরুষরাও শক্তিশালী ভূমিকা রেখে একটি নারী বান্ধব দেশ গঠনে আরেকটি যুদ্ধ করি। 

পিডিএসও/রি.মা