ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর সংগ্রামী জীবন

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯, ১২:২৪

শ্রীধর দত্ত

পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষের জন্ম হয় যারা জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত মানবকল্যাণে কাজ করে যায়। আজীবন সংগ্রামী মানবতাবাদী সেই রকম এক মহীয়সী নারী সদা হাস্য শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী। শ্বেত কপোতের মতোই শান্তির বাণী ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে সাদামনের এই মানুষ ঘর ছেড়ে মানবকল্যাণে সারাটি জীবন অতিবাহিত করেছেন। সংসার বিরাগী এ মহীয়সী গান্ধী আশ্রমের মাটি আঁকড়ে থেকে তিলে তিলে নীরবে নিঃস্বার্থভাবে নিজের অজান্তেই গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যান। সাদা সুতির শাড়ি পরা সোম্য চেহারার এ নারী মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির প্রচার, শিক্ষাবিস্তার ও সামাজিক অবিচার রোধে ভূমিকা রাখেন। তাকে বাংলাদেশের মাদার তেরেসা বললে ভুল হবে না।

নীরবে-নিভৃতে নিরলসভাবে কাজ করা প্রচারবিমুখ ঝর্ণা ধারা চৌধুরী নারী সমাজের প্রেরণার উৎস। তিনি দেশের নারীসমাজ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে, যারা অবহেলিত সুযোগ ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন।

ঝর্ণা ধারা চৌধুরী মনে করতেন, সাফল্য হলো সাধনার ফল। সাফল্য বা স্বীকৃতির জন্য তিনি কাজ করেননি। একটি আদর্শ নিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। অনেক কঠিন সময় কাটিয়েছেন; কিন্তু আদর্শ থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি। কাজের প্রতি তাঁর যেমন আছে গভীর নিষ্ঠা, তেমনি আছে আধ্যাত্মিকতা। আর আছে মেধা, নিয়ম-শৃঙ্খলা, পরিশ্রম এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রচণ্ড সাহস; সর্বোপরি মানুষের প্রতি প্রেম ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা। তাঁর কর্মযজ্ঞে তিনি সফল একজন নারী। প্রচারবিমুখ নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষকে পথ দেখানো এই মানুষটি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর চণ্ডীপুর ইউনিয়নের কালুপুর গ্রামে ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী রায়পুর জমিদারবাড়ির সেরেস্তায় কাজ করতেন। মা আশালতা চৌধুরী ছিলেন গৃহিণী। ১৯৫৪ সালে তার বাবা মারা যাওায়ার পর ১৯৫৬ সালে গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত অম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্টে (গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট) যোগ দেন। সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি তার পড়ালেখাও চালিয়ে নিতে থাকেন। তিনি চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন।

ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর দীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ইতিহাস বিভিন্ন সূত্র ও সংস্থার মাধ্যমে তাঁর কাজ সম্পর্কে জেনে আমি অবাক। পৃথিবীতে এমন মানুষ এখনোও আছে। তিনি ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার বীভৎস রূপ দেখেছিলেন। তখন থেকেই সমাজকর্মী হওয়ার ইচ্ছা জেগেছিল তাঁর মনে। ১৯৬০ সালে নিজ বাড়ি ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় বিক্রমপুর জেলার বাউতভোগ গ্রামে ঢাকেশ্বরী কটন মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সর্বশ্রী সুনীল বসু ও চারু চৌধুরীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘অম্বর চরকা’ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং সুতাকাটা, মৌমাছি পালনের প্রশিক্ষণ নেন। ঝর্ণা ধারা চৌধুরী ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া সামুদ্রিক সাইক্লোনে আহত নিঃস্ব গৃহহীন মানুষের পাশে দাঁড়ান। মানুষের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রবর্তক সংঘের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরম মমতায় আপনজনের মতো দীর্ঘদিন এই অসহায় মানুষের জন্য সেবা ও ত্রাণকাজ চালান। এরপর তিনি প্রবর্তক সংঘের বিদ্যাপীঠের চরকা ও মৌমাছি পালন কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশিক্ষক পদে যোগ দেন। উদ্দেশ্য ছিল অনাদৃত, প্রায় বিস্মৃত কুটিরশিল্পকে জাগিয়ে তোলা, এই শিল্পকে সম্মানের জায়গায় নিয়ে যাওয়া। সুযোগবঞ্চিত অসহায় মানুষের মধ্যে নতুন আশার আলো মুক্তির পথের সন্ধান দেওয়া। এটাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারেরা প্রবর্তক সংঘের সব সন্ন্যাসী তথা পরিচালককে (যাঁরা মাস্টারদা সূর্য সেনের অনুসারী ছিলেন) হত্যা করে। তখন ঝর্ণা ধারা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ৪০০ শিশুকে ক্যাথলিক মিশনের সহায়তায় সীমান্তের ওপারে আগরতলায় নিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি উদ্ধাস্তু শিশু শিবিরে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রবর্তক সংঘ, প্রবর্তক বিদ্যাপীঠ ও প্রবর্তক শিশু সদন পুনর্গঠনে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োগ করেন। ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গান্ধী আশ্রমে যোগ দেন এবং গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে শক্তিশালী ও ব্যাপকভাবে জনমুখী করার জন্য বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন। চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে যোগ দিয়ে দেশে ফিরে তিনি নতুন উদ্যমে গান্ধী আশ্রমে কুটিরশিল্প স্থাপন করে তার বিকাশ ও প্রসারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন। ১৯৯০ সালে গান্ধী আশ্রমের প্রাণপুরুষ চারু চৌধুরীর মৃত্যুর পর ঝর্ণা ধারা চৌধুরী সচিব পদের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করে।

তিনিই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানজনক ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত হওয়ার অনন্য গৌরবে অর্জন করেন। এই জনকল্যাণী মানুষটি আজ আমাদের সবার গর্ব ও অহংকার। খ্যাতির শিখরে উত্তরণের পেছনে থাকে দেশপ্রেম, দীর্ঘ পরিশ্রম, প্রচণ্ড বাধাবিপত্তি, লড়াই, অনেক নিদ্রাহীন রাত, অনেক ত্যাগ, অনেক না-পাওয়ার বেদনা এবং তা মেনে নেওয়ার সৎ সাহস। সব পাওয়া না-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে একান্তভাবে মানুষের সেবায় নিবেদিত চিরকুমারী, চিরকল্যাণী এই মানুষটির কর্মযজ্ঞ। এরকম মানুষ পৃথিবীতে দুর্লভ।

এই মহীয়সী নারী তাঁর অনবদ্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশে বিদেশে অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন তৎমধ্যে ১৯৯৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক বাজাজ পুরস্কার, ২০০০ সালে আমেরিকার ওয়েস্টবেরি বিশ্ববিদ্যালয় শান্তি পুরস্কার, ২০০১ সালে অনন্যা শীর্ষদশ পুরস্কার, ২০০৬ সালে শান্তি, সম্প্রীতি ও অহিংসা প্রসারে ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শান্তি পুরস্কার’, ২০০৩ সালে দুর্বার নেটওয়ার্ক পুরস্কার, ২০০৭ সালে নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের পক্ষ সাদা মনের মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি, ২০১০ সালে শ্রীচৈতন্য পদক, ২০১০ সালে কীর্তিমতী নারী (চ্যানেল আই এবং স্কোয়ার), ২০১১ সালে রণবীর সিং গান্ধী স্মৃতি শান্তি সদ্ভাবনা পুরস্কার, ২০১৩ সালে ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী পুরস্কার, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রোকেয়া পদক, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কার একুশে পদক অন্যতম।

এই মহীয়সি নারী মানবতার সেবার ব্রত হাতে নিয়ে চিরকুমারী আজীবন ছিলেন নিরামিশ ভোজী। গান্ধীবাদী চেতনায় মানুষ আর সমাজের সেবায় পুরো জীবন পার করে চিরদিনের মতো ২০১৯ সালের ২৭ জুন বিদায় নিলেন ঝর্ণা ধারা চৌধুরী। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর পরও তাঁর দেহখানি মানবকল্যাণের জন্য সন্ধানীকে দান করে গেছেন। বেগম রোকেয়া ও ঝর্ণাধারা চৌধুরী মতো নারী মানুষের হৃদয়ে আজীবন শ্রদ্ধাভরে বেঁচে থাকবেন। আশা করি এ মহীয়সী নারীর আদর্শে উজ্জীবিত হবে নারী সমাজ এবং অসাম্প্রদায়িক ও অহিংস বাংলাদেশ গড়তে সবাই সচেষ্ট হবে।

পিডিএসও/হেলাল