পুনর্জন্ম আমার

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৯, ১৭:৪৫

আবুল কালাম আজাদ

আমার পৃথিবী ছিল শব্দহীন। শব্দহীন পৃথিবী-বর্ণহীন পৃথিবী-আলোহীন পৃথিবী কেউ কি কল্পনা করতে পারেন? কম-বেশি কল্পনা শক্তি সবারই আছে। কিন্তু ভূক্তভোগী ছাড়া কেউ-ই পুরোপুরি বুঝবে না শব্দহীন-বর্ণহীন-আলোহীন পৃথিবী কতটা কঠিন-কতটা যাতনাময়-কতটা দুর্বিসহ।

মানুষ ও যানবাহনে গাদাগাদি ঢাকা শহর। কিন্তু আমার কাছে এক নিস্তব্দ নগর। যানবাহনগুলোর কোনো শব্দ নেই। চাকার শব্দ নেই-ইঞ্জিনের শব্দ নেই-হর্ণ বাজার নেই। মানুষগুলো নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। কারো সাথে কোনো কথা বলছে না-গল্প করছে না-অকারণে গান গাইছে না-শিস বাজাচ্ছে না। রিকশাওয়ালা ঠুনঠুন বেল বাজাচ্ছে না।

সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা গ্রামে গিয়েছি। অথবা বনভূমির কাছে গিয়েছি। পাতারা ঝরছে-কোনো শব্দ নেই, যেন পাতা ঝরার কোনো শব্দ থাকে না। পাখিরা উড়ছে-অথবা বসে আছে ডালে-অথবা হেঁটে বেড়াচ্ছে সবুজ ঘাসে। শব্দহীন-পাখিরা কেউ গান জানে না-শিস বাজাতে জানে না। টিউটিউ-চিঁউচিঁউ-টিউটটিউট, কুকু-কু... এসব জানতো আমার শৈশব ও কৈশরে।

অফিস ছিল ভীষণ অস্বস্তিকর এক স্থান। বস ডেকেছেন, আমার শরীর শীতল। কী জিজ্ঞেস করবেন আর আমি কী উত্তর দিব? বন্ধুদের আড্ডা আরেক বিরক্তিকর জায়গা। কে কী নিয়ে কথা বলছে আমি জানি না। শুধুই এর মুখ থেকে ওর মুখে চোখ সরিয়ে নেয়া। শুধু ওষ্ঠ কম্পন থেকে কিছু বুঝতে চেষ্টা করা। কেউ আমার সাথে কথা বলতে এলেই বিপত্তি। ভুল বুঝে দেই ভুল উত্তর প্রায়ই। হাসির রোল-আমি বিব্রত ভীষণ। কেউ কেউ সমবেদনা জানায়-তাতেও অস্বস্তি। কেউ অবশেষে লিখে বোঝায় কথাটা কি ছিল। লজ্জায় আমি তাকে কৃতজ্ঞতাও জানাতে পারি না।

আমি আহত অথবা শরীরে ক্ষতযুক্ত পশুর মতো শুধু নিরালা কোণ খুঁজি। মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাই। অদৃশ্য কোনো পোকা হয়ে যেতে চাই। মানুষ থেকে পালিয়ে বেড়ানোই আমার প্রধান লক্ষ্য।

আমার গান থেমে যায়-আবৃত্তি থেমে যায়। নিবু নিবু দীপের মতো থেকে যায় লেখালেখিটা। গল্প পাঠাতে পারি সম্পাদকের কাছে, কিন্তু কারো সাথেই কোনো যোগাযোগ করতে পারি না। না ফোনে-না ব্যক্তিগতভাবে। না সম্পাদকদের সাথে-না প্রকাশকদের সাথে। কী হবে এভাবে লিখে?

সবচেয়ে কষ্টকর ছিল আমার ছোট মেয়েটার কান্না। বাবা তার প্রিয় বন্ধু-খেলার সাথী-তার কথার ঝাপি খুলে দেবার জন। কত কথা সে জমিয়ে রখতো! বাবা আসবে-সব বলবে। নতুন কিছু শেখার কথা। নতুন কিছু জানার কথা। অভিযোগ, অনুরাগের কথা। কিন্তু বাবা তার কথা শুনতে পায় না-বুঝতে পারে না-পারে না উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিতে। মেয়েটার তখনও বর্ণ পরিচয় হয়নি। লিখে বোঝাতে পারে না। কেঁদে উঠে-‘বাবা আমার কথা বুঝে না, বাবা আমার কথার জবাব দেয় না’। বড় মেয়েটা এসে লিখে দেয়-তখন কিছু উত্তর খুঁজে পাই। কিন্তু এভাবে কতটা? ওর তো কথার শেষ নেই।

সমুদ্রের ঢেউয়ের মত অফুরন্ত কথা ওর।

শব্দহীন এই পৃথিবীতে আমি বেঁচে থাকার কোনো অর্থই খুঁজে পাই না। কিন্তু মরতেও পারি না। মরতে পারি না মেয়ে দুটির জন্যই। ওরা কার মুখে তাকাবে? ওদের চাওয়া-পাওয়াগুলো কে মেটাবে? বাবার অভাব কে পূরণ করবে? সবাই ভালোবাসে-সবাই আদর করে। চাচা, ফুফুরা, দাদা-দাদী। আছে স্নেহময়ী মা। কিন্তু বাবা তো বাবাই-আর কিছু দিয়ে কি বাবার শূণ্যতা ভরাট করা যায়?

আমার মা আশাহত হতে জানেন না। বুকে তার আশা, ছেলে তার আবার শ্রবণ শক্তি ফিরে পাবে। আবার গল্প-কথায় মুখোরিত হবে। আবার গান হবে-আবৃত্তি হবে-ছেলে ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক যোগাযোগ ক্ষমতা। বাবাও এরকম ভাবেন। ভাই এবং বোনদেরও প্রিয় ভাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা। দেশে সব চেষ্টা শেষে যেতে হয় পার্শ্ববর্তী দেশে। দরকার হলে আরও দূরে। অডিওলজিস্ট আরিফুল ইসলাম। তিনিই যোগাযোগ করিয়ে দেন পার্শ্ব দেশের অডিওলজিস্ট চন্দন সাহার সাথে। সেখান থেকে ডা. লাহিরী এবং ডা ভি.কে. বসাক। এখন আরিফুল ইসলাম মানে প্রিয় আরিফ ভাই। চন্দন সাহা মানে প্রিয় চন্দন দা। আর সেই ডাক্তারগণ আমাকে আবদ্ধ করেছেন চির ঋণে।

আমি এখন পাখিদের কলতান শুনি। সমুদ্রের ঢেউয়ের কল্লোল শুনি। নদীর কুলকুলু গান শুনি। মায়ের মধুর কথা শুনি। বাবার বরণীয় উপদেশ শুনি। ভাই এবং বোনের আনন্দময় গল্প শুনি। প্রিয়তমা স্ত্রীর মিহি কন্ঠে আবিষ্ট হই। আর মেয়ে দু’টির হৃদয়ের সব কথা প্রাণ ভরে শুনি। পুনজন্ম হলো আমার।

আমি অফিসে আনন্দময়। আমির মুখর করি বন্ধুর আড্ডা। আমি আস্বাদ করি নব জীবন। এই নতুন জীবন ফিরে পাবার জন্য আমি কার কাছে ঋণী? প্রথমত আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে। বিজ্ঞান গবেষকদের কাছে। বিজ্ঞান প্রয়োগকারীদের কাছে।

বিজ্ঞান অন্ধজনে দিয়েছে আলো। শ্রবণহীনে দিয়েছে লোলিত শব্দ। অচলকে দিয়েছে চলাচলের ক্ষমতা। বিজ্ঞান এই পৃথিবীকে করেছে মনোরম ও মুগ্ধময়। বিজ্ঞান আমাদের জীবনকে করেছে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।

নিয়াার্থান্ডাল থেকে হোমোসোফিয়ান্স পেরিয়ে মহাকালের মহাযাত্রায় এই যে আধুনিক মানুষ। অদৃশ্য-অলৌকিক কোনো শক্তি আসেনি মানুষকে সাহায্য করতে। মানুষই নিজেকে বদলেছে পলে পলে। মানুষই জয় করেছে সব প্রতিকূলতা। মানুষই মনুষকে ফিরিয়ে দিয়েছে হারানো সুখ ও আনন্দ।

আমি মানুষের কাছে ঋণী। আমি মানুষকে ভালোবাসি।

পিডিএসও/রি.মা