খেঁকশিয়ালের খোঁজে...

রোদ হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে, খেঁকশিয়ালীর বিয়ে হচ্ছে

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৯, ১৫:২৭

এম. ফজলেরাব্বী, জাবি শিক্ষার্থী

ছোটবেলায় পড়া কবিতা। বাংলা সাহিত্য, বাঙালি সংস্কৃতির অনেকটা জায়গা দখল করে আছে এই খেঁকশিয়াল। অত্যন্ত বুদ্ধিমান এই প্রাণীটিকে নিয়ে লেখা হয়েছে অজস্র গল্প-কবিতা যা খোকা-খুকিদের অনেক শিক্ষামূলক উপকরণে পরিণত হয়েছে। একই সাথে এই গল্পগুলো আমাদের জীব বৈচিত্র্য তথা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রাণীটির অস্তিত্বের লিখিত দলিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য সংকট, বন জঙ্গল উজাড়, বসতি স্থাপন, চোরাচালান এবং অজ্ঞতা বশত এসব প্রাণী নির্বিচারে হত্যার কারণে বর্তমানে এই প্রাণীটির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। এই অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই এই প্রাণীটি এদেশ থেকে হারিয়ে যাবে যার ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব পরবে আমাদের কৃষিতে, প্রাকৃতিক পরিবেশে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত ঔষধ শিল্পে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রাণীটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা, জিন ব্যাংক সংরক্ষণ (মূলত ঔষধ শিল্পের জন্য), ক্ষেতের ক্ষতিকর প্রাণী দমন (ইঁদুরসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পোকামাকড় ইত্যাদি) এবং জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। খেঁকশিয়াল নামে পরিচিত প্রাণীটির ইংরেজী নাম Indian fox বা Bengal fox , বৈজ্ঞানিক নাম Vulpesbengalensis .

এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. কামরুল হাসান (অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) স্যারের তত্ত্বাবধানে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য গিয়েছিলাম উত্তরবঙ্গের জেলা নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায়।

কাজ করতে এসে প্রথমেই পড়লাম বিরাট এক সমস্যায়। একে তো আগের কোনো ফিল্ডে কাজ করার অভিজ্ঞতা নাই, তার উপর পুরো কাজটা করতে হবে একা। কিছু রিসার্চ পেপার আর কিছু ভিডিও ক্লিপ সাথে থাকায় খেঁকশিয়ালের বাসস্থান এবং খাদ্যাভাস সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল। এতে বেশ সুবিধা হলো। ক্লাশ ফাইভে পড়া দশ বছর বয়সের একটা ছেলে জুটিয়ে নিলাম ওই এলাকা থেকে। উদ্দেশ্য ছিল ও আমাকে পুরোনো কবর, বড় কবরস্থান, পরিত্যক্ত পুরোনো বাড়ি, ঝোপ জঙ্গল যুক্ত উঁচু জায়গা (যেখানে মানুষের যাতায়াত কম বা নেই) চিনিয়ে দিতে পারবে। প্রথমদিন দাঁড়াস সাপের দৌড়ানি খাওয়ার পর ছেলেটিকে আর পাওয়া গেল না, আর আমিও ওকে সাথে নেওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না। কাজেই বাকি কাজ একাই করতে হলো।

বলখেলার মাঠ কবরস্থান , টুনির হাট

দ্বিতীয় দিন গেলাম নদীর পারে। তিস্তা নদীর পার ঘেঁষে দেয়া বেড়ীবাঁধের পার দিয়ে খুঁজতে থাকলাম খেঁকশিয়াল। মূলত এইসব উঁচু জায়গার ছোট ছোট ঝোপ জঙ্গলে গর্ত করে বাস করে এরা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বাড়তি চাপ, সেই সাথে চর ভাঙ্গা মানুষেরা এইসব বেড়ীবাঁধের আশেপাশে বসতি গড়ার কারণে এখন আর এইসব জায়গায় গর্ত করে বাস করা নিরাপদ বোধ করে না এসব প্রাণী। বর্ষাকালে এরা তিস্তা পাড়ি দিয়ে ভারতের জঙ্গলময় চরে চলে যায়। শীতকালে ভূট্টার মৌসুমে এবং আঁখের সময়ে আবার বাংলাদেশের ভেতরে আসে খাদ্যের সন্ধানে এবং বাচ্চা দেয়ার জন্য। আঁখ খেত এবং ভূট্টা খেতের ভেতরে, ছোট ছোট ঝোপ জঙ্গলে, পুরনো কবরস্থানে গর্ত করে তাতে বাচ্চা দেয়। বর্ষাকালে সাধারণত এরা গর্তে থাকে না, গভীর ঝোপ জঙ্গলে বাস করে।

তৃতীয় দিন বের হলাম মাথার উপর চল্লিশ ডিগ্রী রোদ নিয়ে। কাঠফাটা রোদে ফাঁকা মাঠ, ঝোপ জঙ্গল কি ধান ক্ষেতের মাঝ দিয়ে কাঁচা মাটির পথ-কিছুই যায় আসে না। আজ আমাকে ওটা পেতেই হবে। তৃষ্ণায় গলার ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম। মাঝে এক বাড়িতে যেয়ে এক গ্লাস পানি চাইলাম। এক গ্লাসের পর এক জগ! পানি যে আল্লাহর কত বড় নেয়ামত তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।

অনেক খুঁজে, অনেক মানুষকে জিজ্ঞাসা করে নদীর পারে ঘন জঙ্গলের একটা জায়গা পাওয়া গেল। জায়গাটার নাম দোহল পাড়া নদীর পাড়।

জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে ভয় পাচ্ছিলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছি শুনে স্বপন নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থী আমার সাহায্যে এগিয়ে এলো। স্বপনের সাহায্যে তিন দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, রোদে পোড়া আর ভয়কে জয় করে পেয়ে গেলাম সেই বহুল প্রতীক্ষিত খেঁক শিয়ালের গর্ত।

দোহলপাড়া নদীর পাড়ে

ভরা বর্ষাকালে আশাতীত ভাবে একটা সতেজ গর্ত পেয়ে যাওয়ায় আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। ক্যামেরা বের করে ঝটপট কিছু ছবি তুলে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলাম। আপাতত আমার কাজ শেষ। নিখুঁত পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা ট্র্যাপিং, জিপিএস মেশিন এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির প্রয়োজনে পরের দিন ঢাকায় ফিরে এলাম।

আসার সাথে আরো যে জিনিসটা আমি সাথে করে নিয়ে এলাম তা হচ্ছে গ্রামীণ সহজ সরল মানুষের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা আর অপরিসীম ভালোবাসা।

পিডিএসও/রি.মা