আলীকদমের ম্রো ও ত্রিপুরা পাড়ায়...

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯, ১৫:৫৫

ইসমাইল মাহমুদ, গণমাধ্যমকর্মী

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনযোগে সিলেট থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা। সহযাত্রী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ইকো-ট্যুর গাইড ত্রিপুরা যুবক শ্যামল দেববর্মা। ভোরে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে পৌঁছে সকালের নাস্তা সেরেই চড়ে বসি কক্সবাজারগামী বাসে। সকাল সাড়ে এগারোটায় পৌঁছে যাই চকরিয়ায়। চকরিয়ার থেকে আরেকটি বাসে চড়ে ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য পেরিয়ে পাহাড়ী উঁচু নিচু রাস্তা এবং প্রকৃতির নয়ানাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে থাকি। লামা উপজেলা সদর থেকে আলীকদমের রাস্তায় মিরিঞ্জা পাহাড় পর্যটন এলাকা হতে ডান দিকে দূরে বহুদূরে তাকালে কক্সবাজার সমুদ্রের উত্থাল ঢেউ দেখে মন জুড়িয়ে যায়। দেখে মনে হয় পাহাড় আর সমুদ্রের এক অপূর্ব মিলনমেলা। লামা উপজেলার ঐতিহ্যমণ্ডিত নদী মাতামুহুরী পেরিয়ে আলীকদমের তুমক্ষীয়ং ঝিরি পারি দিয়ে দুই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছালাম পাহাড়ী ছোট শহর বান্দরবন জেলার আলীকদমে। চকরিয়া থেকে আলীকদমের দুরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। শ্যামল দেববর্মা আগেই আমাদের আগমন বার্তা দিয়ে রেখেছিল ম্রো নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর রাংক্লাং ম্রো-কে।

আলীকদমে পৌঁছেই দেখা হয় তার সাথে। সদা হাস্যোজ্জ্বল রাংক্লাং ম্রো আমাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। অল্প সময়েই সে আমাদের আপন করে নেয়। সে সাবলিলভাবে তার ভাষা ও সংস্কৃতির বর্ণনা দিতে থাকে। তার সরল কথাবার্তায় মনে হয় ম্রো জনগোষ্ঠীর রাংক্লাং আমাদের কত দিনের চেনা। তড়িগড়ি করে আলীকদম বাজারে দুপুরের খাবার শেষ করি। পাহাড়ি ও বাঙালি মিশেলে তৈরি খাবারের স্বাদ অপূর্ব। বাঁশের কুড়ল (চারা) দিয়ে তৈরি খাবার জিভে পানি এনে দেয়। তৃপ্তি সহকারে খাবার শেষ করে চাঁদের গাড়ি (জিপ গাড়ি) তে চড়ে আলীকদম বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দপ্রু ঝিরি পাকাই ম্রো আদিবাসী পাড়ায় গমন। ঘন জঙ্গলের অভ্যন্তরে সুউচ্চ পাহাড়ের শীর্ষে ও পাদদেশে ম্রোদের বসবাস করার দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ম্রোদের বসতি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি। ম্রো-রা তাদের বসবাসের ঘরগুলোকে টং ঘর বলে। মাটি থেকে কিছুটা উচ্চতায় বিশেষভাবে তৈরি ম্রোদের ঘরগুলো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। ম্রোদের সাজসজ্জাও অপূর্ব। ম্রো পুরুষরা নারীদের মতোই সাধারণত মাথার চুল লম্বা রাখে। অনেকেই কানে দুল পরিধান করে। চুলের খোপায় পরে বিশেষ অলঙ্কার। সন্ধ্যার কিছুপূর্বে দপ্রু ঝিরি পাকাই ম্রো আদিবাসী পাড়া থেকে আলীকদমের উদ্দেশ্যে পুনরায় রওয়ানা হই। আলীকদম বাজারে সন্ধ্যার সময়ই সেরে নেই রাতের খাবার। খাবারের পর পরই রাংক্লাং ম্রোকে সাথে নিয়ে টম টম গাড়িতে চড়ে রওয়ানা হই চিওনি কুয়া ম্রো পাড়ায়। রাতে চিওনি পাড়ায় ম্রো আদিবাসীদের সাথে তাদের টং ঘরে বসে মেতে উঠি আড্ডায়। ম্রোদের ক্ষণিকের আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করে। রাতে চিওনি পাড়ার পাশের মেরান ম্রোদের ইয়াংকি ম্রো পাড়ায় রাংক্লাং ম্রো আমাদের নিয়ে যায়। মেরান ম্রো বাড়িতে রাত্রী যাপন করি। ভোরে ঘুম থেকে ওঠে দেখি ম্রো নারীরা ভোরে কাজে যাওয়ার জন্য রান্না করে তাদের পরিবারের সদস্যদের যার যার ঝুড়িতে কলা পাতায় মোচা ভাত তরকারি দিয়ে প্রস্তুত করে রেখে দূরের পাহাড়ে তাদের জুম-এ চলে যায়।

সকালে ম্রো পাড়ায় নাস্তা করে রওয়ানা হলাম তমক্ষীয়ং ঝিরির পাড়ের পাহাড়ের উপর ম্রো পাড়া রেংয়া পাড়ার উদ্দেশ্যে। ইয়াংকি কুয়া হতে ঝিরি ও উঁচু-নিচু পাহাড়ের পথে পায়ে হেটে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ের ম্রো পাড়ায় পৌঁছলাম সকাল ১১টায়। এখানে পাহাড়ের উচ্চতায় ওঠা অনেকটা সহজসাধ্য হলেও পাহাড় হতে নিচে নেমে আসা অনেকটা কঠিন। রেংয়া পাড়ায় যাওয়ার পথে ঝিরির ডান পাশে ছোট অতিচন্দ্র কারবারী ত্রিপুরাকামী পাড়ায় গেলাম। শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ধকল কাটাতে ত্রিপুরাকামীতে আমাদের যাত্রা বিরতি। ত্রিপুরাকামীর টং ঘর এবং ত্রিপুরাকামী নারীদের গলায় আদিকালের অলঙ্কারগুলো আমাদের বিমুগ্ধ করে। শত বছরের অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখা ত্রিপুরাকামী নারীদের সাথে জমিয়ে খোশগল্প করি। পুরো ত্রিপুরা পাড়ায় ঘরে ঝিরি পথে যাত্রা শুরু রেংয়া পাড়ার উদ্দেশ্যে। উচু পাহাড়ে ম্রো রেংয়া পাড়া। রেংয়া পাড়া হতে ফিরতি পথে তুমক্ষীয়ং ঝিরি দিয়ে যখন ফিরে এলাম চিওনি পাড়ায় তখন সুর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। চিওনি পাড়ার ছোট ছোট ম্রো ছেলে মেয়েরা বেশির ভাগই বাংলা জানে না। এ পাড়াটিতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফিরে আসি আলীকদম বাজারে।

কিভাবে যাবেন :

ঢাকা বা চট্রগ্রাম হতে কক্সবাজার গামী বাসে চকরিয়া গিয়ে নামতে হবে। ঢাকা হতে চকরিয়া বাস ভাড়া নেবে প্রতিজন ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা। চকরিয়া হতে মাতামুহুরী লোকাল বাসে অথবা চাঁদের গাড়িতে আলীকদম শহরে যেতে পারেন। চকরিয়া থেকে আলীকদমে যাবার ভাড়া নেবে জনপ্রতি ৭০ থেকে ১০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন :

আলীকদমে থাকার জন্য উপজেলা রেস্ট হাউজ অথবা ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠা গেস্ট হাউজে রাত্রী যাপন করতে পারেন।

কোথায় খাবেন :

আলীকদম বাজারে ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী পরিচালিত কয়েকটি ছোট হোটেল আছে। এসব হোটেলে খেয়ে নিতে পারেন দুপুর ও রাতের খাবার।

ম্রো পাড়ায় কিভাবে যাবেন :

ম্রো পাড়ায় যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই কোনও গাইডের সাহায্য নিতে হবে। নতুবা পড়তে পারেন দুটি সমস্যায়। ম্রো পাড়ায় যেতে পাড়ি দিতে হয় গভীর অরণ্য। পথ ভূলে গেলে সহজে পথের দেখা আর নাও পেতে পারেন। আর গাইড ছাড়া একা ম্রো পাড়ায় গেলে ম্রো আদিবাসীদের কাছ থেকে শুভনীয় আচরণ নাও পেতে পারেন। কারণ পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী ম্রোরা বাঙালি সংস্কৃতি থেকে শত বছর পিছিয়ে। অপরিচিত কাউকে ম্রোরা সহজে মেনে নিতে পারেন না। তাই অবশ্যই নিরাপদ ভ্রমণের জন্য স্থানীয় গাইডের সাহায্য নিতেই হবে। আলীকদম বাজারেই খোঁজ করলে স্থানীয় গাইড পাওয়া যায়। আর আলীকদম যাত্রার পূর্বে কোনও পরিচিত জনদের মাধ্যমে আগাম খবর দিয়েও গাইডের ব্যবস্থা করা যায়।

পিডিএসও/রি.মা