পাখিহীন গ্রাম নিষ্প্রাণ

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৯, ১৭:১৭

শ্রীধর দত্ত

পাখি পছন্দ করে না এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং মানুষের বিনোদনের খোরাক। পাখির কিচিরমিচির ডাক, চঞ্চলতা, বৈচিত্র্যময় জীবন কার না পছন্দ। একসময় গ্রামাঞ্চলের বিলে-ঝিলে, ঝোপে-ঝাড়ে, গাছের ডালে, বাগানে কিংবা বাড়ির আঙ্গিনার ডালে বসে বিভিন্ন পাখির সুরের ধ্বনিতে প্রাণে দোলা দিতো।

কয়েক বছর আগেও মানুষের ঘুম ভাঙ্গত পাখির ডাকে। তখন বোঝা যেতো ভোর হয়েছে। পাখির কলকাকরীই বলে দিতো এখন সকাল, শুরু হতো দৈনেন্দিন কর্মচঞ্চলতা। কিন্তু এখন যেন সেই পাখির ডাক হারিয়ে গেছে, এখন আর গাছ গাছালিতে পাখির ডাক নেই।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভ’মি থাকা প্রয়েজন অথচ বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ ১৭.৪ ভাগ। দেশের মোট আয়তন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৯৩ বর্গকিলোমিটার । এর মধ্যে বন ভূমি রয়েছে ২৩ হাজার ৯৯৮ বর্গকিলোমিটার যা জনসংখার চাহিদার তুলনায় অনেক কম । তারপরও যেটুকু আছে তাও মানুষ র্নিচিারে কেটে ফেলছে ফলে পরিবেশ বির্পযয়, জলবায়ুর পরির্বতন , বদলে যাচ্ছে ঋতু চক্র , র্বষাকালে বৃষ্টি নেই ,বসন্ততেও শীত এতে মানুষের পাশাপাশি হুমকির মুখে পাখিকুল ।

পাখির প্রধান বাসস্থান হলো বন-জঙ্গল,গাছ-গাছালি।বর্তমানে এমন কোনও জায়গা নেই, যেখানে মানুষ পৌঁছতে পারে না। তাই বাসস্থান হারাচ্ছে পাখি। পোকা-মাকড়ের সংখ্যাও কমে গেছে।গাছের পাতা খেয়ে থাকে পোকামাকড়। আবার পোকামাকড় খেয়ে গাছের পাতাকে রক্ষা করে পাখি। গাছের পাতায় গাছ খাদ্য তৈরি করে থাকে। এভাবেই পাখি বন ও পরিবেশকে রক্ষা করে। পাখিদের খাবারের অভাবও দেখা যাচ্ছে। পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের জীবনধারণও সঙ্কটে।

ক্রমশ নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জঙ্গল, গাছপালা ও ঘাসজমি কেটে ফেলায় স্বাভাবিক বাসস্থান সংকটে পাল্লা দিয়ে কমে যাচ্ছে পাখির সংখ্যা। বাড়ি ও কলকারখানা নির্মাণ, সড়ক সম্প্রসারণ ইত্যাদি কারণে গাছ কেটে সাবাড় করা হয়। বন উজার করে গাছ কাটার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে পাখির বিচরণ কমে যাচ্ছে। যে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য দরকার খাদ্য ও আবাসস্থল। গাছ কাটায় পাখি আবাসস্থল হারাচ্ছে। জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ছোট মাছ, পোকামাকড় মারা যায়।

ফলে নিরাপদ খাদ্য তো পাখি পাচ্ছেই না, আবার বিষযুক্ত খাদ্য খেয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। বংশবৃদ্ধি দূরের কথা, টিকে থাকাই পাখিদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক বাসস্থান ও খাদ্য সংকট আর জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন পাখি। পরিবেশ দূষণের ফলে আবহাওয়ার যে পরিবর্তন হচ্ছে, তার ফলেও মারা যাচ্ছে অনেক পাখি। তা ছাড়া জলাশয়ের অভাবেও পাখির সংখ্যা কমছে।

বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পাখির মধ্যে আছে দাগিডানা, সারল, ধূসর মেটে তিতির, বালি হাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিলা, ধলাপেট বগ, সাদাফোঁটা গগন রেড, রাজ শকুন, দাগি বুক টিয়াটুটি, লাল মাথা টিয়াটুটি, গাছ আঁচড়া, সবুজ ময়ূর ইত্যাদি।

যে পাখিগুলো আগে খুব দেখা যেত, এখন কম দেখা যায় সেগুলো হল- দোয়েল, টিয়া, ময়না, বুলবুলি, চড়াই, শ্যামা, শালিক, টুনটুনি, ঘুঘু, কাঠঠোকরা, মাছরাঙা, কোকিল, চন্দনা, সাদা বক, কালিম, ডানা ঘুরানি, বউ কথা কও, বাবুই ইত্যাদি।

সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার যেমন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি জাতীয় পাখি দোয়েলও আর মানুষের চোখে পড়েনা। এক সময় দেশীয় প্রজাতির পাখি গুলো চিড়িয়াখানায়ও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। পাখির সংখ্যা যেখানে কম, সেখানে প্রকৃতি মৃতপ্রায়। প্রকৃতির সৌন্দর্যেও পাখির ভূমিকা অনেক।

পাখিহীন, বৃক্ষহীন পরিবেশ এক সময়  মানুষের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সরকারি-বেসরকারিভাবে এবং জনগণের সচেতনতায়  এসব পাখি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে এক সময় ধ্বংস হয়ে যাবে। গাছ এবং পাখি পরিবেশের জন্য অতপ্রোতভাবে ভাবে জড়িত।  তাই যার যতটুকু সম্ভব নিজ উদ্যোগী হয়ে পাখির পরিবেশ রক্ষায় সাধ্য মতো চেষ্টা করা উচিত।

পিডিএসও/তাজ