নারীর মর্যাদা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:০৮

সাজ্জাদ হোসেন, সংবাদকর্মী

নারী বলতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠজীব মানুষের স্ত্রী-বাচকতা নির্দেশক রূপটিকে বোঝানো হয়। তাছাড়া বয়সের বাধা ডিঙিয়েও নারী শব্দটি সমগ্র স্ত্রী জাতিকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হতে পারে—নারী অধিকার দ্বারা সমগ্র স্ত্রী জাতির প্রাপ্য অধিকারকে বোঝানো হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে নারীদের কতোটুকুই বা মর্যাদা এবং অধিকার রক্ষা হচ্ছে? ১৯ শতকের দিকে মুসলিম শাসনামলে সমাজে নারী মর্যাদার বেশকিছু দিক চোখে পড়ে। তখন নারীরা ছিলেন পুরুষের উপর নির্ভরশীল। পুরুষের কর্মই ছিল পরিবারের প্রধান জীবিকা নির্বাহ করা। নারীর বাড়ির বাইরে কাজ করাটাকে এক প্রকার অমঙ্গল হিসেবে ধরে নেওয়া হতো। তাদের মেধা ও পরিশ্রমের প্রয়োগ গৃহের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর্থিক এবং সামাজিক সক্ষমতার অভাবে সে সকল নারী বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ছায়াতলে আসতে পারেন নি। মর্যাদাহীন সেসব নারীকে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন অবরোধবাসিনী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বর্তমান সমাজের চিত্রটা হয়তো একটু ভিন্নমতের কথা বলে। মেয়েরা এখন বাসার গণ্ডি পেরিয়ে আলোর পথে আসতে পেরেছে। শিক্ষার হাওয়া তাদের মাঝেও সমান ছড়িয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে বড়বড় ডিগ্রি অর্জন করে মেধাশক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে প্রত্যেক স্তরে। জীবিকা অর্জনে পুরুষের পাশাপাশি পরিবারে অবদান রাখছে অনেকেই। আজ তারা আর অবরোধবাসিনী নেই! কিন্তু গৃহের বাইরে কতোটুকু নিরাপদ? রাস্তাঘাটে স্বাধীনভাবে কতোটুকুই বা মর্যাদার সাথে চলাফেরা করতে পারছে? এটা সত্যিই এ সময়ের বিতর্কের বিষয়!

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফেনীর নুসরাতের পর রাজধানীর মুগদার হাসি বেগম। একজন মাদ্রাসাছাত্রী অপরজন ছিলেন গৃহবধূ। দুজনকেই কেরোসিনের আগুনে নির্মম বলি হতে হয়। ঘটনা দুটি ঘটে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে। ধর্ষণ এবং শিশু ও নারী নির্যাতনে নজিরবিহীন রেকর্ড হতে চলেছে বাংলাদেশে। একের পর এক যৌন আক্রমণ ও ধর্ষণের ঘটনার লেজ যেন ধরাই যাচ্ছে না। আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ সামাজিক জীবনের উপর। এক শ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার লোকেদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমল কিশোরীরাও। 

প্রথম আলোর ১৭ এপ্রিলে প্রকাশিত খবরের ভাষ্যমতে, শুক্রবার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭ জেলায় ১২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। এর পরদিনই খবর বের হলো, বখাটেদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বরিশাল ও গাজীপুরে দুই ছাত্রীর আত্মহত্যা। অপরদিকে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতে গাজীপুরে কলেজছাত্রী খুন। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনাটি এ দেশকে নাড়া দিয়েছিল।

মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’র গত বছরের রিপোর্ট অনুযায়ী দিনে গড়ে প্রায় ৩টি নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২০০১ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস’ গঠিত হয়। সেসব সেন্টারগুলোতে মামলা হয় ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ মামলার নিষ্পত্তি হয় না। 

ধর্ষণের এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বেশ কিছু কারণ মনে করেন। যেমন, ধর্ষণের মামলাগুলো বিচার অন্য মামলার বিচারের সঙ্গে হয় বলে দেরী হয়। আবার ঘটনার পর অনেক ভুক্তভোগী লোকলজ্জার ভয়ে প্রকাশ করে না কিংবা হুমকির মুখে মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। প্রভাবশালীদের ক্ষমতা এবং বেপরোয়া আচরণের কারণেও এসব ঘৃণ্য মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না বলে মনে করেন অনেকেই।

নারী ও শিশু ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ বন্ধ করতে হলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। অভিভাবক, সমাজ ও স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। অমানবিক এ অন্যায়ের বিপক্ষে আওয়াজ তুলতে হবে। তারুণ্যের শক্তিতেই এক সময় এ দেশের দামালরা রক্তের বিনিময়ে এনেছে স্বাধীনতা। তবে আজও খর্ব হচ্ছে স্বাধীনতা। আজও তো একাত্তরের পাকিস্তানি হায়নাদের মতো শিকারীদের হাতে প্রতিনিয়ত শত শত নারীর ইজ্জত লুটছে।

 তাই জেগে ওঠো নওজোয়ান। এসো ঝংকার তুলি একসাথে! উদিত হোক ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য’র জয়ধ্বনি, ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ-স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ- বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি’

লেখক : সংবাদকর্মী

পিডিএসও/তাজ