সাগর কন্যার দেশে একদিন

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৩৬

সাইফুল বীন শরীফ, শিক্ষার্থী

কেউ যদি প্রশ্ন করে, আপনার কাছে দেশের বুকে দেখার মত সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কি? আমি বলব, সাগর কন্যার দেশ কুয়াকাটায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য অবলোকন করা। যেখানে জলে আর সূর্যে এক হয়ে গেছে। কি অপূর্ব দৃশ্য!  সূর্য মামার জলের সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে চলে যাওয়া। যেন সাদা ডিমের চামড়া ভেদ করে বের হয়ে যাচ্ছে লালে-হলুদে কুসুমটি। বিধাতা যেন সব সৌন্দর্য এখানেই জমাট বেঁধে রেখেছেন। লাল কাকড়াদের রাজত্ব, এখানে তারা স্বাধীন। এক পলক দেখা দিয়ে আবার হারিয়ে যায় বালির অরণ্যে।

গল্প নয়, বলছি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ, ২৬তম ব্যাচের সাগর কন্যার দেশ কুয়াকাটা সফরের স্মৃতিকথা। সময়টা ছিল ০৯/০৩/২০১৯ ইংরেজি, শনিবার। সকাল থেকে সবার মন ফুরফুরে অবস্থা বিরাজ করছিল,সকাল দশটা থেকে এক এক করে ক্যাম্পাসে আসতে আরম্ভ করে সবাই। বাস রবীন্দ্র-নজরুল কলা ভবনের সামনে অপেক্ষমান, বেগ এন্ড বেগেজ সবাই বাসে উঠে বসলো, লটারির মাধ্যমে শ্রদ্ধেয় রাশেদ স্যার,মনজুর স্যার, রেজাউল স্যার সকলের সিট প্লান করে দিলেন। বারটার সময় বাংলা বিভাগের কাছ থেকে শুভ কামনা নিয়ে বাস যাত্রা শুরু করল সাগর কন্যার দেশ কুয়াকাটার উদ্দেশে।

বাসে উঠে সবাই যেন আনন্দের সাগরে ভাসতে লাগলো। মুবিনের সুরেলা কন্ঠে গান বেজে উঠতেই সবার মনে এক আনন্দ ঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। সাইফুল বীন শরীফের চাটগাঁইয়া ভাষায় ‘মধু হয় হয় আরে বিষ হাওয়াইলা গান’. মুজাহিদের কন্ঠে অসাধারণ কবিতা আবৃতি, অনি ও কল্পনার কন্ঠে যৌথ কবিতা আবৃতি, সব মিলিয়ে দিনটি ছিল জীবনের সব স্মরণীয় মুহূর্তে ঘেরা। রাত দশটায় বাস পৌছে যায় কুয়াকাটা, বাস থেকে নেমে পাঁচ মিনিট হেটে হোটেলে পৌঁছায়। আর কেন দেরি!

সেই রাতেই সমুদ্রের সাথে দেহ বন্ধনের মিলন ঘটাতে সবাই চলে যায় সী বীচে। রাতের বীচ দেখে মনে হয় কতইনা অনিন্দ্য, আকাশের তারার সাথে জলের কতইনা সখ্যতা। সমুদ্রের গর্জন আর ঢেউ আকৃষ্ট করে প্রতিটি কোমল মন। পরদিন ভোর ৪:৩০ টায় সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠল, বাইকে করে ভোর ৫টায় যাত্রা সূর্যোদয় দেখার উদ্দেশ্যে। প্রকৃতি যেন তার সব রুপ উজার করে দিয়েছে এখানে, সমুদ্র ঘেষে চলে যাচ্ছে চির অনিন্দ্যের পথে। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পাদভ’মি যেন পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়। সুবিশাল জলতরঙ্গের উপর দিয়ে উকি দিয়ে সূর্য ওঠা, কি অনিন্দ্য দৃশ্য!

এটি বাংলাদেশের একমাত্র জায়গা, যেখান থেকে এক সঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। তারপর দর্শন হল, সমুদ্র উপকুলে সুবিশাল জায়গা জুড়ে কৃত্রিম ঝাউবন। কুয়াকাটার কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী রাখাইনদের বসবাস, বিচিত্র তাদের জীবন, বিচিত্র তাদের জীবনকর্ম। সমুদ্র থেকে মাছ ধরা তাদের পেশা ও জীবীকার অন্যতম উৎস। দেখা যায়, মাছ শুটকী করার কিছু অনন্য পদ্ধতি।

এছাড়াও রাখাইনদের হাতের বুননে কুটির শিল্প দেখে মুগ্ধ না হওয়ার উপায় নেই। আরেক সৌন্দর্যতায় পূর্ণ জায়গা হল মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির। সেখানে দেখা গেলো উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় গৌতম বৌদ্ধের মূর্তি। দেখে যেন মনে হয় অনাবিষ্কৃত স্বর্ণের খণি। সময় দুপুর ১২টা, সবাই সমুদ্র স্নানে যাওয়ার জন্য অস্থির । দল বেধে স্যারদের নেতৃত্বে সবাই চলে যায় সমুদ্র স্নানে। একসাথে জলকেলি, স্যার আর ছাত্র মিলে যেন বন্ধুর বন্ধনে আবদ্ধ।

এখানে সবাই মিলে যেন একটি দেহ। জল তরঙ্গে ভেসে যায় মন, উতাল পাতাল ঢেউয়ে নুইয়ে পরে সবাই। সমুদ্রের জোয়ারের জল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সূর্যোদয়, সমুদ্র স্নান, রাখাইন পল্লী পরিদর্শন, ঐতিহাসিক মন্দির পরিদর্শন, সূর্যাস্ত, সব দেখা হল। এখন ফেরার পালা, কিন্তু যেতে নাহি মন চাই, তবু চলে যেতে হয়। কিছু স্মৃতি অমলিন হয়ে থাকবে, অন্তিম সময় পর্যন্ত।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

পিডিএসও/তাজ