গাছ ও বইয়ের ফেরিওয়ালা তেঁতুলিয়ার মামুন

প্রধানমন্ত্রীকে গাছ উপহার দিতে চান এই তরুণ

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ২০:৩৩

এস কে দোয়েল

গাছ আর বই বিতরণ নিয়ে ব্যস্ত দেশবরেণ্য নারী লেখিকা সেলিনা হোসেনের স্বপ্নের ছেলে মামুন। তার স্বপ্ন দুষণমুক্ত সবুজ পৃথিবী গড়া। জ্ঞানের দীপ্তশিখায় আলোকিত হবে সমাজ। তাইতো পাড়ায় পাড়ায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে গাছ বিতরণের সাথে বইও বিতরণ করা এ যেন আরেক পলান সরকার।

বাংলা সাহিত্যে  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা সত্তে¡ও গাছ ও বইয়ের ফেরিওয়ালা হয়েছে দেশের উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার আজিজনগর গ্রামের মাহমুদুল ইসলাম মামুন নামের এক তরুণ।  বাবা আজহারুল ইসলাম পঞ্চগড় চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী।  মা মাহমুদা বেগম গৃহিনী। দুই ভাইয়ের মধ্যে মামুন ছোট।  সবুজ প্রকৃতির গড়ার স্বপ্ন দেখা এ তরুণ নিজের জমানো কষ্টার্জিত টাকায় গাছ কিনে বিতরণ করে আসছেন দীর্ঘ ৭ বৎসর ধরে। পাড়ায় মহল্লায় বিভিন্ন বয়সী মানুষদের জড়ো করে বই পড়িয়ে শোনান।  এ জন্য গড়ে তুলেছেন সন্ধ্যা-রাতের পাঠশালা।

রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী এ তরুণ। ইচ্ছে করলে যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করতে পারতেন সম্মানজনক চাকরি। কিন্তু তা না করে হয়েছেন বই ও গাছের ফেরিওয়ালা। সামাজিক দায়বদ্ধতা, নাগরিক হিসেবে কর্তব্য পালনই করছে এ তরুণ। তিনি মনে করেন, উচ্চশিক্ষা নিলেই যে চাকরি করতে হবে, তা নয়। শিক্ষিত মানেই আলোর প্রদীপ। সে আলোর প্রদীপ ছড়াতেই উদ্যোগ নিয়েছেন গাছ ও বই বিতরণ করার।

হতদরিদ্র, মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা মামুনের কাছে পড়ালেখা শিখে বিনামূল্যে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেখানোর পাশাপাশি সবুজ প্রকৃতির গড়ার পদ্ধতিও শেখান।  তাই গাছ উপহার দেন শিশু-বৃদ্ধসহ সবাইকে। এতে করে ছাত্ররা যেমন ইতিহাস জানবে, তেমনি মানববোধ জাগ্রত তৈরি হবে। এ স্বপ্ন নিয়ে ২০১৩ সাল থেকে তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষদের মাঝে গাছ বিলি করে আসছে মামুন। পলান সরকারকে মডেল মনে করে আলোর প্রদীপ হয়ে ক্লান্তিহীন কাজ করে চলছেন তিনি।

তার নিজ গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এমন ১০ গ্রামে হাজার হাজার গাছ লাগানো রয়েছে তার। গাছ লাগিয়েছেন ঢাকা শহরেও। এছাড়া রংপুর, ঠাকুরগাঁও ছাড়াও যখন যে শহরে যান সে শহরেই গাছ লাগানো, বই নিয়ে কথা বলেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিদের সান্নিধ্যে গিয়েও সাহিত্য পাঠ আবশ্যক করার অনুরোধ করেছেন এ তরুণ। শুধু গাছপাগলই নন, শিশু কিশোর ও তরুণদের বিনামূল্যে সাহিত্যের বইও উপহার দেন তিনি। বাংলা সাহিত্যের প্রতিও রয়েছে ব্যাপক ঝোঁক। নিজেও লিখেছেন উপন্যাস।  

২০১৪ সালে অমর একুশে বইমেলায় জননী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার লেখা ‘লাল ফিতায় অমিয়’ নামে একটি উপন্যাস।  সাহিত্য প্রীতি থাকায় হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে সব গোয়েন্দা সিরিজ, এমনকি সুনীল-বঙ্কিমদের সব বই তার সংগ্রহে।  শিশু কিশোরদের গল্প, উপন্যাস, রম্য, সায়েন্স ফিকশনসহ নানা বই উপহার দেন তিনি।  শিশু কিশোরদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে বিতরণ করেছেন সহস্রাধিক সাহিত্য, গল্প ও উপন্যাসের বইও।

তবে নিজের টাকায় গাছের চারা ও বই ফেরি করা তরুণ মামুন টাকা পান কোথায়— এমন প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। প্রশ্নের উত্তরে মামুন বলেন, এসব কাজের জন্য আমি বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালনের জন্য খামার গড়ে তুলেছি।  ডিম ও বাচ্চা বিক্রি করে গাছের চারা ও বই কিনি।  পারিবারিক চা-বাগানেও কাজ করি।  বিশেষ করে আমার এ কাজে উৎসাহ দিতে বাবা-মাও বাড়িয়েছেন সহযোগিতার হাত। এ থেকে যা আয় হয়, তাই দিয়ে গাছ ও বই কিনে উপহার দেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও গাছ উপহার দিতে চান বলে জানালেন মামুন। এজন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠিও পাঠিয়েছেন। 

ফুল, ফলদ ও বনজ গাছের চারা উপহার দিয়েছেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেও। দেশবরেণ্য সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গাছের চারা ও বই উপহার দিয়েছেন।  

এছাড়া বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াতসহ সামাজিক অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে উপহার হিসেবে তুলে দিচ্ছেন বই ও গাছের চারা। এভাবে তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন গ্রামের শিশুসহ নানান বয়সীদের গাছের চারা উপহার দেওয়ার পাশাপাশি বই পড়ার অভ্যাস গড়তে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন এ তরুণ। নিবিড় পল্লীতে স্বেচ্ছায় এমন কাজের কথা জেনে সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন তাকে ডাকেন ‘স্বপ্নের ছেলে’ নামে।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে মামুন জানান, নিরক্ষরতা, মাদক ও কুসংস্কারসহ বর্তমান সমাজ নানাভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। পরিবেশ বাঁচাতে গাছপালার বিকল্প নেই। একইভাবে শিশু কিশোরদের সুষ্ঠু বিনোদনের প্রয়োজন। তাদের শুধু পাঠ্যবই পড়াই যথেষ্ট নয়। সবারই সাহিত্য ও চলমান বিষয় নিয়ে পড়াশোনা জরুরি। এ জন্যই পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

সবুজ বনায়ন গাছপালার অভাবে পৃথিবীতে বৈশ্যিক আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, তীব্র খরাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। তাই একটি গাছ উপহার দিয়ে তাদের আরও একটি গাছের চারা কিনে রোপণের আহ্বান জানাই। হাজার হাজার বাড়িতে যত্নে বেড়ে উঠছে আমার দেওয়া উপহারের গাছ। এটা দেখলে গর্বে মন ভরে যায়। মানুষে মানুষে সম্মানবোধের সর্ম্পক গড়ে উঠুক, সবার জন্য শুভ কামনা। পৃথিবী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে- এ শ্লোগানই আমি বিশ্বাস করি। 

মামুনের এ কাজের উদ্দীপনা দেখে গর্বের সাথে মা মাহমুদা বেগম বলেন, ‘ওর কাজে আমরা খুশি। নিজের কাজের পাশাপাশি মানুষের উপকার করছে। পরোপকারী এমন ছেলেকে নিয়ে সত্যিই আমি গর্বিত। টাকা ছাড়া নাকি স্বপ্ন দেখা যায় না। কিন্তু আমার ছেলেটা তেমন টাকা ছাড়াই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে কাজ করছে। আমি সব সময় ওর পাশে রয়েছি। মামুন পারছে এবং পারবে।’

পিডিএসও/তাজ