একটি দুর্ঘটনা বিদীর্ণ করে অগণিত জীবন

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:১৬ | আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৫৯

এস আর শানু খান, শিক্ষার্থী

আমরা মানুষরা স্বভাবজাতভাবে কতখানি যে ভুলোমন সেটার প্রমাণ নানা বাস্তবতা। আমরা প্রতিনিয়ত টিভিতে, রেডিওতে, নানা সময়ে লিফলেটে, পোস্টারে, ব্যানারে কত যে সচেতনতামূলক বাণী দেখি। কিন্তু সেগুলো আমাদের হিসাবে এসে দেখা পযর্ন্ত থেমে থাকে। ভেতরে জাগাতে পারে না। গাড়িতে-বাড়িতে, এখানে সেখানে চোখ মেলতেই দেখি- একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। এ কথার ভাবার্থ আমরা জানিও কিন্তু এ কথা আমাদের বুঝে আসে না- ঠিক ততক্ষণ; যতক্ষণনা আমরা এই দুর্ঘটনার ভুক্তভোগী না হই।

তেমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি ট্রলি চালক চঞ্চল। ব্যক্তি হিসাবে চঞ্চল খুবই উদারচেতা ও মানবতাবাদী হতদরিদ্র একজন মানুষ। ধর্মে হিন্দু হলেও মানবিক দিক থেকে হিন্দু মুসলমান সবাই তার কাছে সমান। যখন যে ডাকে তার ডাকেই সাড়া দেয়। গভীর রাতে কারও কোনও সমস্যা হলেই চঞ্চল ট্রলি নিয়ে হাজির হয় সেখানে। কোনও অজুহাত খাড়া করেনি কোনওদিন। দুঃসময়ে সাথী হিসেবে চঞ্চলের নামই পরিচিত। গ্রামের কোনো একজনের আত্মীয়ের বাড়িতে শ্রাদ্ধ খেতে গিয়েছিলো চঞ্চলদের পাড়ারই বেশ কয়েকজন হিন্দু মহিলা-পুরুষ চঞ্চলের ট্রলিতে। শ্রাদ্ধ খেয়ে ফেরার পথে সামান্য অসাবধানতার কারণে ঘটে এক বিরাট দুর্ঘটনা। ট্রলি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছের সাথে সরাসরি ধাক্কা লাগে। নিয়তি অন্যদিকে বাঁক নেয়।

করুণ বিরহের বাঁশি বেজে উঠে দুটি পরিবারে। চঞ্চল গাছে বাড়ি খেয়ে বাম পা ভেঙে ঘুরে পড়ে নিজের বুকের ওপর। আর  পিছনে বসে থাকা সবিতা তিন ছেলের জননী পিচের রাস্তার ওপর কাত হয়ে পড়েই রক্তে রঞ্জিত হয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে। জ্ঞান হারিয়ে এক ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সবিতাকে নিয়ে।

বাকি সবাই মোটামুটি আঘাত পেলেও কারও আঘাত ততটা নয়। চঞ্চল ও সবিতাকে তৎক্ষনাথ মাইক্রোতে করে নিয়ে যাওয়া হয় মাগুরা সদর হাসপাতালে। সেখানে চঞ্চলকে ভর্তি করলেও ডাক্তাররা সবিতাকে ফরিদপুর নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সবিতার আঘাত ছিলো অনেক গুপ্তঘাতকের মত। মাথায় আঘাত পেলেও মাথার কোথাও ক্ষত নেই অথচ নাক, কান, আর মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে স্রোতের মতো। ফরিদপুর নিয়ে কাজ হলো না। সেখান থেকে পাঠানো হলো  ঢাকার নিউরো সাইন্স হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তার দেখে জানায় অপারেশন খুবই জরুরি। পরীক্ষা করে জানান যে, মাথার ভেতরে মারাত্মকভাবে রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং রক্ত মাথার ভেতরে মগজে জমাট বেঁধেছে। সারা গ্রামের সকল মানুষের মুখে মুখে তখন সবিতা আর চঞ্চলের কথা।

সবিতা বড্ড কর্মঠ মহিলা। সারাদিন এটাসেটা করে জীবন ধারণ করেন। কখনও মাঠে গিয়ে গরুর জন্য ঘাস আবার কখনও বাগানে বাগানে খড়ি কুড়িয়ে বেড়াই। টানাপোড়েনের সংসার। স্বামী অন্যের বরজে কামলা খাটে। সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলা ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করা সবিতা চরিত্রের এক অন্যন্য দিক। মানুষের মনে সবিতার অবস্থানটা ছিলো অন্যরকম। চঞ্চলের বেলায়ও ঠিক তাই। সবাই বলাবলি করতে লাগলো ভালো মানুষেরই বিপদ বেশি হয়। অপারেশন করতে টাকা লাগবে অনেক। খবর পৌঁছে গেলো গ্রামে।

আমাকে ফোন করলেন আশীষ দাদা। সবিতাদের বাড়ির পাশেই বাড়ি। দাদা ফোন করলেন আমাকে পত্রিকায় দিয়ে সাহায্যের আবেদন করবার জন্য। আমি ছুটে গেলাম। ছবি কালেকশন করলাম আশীষ দাদার বউকে দিয়ে। ছবি তুলে পত্রিকাসহ বেশ কয়েকটা অনলাইন পোর্টালে দিয়ে সেগুলো ফেসবুকে শেয়ার করলাম। কিছু টাকা ম্যানেজ হয়ে গেল। সবিতার অপারেশন করা হলো। মাথার মগজ মাথা থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল দুইদিনের মত। পরে অপারেশন হলেও জ্ঞান ফেরেনা সবিতার। অবশেষে এক সপ্তাহ পর জ্ঞান ফেরে সবিতার। ২৬ দিন পরে বাড়ি ফেরেন সবিতা। আর চঞ্চল ফেরেন ৩৫ দিন পর।

বেশ কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম সবিতা ও চঞ্চলের এখনকার জীবন নিয়ে লিখবো। তাইতো সেদিন বিকালে ক্যামেরা নিয়ে বের হলাম। প্রথমে গেলাম চঞ্চলের বাড়ি। স্ত্রী জানাল, মোড়ের দিকে গেছে। চঞ্চল ১১ মাসের এক ছেলে সন্তানের জনক। স্ত্রী সন্তান ,ছোটভাই ও বাবা মাকে নিয়ে সংসার। ট্রলিই রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। সংসারের সবার চোখে মুখে এখন হতাশার ছাপ। মোড়ে গিয়ে দেখা হল চঞ্চলের সাথে। চঞ্চল এখন ক্রাচে ভর করে চলে। সামান্য হেঁটেই বললো খুব কষ্ট হচ্ছে। পায়ের ভেতর তার লোহার রড ঢুকানো রয়েছে এখনও। পা এখনও ঠিক হয়ে উঠেনি। সময় লাগবে। ঠিক হলে পরে অপারেশন করে রড বের করা হবে। ততদিন ক্রাচে ভর করেই চলতে হবে। চঞ্চলের ডান থেকে বাম পা শুকিয়ে চিকন হয়ে গেছে অনেক।

চঞ্চলের সাথে বসে অনেক কথা হলো। বিস্তারিত শুনলাম তার নিজের মুখে। চঞ্চল জানালো সামান্য অসাবধানতার জন্য এমন ভোগান্তি। একদম সামান্য। তবে আল্লাহর কৃপা যে আমি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারায় ট্রলির বাকি মানুষগুলোর ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। তা না হলে ঘটনা আরও মারাত্মক হতে পারতো। সরাসরি গাছে না মারলে ট্রলিসহ মানুষ পুকুরে যেত। কেমন চলছে সংসার ? শুনতেই একটা মলিন হাসি দিয়ে লম্বা একটা হাই তুলে বললো -এই কোনওরকম চলতে হবে তা ছাড়া আর কি করার ভাই!

পরে সবিতার বাড়ি গেলাম। সবিতা দিদি আমাকে দেখেই চিনতে পারলেন। চেহারা দেখে আমি চমকে গেলাম। চিনতেই কষ্ট হচ্ছিলো আমার। সবিতা দিদি এখন অনেক বেশি কথা বলে। একই কথা বার বার বলে। সবিতা দিদি কিছু বড়ি বের করে আমার হাতে দিয়ে বললো, এগুলো খেয়ে আমার মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে। এদিক সেদিক মাথা ঘুরে পড়ে যাই। আমি দেখলাম হাই পাওয়ারের এন্টিবায়োটিক। নিষেধ করলাম ওগুলো বেশি খেতে। এখন কেমন লাগে জানতে চাইলে সবিতা দিদি বললেন, ভালো লাগে না ভাই। বসে শুয়ে থাকতে ভালো লাগে না। তুইই বল আমি কি বসে শুয়ে থাকা মানুষ? আমি বললাম কি আর করা, দিদি সবই আল্লাহর ইচ্ছা। সবচেয়ে বড় কথা যে আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কোনো না কোনোভাবে চলবেই দিদি।

দিদি শেষে একটা কথা বললেন, সবার আশীর্বাদ ছিলো আর ওপরে আল্লাহ একজন ছিলেন বলেই হয়তো আমি বেঁচে গেছি ভাই। সামান্য অসাবধানতার কারণে দুটি পরিবারে আজ করুণ পরিস্থিতি। সুখের সংসারে আজ বিরহের কালো মেঘের ঘনঘটা!

পিডিএসও/তাজ