নতুন প্রজন্মের লোকক্রীড়া চর্চা

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:০২ | আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:০৬

সাজ্জাদ হোসেন, লেখক
ama ami

‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে, ঢাক ঢোল ঝাঁঝর বাজে’, কখনোবা ‘ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি’ আর দম বন্ধ করে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা ‘বৌছি’ লোকখেলাগুলোর কদর এখন আর তেমন  চোখে পড়ে না। আমাদের সমাজ থেকে এদেশের আঞ্চলিক স্বকীয় বৈশিষ্ট্যময় এসব লোকক্রীড়াগুলো হারিয়ে যাচ্ছে দিনদিন। 

বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হাডুডু হলেও একে টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক কিংবা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। অথচ এসব লোকখেলাগুলোর অভ্যন্তরীণ ইতিহাস খতিয়ে দেখলে প্রত্যেকটিতেই বাঙালিদের নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলার আদি মানব জীবনের শ্রম ও সংগ্রামের ইতিকথা এর মাঝে 
প্রতিফলিত। 

বাংলার সমর কৌশল নীতিকে যদি বিশ্লেষণ করা হয় বা সামরিক ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায় প্রাচীন গোষ্ঠীর মধ্যে যথেষ্ট নিয়ম এবং পদ্ধতিগত মান্যতা ছিল। কৌশলে পদাতিক সৈন্যদের আত্মরক্ষা, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ এবং পরাজিত সৈন্যদের বন্দির জন্য সামরিক বিভিন্ন রীতি অনুসরণ করতো। সামন্তযুগের সেই কৌশলগুলোর চিহ্ন রয়েছে ভোক্কা এবং হাডুডু খেলার মাঝে। বাঙালিরা যে চিরদিনই সাহস ও বীরত্বে অপরাজিত তারও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অস্তিত্ব আছে লোকক্রীড়ায়। 

যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য’র ৫২ হাজার বীর সৈন্যের কথা জানা যায়। তাদের ‘ঢালী’ সৈন্য বলা হতো। তাদের-ই অনুকরণে উদ্ভব হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঢালী খেলা। বাঙালিদের  বীরত্বভাব যেমন এর মাঝে স্থান পেয়েছে তেমনি রয়েছে নিম্ন শ্রেণির মানুষের অত্যাচার-নিপীড়নের চিত্র।

ওপেনটি বায়োস্কোপ ক্রীড়াটিতে ছড়া কাটতে কাটতে খেলার এক পর্যায়ে ‘সুলতানা বিবিয়ানা, সাহেব বাবুর বৈঠকখানা’ চরণ দুটির ধ্বনি শোনা যায়। মূলত এই ‘বৈঠকখানা’ শব্দটির অন্তরালে ইংরেজ আমলের গ্রাম্য অনেক নারীদের তৎকালীন অবরুদ্ধ জীবনের স্মৃতি কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সাহেব বাবু নানান লোভে তরুণীদের বৈঠখানায় আসার তাগিদ দেয়। কিন্তু একবার সেখানে গেলে তাদের ঘরে ফিরতে দেওয়া হতো না। এরকম নানান অসঙ্গতির সম্মুখীন হয়ে গ্রাম হতে শহরের পতিতালয় যেতে বাধ্য করেছে তাদের। 

এর পিছনে ছিল ক্ষমতা আর আধিপত্যের চাপ। মানুষকে আদিম কালের বিভিন্ন দ্বন্দ্বের পথ অতিক্রম করে, নানান টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের জীবনে আসতে সুদীর্ঘ সময় লেগেছে। এসব বঞ্চনা আর ভোগের স্মৃতি স্বাক্ষরের অস্তিত্ব হয়তো এখন আর নেই। কিন্তু লোকক্রীড়ায় এর ইতিহাস এখনো প্রথিত।

বাংলাদেশে লোকক্রীড়া চর্চা অনেকটাই সংকুচিত। বিদেশি খেলার প্রতাপে এগুলোর ধীরে ধীরে পতন হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এসব খেলার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে না। অভিভাবকেরাও তাদের সন্তানদের খেলাগুলোর পদ্ধতি শেখানোর প্রতি তেমন তাগিদ দেন না। এর অন্যতম কারণ জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড কিংবা ফুটবল বোর্ডের মত কখনো কোনো ক্লাব বা সংঘ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পায় না। কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে এগুলোর প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টও অনুষ্ঠিত হয় না। 

‘বাংলা একাডেমী’ কর্তৃক লোকক্রীড়া বিষয়ক কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশ আর মাঝেমধ্যে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী’ থেকে লাঠিখেলার আয়োজন ছাড়া তেমন প্রদর্শনীর দেখা মেলে না। 

ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ মানুষের শারীরিক চাহিদা ও মানসিক প্রশান্তির জন্য অনুভূত হয়। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দেশের বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীদের প্রিয় খেলাগুলো হয়েছে এখন হাতের মুঠোয়। এন্ড্রয়েড ফোন আর কম্পিউটারের খেলার উপরেই বেশি ঝুঁকছে তারা। এতে করে তাদের মানসিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু খেলার মাধ্যমে যে শারীরিক চাহিদা মেটানো যায় তা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। কেননা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত খেলাগুলোয় কোনো রকম কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়ে না। অপরদিকে নান্দনিকতায় ভরপুর লোকক্রীড়ায় দেহ ও মন উভয় প্রকারের আকাঙ্ক্ষাই মেটানো সম্ভব। অথচ উপর্যুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে খেলাগুলোর অস্তিত্ব দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। 

পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ার আগেই সঠিক সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। লোকখেলাগুলোর যথাযথ সংগ্রহ ও লিখিত রুপ প্রদান করতে হবে। সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গের এ বিষয়ে আরো বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। একটি দেশের পরিচয় এবং সম্পদ তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগুলো। ঠিক লোকক্রীড়াও বাঙালি সমাজের একটি স্বকীয় বৈচিত্র্যময় উপাদান।

পিডিএসও/অপূর্ব