মনকে প্রশান্তি দিতে চিত্রা রিসোর্টের জুড়ি নেই

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:২৭ | আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:৩১

এস আর শানু খান, সংবাদকর্মী

ঘুম থেকে তখনও উঠিনি। ইদানিং ফজরের নামাজের পর আবারও ঘুমোনোর অভ্যাস তৈরি হয়েছে আমার। মনিরুল কাকার ফোন। রিসিভ করতেই বলে, কোন এক জায়গায় যেতে হবে প্রস্তুত হও সময় কম। আমি বিছানা ছেড়েই ক্যামেরার ব্যাটারিটা চার্জে লাগালাম। মায়ের কাছে গিয়ে বললাম। মা বললো যেতে। 

গোসল সেরে রাস্তায় যেতেই হাজির হলো মনিরুল কাকা ও আর দুজন বন্ধু। ডাক্তার মিল্টন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাকরি করা বরুণ দাদা এক মোটরসাইকেলে। আর আমি উঠলাম মনিরুল কাকার মোটরসাইকেলে। 

রওনা হলাম। বেচারীরা তিনজনই চাকরিজীবী। দুইজন সরকারি আর মনিরুল কাকা ভালো একটা ওষুধ কোম্পানীর রি-প্রেজেন্টেটিভ। প্রতিদিনের একই রুটিন একই কর্মকাণ্ড করতে করতে যে একঘেয়েমিটা তৈরি হয়েছে সেটা কাটাতেই একটু বিনোদনের সন্ধানে ঘুরতে বের হয়েছে মানুষগুলো। উদ্দেশ্য নড়াইলের কয়েকটি লোকেশন। 

দুই মোটরসাইকেলে চারজন। রং বেরংয়ের হাসি, ঠাট্টা আর কথার ফুলঝড়িতে কেমন যেন মনে হলো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নড়াইল গিয়ে পৌছালাম। নড়াইলের ফেরি ঘাটের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নবনির্মিত চিত্রা ব্রিজ। ব্রিজের সৌন্দর্য মুগ্ধ করলো সবাইকে। খুবই সুক্ষ ও উন্নত মননশীলতার পরিচয় মিশে রয়েছে এই ব্রিজটির সাথে। 

ব্রিজ ডিঙিয়ে ওই পাড়ে পৌছাতেই মনিরুল কাকা বললো, বাম দিকে একটা সুন্দর জায়গা আছে সেটা দেখতে যেতে হবে। ব্রিজ পার হয়েই বাম পাশে একটা ফলক চোখে পড়লো ‘চিত্রা রিসোর্ট’। 

মেইন রাস্তা থেকে নেমে একটা ছোট সরু অদ্ভুত প্রশান্তি মিশ্রিত পরিবেশ। কিলো খানেক রাস্তা। রাস্তার চারপাশে বাগানের ভেতর দিয়ে ফাঁকা ফাঁকা বাড়ি-ঘর-দুয়ার। রাস্তাটির মোড়ে মোড়ে নেমপ্লেট লাগিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে চিত্রা রিসোর্ট ডানে, বামে, সোজা। চিনতে সমস্যা হলো না। 

গিয়ে পৌঁছালাম চিত্রা রিসোর্টের প্রবেশদ্বারে। আশে পাশে শুধু বাঁশ বাগান আর বাঁশ বাগান। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৩০ টাকা। টিকিট নিয়ে ঢুকে পড়লাম সবাই। ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো চিত্রা নদী। চিত্রা নদীর পাড় দিয়েই তৈরি হয়েছে এই চিত্রা রিসোর্ট। 

বিস্তৃত এরিয়া। ঢুকে ডানে বড় একটা বিল্ডিং। তাতে লেখা রয়েছে চিত্রা কটেজ। অসাধারণ সব কারুকার্জে সুসজ্জিত এই কটেজ। রয়েছে এসি সুবিধাও। কটেজের সামনে দিয়ে রয়েছে সুন্দর সুন্দর নানান ফুলের গাছ। যেগাছে শুধু ভোমরের আনাগোনা চলছিলো। 

কটেজের সামনে থেকে শুরু হলো ফটোশুট। বিভিন্ন রং ঢং এর ছবি। কটেজের সামনে একটা সাইনবোর্ড সেখানে লেখা রয়েছে কটেজের বিভিন্ন শিফটের রকমারি ভাড়া। ওখানে রাত যাপনও করতে পারেন আপনি। কটেজের সামনে রয়েছে দোলনা। যেখানে বসে আপনি মনের সুখে চিত্রা নদী নিসৃত নির্মল বাতাসের তালে দোল খেতে পারেন। 

মনিরুল কাকা ওটায় বসে ছবি তুললেন। নদীর একদম কূল ঘেষেই অসংখ্য বেঞ্চ বানানো। সিঁড়ি বেয়ে খানিকটা নিচে নামতেই চোখে পড়লো কয়েক জুটি প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম নিবেদনের চিত্র। চিত্রার পাড়ে প্রেম নিবেদনের এমন চিত্র সত্যিই অন্তর ছুঁয়ে যাওয়ার মতন। অনেক সুন্দর সুন্দর গাছ। গাছের পূর্বপাশে উচু দেয়াল। সেই দেওয়ালে খচিত রয়েছে নড়াইলের সব বরেণ্য মানুষের ছবি। 

প্রথমেই চোখে পড়লো চারণকবি, বিখ্যাত বাউল শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার কবিয়াল বিজয় সরকারের ছবি। একুশে পদকপ্রাপ্ত এ বিখ্যাত মনীষীর জন্ম নড়াইলের ডুমদায় ১৯০৩ সালে। তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন ১৯৮৫ সালে। চোখে পড়লো নড়াইলের ইটনায় জন্মগ্রহণ করা বিখ্যাত বাংলা উপন্যাসিক ও ফিকশন লেখক যিনি কিনা গোয়েন্দা চরিত্র কৃতি রায়ের রচয়িতা নিহাররঞ্জন গুপ্ত। 

আরো দেখলাম চারণ কবি, বিখ্যাত জারিশিল্পী, অভিনেতা, গীতিকার সুরকার, ফারুক আহম্মেদ গোল্ড মেডেল ও এস এম সুলতান পদপ্রাপ্ত জারী সম্রাট মোসলেম উদ্দিনের ছবি। যিনি নড়াইলের তারাপুরে ১৯০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যু ১৯৯০ সাল। 

ডান দিকে চোখে পড়লো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যার অবদান অসামান্য বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ছবি। ১৯৩৬ সালে নড়াইলের মহেশখোলায় জন্ম নেওয়া এই মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহীদ হন। এরপর চোখে পড়লো বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ছবি। শিল্পী এস এম সুলতান জন্ম ১০ আগষ্ট ১৯২৪। মৃত্যু ১০ অক্টোবর ১৯৯৪।

নদীতে ঘোরার জন্য রয়েছে বড় ট্রলারের ব্যবস্থা। খানিকটা ভিতরে বড় পিলারের উপর রয়েছে গোলচত্বর। ওখানে দাঁড়িয়ে সুন্দরভাবে চিত্রাকে দেখা যায়। 

রিসোর্টের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে বড় বড় সাউন্ডবক্স। রয়েছে একটা কন্ট্রোল রুম। সেখান থেকে রোমান্টিক সব গান বাজাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এক অন্যরকম বিনোদন দিচ্ছিলো সেটা। রয়েছে পুলিং রুমও। পুল খেলার বোর্ড রয়েছে সেখানে। পুলিং রুমের সামনেই রয়েছে বড় করে বানানো দাবার কোট। বড়ো সড়ো সব দাবার গুটি। এগুলো সব দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।

চাইলেই আপনি খেলতে পারেন। আমরা সবাই দেখলাম। দাবার কোটের পশ্চিমেই রয়েছে একটা ছোট ছনের চালাঘর। সেখানে রয়েছে রং বেরংয়ের সব পাখির আসর। রিসোর্টের একদম দক্ষিণে রয়েছে বড় মাপের একটা ক্যান্টিন। ফাস্টফুড থেকে শুরু করে চা, কফিসহ বিভিন্ন রিচ ফুডও। ক্যান্টিনের চারপাশ ঘিরে চক্রাকারে ঘুরবার জন্য রয়েছে ট্রেনের ব্যবস্থা। চাইলেই আপনি ট্রেনে উঠতে পারেন। 

রিসোর্টের একদম মেইন পয়েন্টে রয়েছে চিত্রা রিসোর্ট সেলিব্রেশন পয়েন্ট। যেখানে ৩০-৩৫ জন বৃত্তাকারে বসে উদযাপন করতে পারেন জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী কিংবা এমন সব গুরুত্বপূর্ণ পার্টি। 
 
কন্ট্রোল রুমের সামনে রয়েছে লাল টকটকে জামরুল গাছ। ১২ মাসি জামরুল। আমরা চারজনে ঘুরলাম, ক্যান্টিনে খেলাম, ছবি তুললাম মনের তৃপ্তি মিটিয়ে। একটু কথা বলার জন্য আমি খুজছিলাম রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাউকে। পেয়ে গেলাম গেটে এসে। 

২০০৩ সালে ব্যক্তি মালিকানাধীনভাবে গড়া হয়েছে এই রিসোর্ট। মানুষের আগ্রহ ও ভাললাগা ভালবাসা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে কর্তৃপক্ষকে। তাইতো ধীরে ধীরে রিসোর্টকে আরও বেশি সমৃদ্ধ ও সম্প্রসারিত করার নানা উদ্যোগ নিয়েছে এবং এখনও নিচ্ছে। সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ৬ টা পযর্ন্ত আপনি থাকতে পারেন চিত্রা রিসোর্টের আঙিনায়। ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা সুযোগ পেলেই চলে আসতে পারেন এই চিত্রা রিসোর্টে। প্রকৃতির নানা সৌন্দর্য্য অবলোকনের মাধ্যমে মনকে প্রশান্তি দিতে চিত্রা রিসোর্টের জুড়ি নেই।
 
পিডিএসও/এআই