একটি অবহেলিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গল্প

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:২৯

এস আর শানু খান, লেখক

গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নিজের গ্রাম রেখে দুরের একটা প্রাইমারি স্কুলে যায়। সেই সকালে তিন চার কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে হেঁটে স্কুলে যায় আবার শেষ বিকেলে হাটু পযর্ন্ত ধুলাবালি লাগিয়ে অনেকটা ঝিমুতে ঝিমুতে বাড়ি ফেরে। সন্তানের কষ্ট বুঝতে পারেন না এমন বাবা-মা আছেন বললে বড্ড ভূল বলা হবে। কেননা সন্তানের কষ্ট আল্লাহর পরে বাবা মা বুঝতে পারেন। কিন্তু বুঝেও বা কি লাভ। সব সময় সব কিছু বুঝেও কাজে আসে না। বুঝেও অবুঝ সেজে বসে থাকতে হয় নিরবে নিবিঘ্নে। কাছাকাছি কোথাও প্রাইমারি স্কুল নাই। আর তাইতো দায়ে পড়ে সব কিছু বুঝেও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দুরের স্কুলে পাঠাতে হতো বাবা মা’দের। সচেতন ব্যক্তি ও শিক্ষানুরাগী জয় সরকার জয় তার তীক্ষ্ণ অন্তদৃষ্টি দিয়ে ছেলে মেয়েদের এমন কষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাইতো নিজেকে থামিয়ে রাখতে না পেরে গ্রামের কিছু সচেতন ব্যক্তিদের ডেকে একটা আলোচনা করেন। গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রাখেন। জয় সরকারের এমন মহানুভব উদ্যোগে সন্তুষ্টি জ্ঞাপন পূর্বক জয় সরকারের ভাই বাসুদেব সরকার দারোগ একাগ্রতা ঘোষণা করেন। এগিয়ে আসেন আপনাআপনি। গ্রামের সকল মানুষ জয় সরকারের প্রস্তাবে উৎফুল্ল হয়ে তার প্রশংসায় মত্ব হয়ে উঠেন। ব্যাপক সাড়া পড়ে জয় সরকারের উদ্যোগে। আলোচনায় এটা নির্ধারণ হয়ে যে আসলেই গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল থাকাটা খুব জরুরি। তখন প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় স্কুল নির্মাণ করতে হবে ঠিক আছে কিন্তু স্কুল নির্মাণের জন্য কিছু জায়গা প্রয়োজন। সুহৃদয়বান, সচেতন, শিক্ষানুরাগী ও শিশু প্রেমী মানুষেরা যাদের মনে শুধু সমাজ নিয়ে ভাবনা। অদূর ভবিষ্যাতে সমাজের কি হবে সেটা নিয়ে মাথা ঘামান, একটা শিক্ষিত সমাজের স্বপ্ন দেখেন। প্রকৃত অর্থে সমাজের মহানুভব ব্যক্তিরা কখনও তাদের ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখেন না বা দেখতে পারেন না। তারই এক বাস্তব প্রমাণ জনাব রুহল আমীন মুন্সী। স্কুল নির্মাণের জায়গার জন্য বৈঠকে মানুষ যখন হন্ন হয়ে মাথা খাটাচ্ছিলেন তখন কিছু না ভেবেই সহৃদয়বান ব্যক্তি রুহল আমীন মুন্সী নিজের জায়গা দিয়ে দেন। শিক্ষার জন্য, সমাজের কল্যাণের জন্য বিশেষ করে যারা শিশুদের ভালোবাসেন, শিশুদের নিয়ে ভাবেন, শিশুদের পথচলাকে সহজ করতে কাজ করে যান তাদের কে কেন জানি মহামানব মনে হয় আমার। তাদের হৃদয়ের কোমলমতী মমতা, হৃদয়ের প্রশস্ততা মনে শান্তি বয়ে আনে। অবশেষে রুহল আমীন মুন্সীর দেওয়া জায়গার উপর বাঁশ খুঁটি গেড়ে নির্মাণ করা হয় একটু স্কুল।

সময়টা ছিল ১৯৯৯ সাল। মাগুরা জেলার শালিখা থানাধীন গংগারামপুরে প্রতিষ্ঠিত হলো ”গংগারামপুর দক্ষিণপাড়া প্রাইমারি স্কুল”। জয় সরকারের স্ত্রী সহ আর দুইজনকে দিয়ে স্কুলের পাঠ দান কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্যোক্তাদের দেয়া সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে পরিচালিত হতে থাকে স্কুলের কার্যক্রম। স্কুলের সাথে যুক্ত প্রতিটি মানুষই ছিলেন এক এক জন নিখাঁট স্বেচ্ছাসেবক। কেননা একটা নয় দুইটা নয় দীর্ঘ ১৪টা বছর নিজেদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরবিচ্ছিন্ন চেষ্টার ফল স্বরুপ স্কুলটিকে সরকারিকরণ করতে সরকারি স্কুলগুলোর তালিকায় আনতে সমর্থ হন।

২০১৩ সালে গঙ্গারামপুর দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে সরকারিকরণ করা হয়। স্কুলের সূচনা লগ্নে মাত্র ৬ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও আস্তে আস্তে সেটার পরিমাণ এসে দাড়ায় ২০০জনে। নাড়ির টানেই হোক আর মাটির টানেই হোক কেন জানি নিজের অজান্তেই মাঝে মাঝে এমন এমন কিছু স্থানে গিয়ে হাজির হয়। নিজের চোখে দেখি নিজের অতীতকে। খুঁজে পাই জীবনের আসল অর্থ, ফিরে পেতে ইচ্ছে হয় জীবনের হারানো শৈশব কে। আমি নিজে পড়িনি এই স্কুলে কিন্তু যেদিন এই স্কুলটা দেখতে গিয়েছিলাম। স্কুলের মাঠে ছেলে মেয়েদের দুরুন্তপনা দেখে, আনন্দ উৎফুল্লতা দেখে কেন জানি মনে হচিছল আমিও পড়েছি এই স্কুলে। কবি যথার্থই বলেছিলেন, ”বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর/সবার আমি ছাত্র”।

সেদিন সকাল সাড়ে নয়টার দিকে গিয়ে হাজির হলাম স্কুলে। তখনও সকল ছেলে মেয়েরা এসে পৌঁছায়নি। দশটার আগেই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা এসে পড়লেন।পতাকা উত্তোলন করা হলো। ফাল্গুনে বাতাসে পতপত করে উড়তে শুরু করলো জাতীয় পতাকা। ঘণ্টার আওয়াজে স্কুলের সকল ছেলে মেয়েরা জড়ো হলো। সমোবেত হলো স্কুলের সামনের খোলা মাঠে। পিটি প্যারেড শেষ করে শপথ, তারপর সমবেত কন্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়া হলো। জাতীয় সংগীত শেষে যার যার শ্রেণি কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো। একটা মাত্র টিনের ঘর। জং ধরা মরিচিকা পড়া টিনের চাল। ভাঙ্গাচোরা কয়টুকরা টিনের বেড়ার মাত্র তিনটা রুম। ব্যবহারের অযোগ্য কিছু বেঞ্চ। স্কুলের প্রতিটি জিনিস আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য কোনও টয়লেট নেই। টয়লেট নেইই স্কুলের শিক্ষকদের জন্যও। শিক্ষকদের বসবার জন্য লাইব্রেরিটা খুব অভিনব কায়দার। টেবিল বাদে কিছু ভাঙ্গাচোরা চেয়ার পেতে বসে থাকেন স্কুলের মাঠে খোলা জায়গায়। গাছ-পালা হীন ফাঁকা জায়গায় একটা টিনের ঘরের ভিতর কতটা গরম ও শান্তি অনুভব হতে পারে সেটা তারাই জানেন যারা ওখানে থাকেন। ২০১৩ সালে সরকারি হলেও স্কুলের কোনও পরিবর্তন আসেনি। কর্তৃপক্ষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেও লাভের হিসাবটা শুণ্যে এসে ঠেকেছে বার বার।

জীবন নামের কঠিন অধ্যায়ের সূচনাটা ঘটে প্রাইমারি স্কুল দিয়ে। একটা মানুষ লেখাপড়া শিখে যত বড়ই হোক না কেন। হোক সে দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্টপতি।নিঃসন্দেহে তার জীবনে প্রাইমারি স্কুলের অবদানের শেষ নাই। একটা মানুষের জীবনের ভিতটা তৈরি হয় প্রাইমারি থেকে। এই দুনিয়ায় মায়ের কোলই হলো শিশুর জন্য সব থেকে নিরাপদ আশ্রয়। আর মায়ের কোলের পর এই পৃথিবীতে যদি কোনও নিরাপদ আশ্রয় থাকে সেটা হলো একটা প্রাইমারি স্কুল। একজন ছাত্রের বাবা-মা হলেন তার শিক্ষক। এবং প্রাইমারি স্কুল থেকে ঠিক বাবা মায়ের আদর স্নেহের মতো যত্ন পেয়েই বড় হতে থাকে একটা শিশু। প্রতিটি বাবা মায়ের চোখে সন্তানের দ্বিতীয় নিরাপদ আশ্রয় হল তার প্রাইমারি স্কুল। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই প্রাইমারি স্কুলও কি সব সময় নিরাপদ কিনা সেটা কি বাবা মা বুঝতে পারেন। ঠিক এমনই একটা প্রশ্নের সম্মুখ হতে হচ্ছে গংগারামপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়ুয়া সকল ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা মার। যুগের পর যুগ যে প্রাইমারি স্কুলটা সাফল্যের সাথে অবিরাম ধারায় তৈরি করে চলছেন শত শত মেধাবী মুখ। জ্ঞানের আলোয় বিকশিত করছেন শত শত ছাত্রের ঘুমিয়ে থাকা সুপ্ত জ্ঞানকে। সেই স্কুলগুলোই যখন চরম অবহেলার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখন আর বলার ভাষা থাকে না। জাতিগত দিক থেকে আমাদের একটা বড় ব্যাধি রয়েছে যে আমরা সব সময় ভাল জিনিস খুঁজি, বাজার করতে গেলে বাজারের সব থেকে উত্তম জিনিসটা কিনতে ভালবাসি। কিন্তু সমস্যা হল একটা বারের জন্যও চিন্তা করিনা যে একটা ভালো জিনিস পেতে হলে প্রথমে সেই ভালো জিনিসটা তৈরির জায়গাটা ভাল করা উচিত। সপ্তাহখানেক সময় করে আমাদের পাশের জেলা নড়াইল এর দশটার মত প্রাইমারি স্কুল নিয়ে খোঁজ খবর নিলাম। বৈশাখী সরকারি প্রাইমারি স্কুল, নড়াইল সদর, নড়াইল। স্কুলটি দুইতলা বিশিষ্ট একটা ভবন। স্কুলটিতে ছেলে মেয়েদের জন্য চারটা টয়লেট। স্কুলের সামনের খোলা মাঠ ভর্তি ছেলে মেয়েদের খেলাধুলা করবার জন্য আনন্দ বিনোদন করবার জন্য নানান উপকরণের ব্যবস্থা। ঠিক একইভাবে জেলার অন্যসব স্কুলগুলোও একই বৈশিষ্ঠ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দারুণ নৈপূণ্যতার মধ্যে দিয়ে ছেলে মেয়েরা আনন্দ উল্লাস করে পাঠ গ্রহণ করে থাকে। বৈখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নড়াইল সদর, নড়াইল। সিঙ্গিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নড়াইল সদর, নড়াইল। হবখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাজারখালী, নড়াইল সদর, নড়াইল। কাগজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নড়াইল সদর, নড়াইল। ডুমুরতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নড়াইল সদর, নড়াইল।

এছাড়া নড়াইলের আরও কয়েকটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছু সময় কাটালাম। প্রতিটি স্কুলে ঢুকবার পরে স্কুলের সৌন্দর্য ও খেলাধুলা বিনোদন সামগ্রী দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। ছেলে মেয়েদের হাসি আনন্দ আর ফূর্তিবাজি হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছিল বার বার। মনের কোথায় যেন আনন্দ নামের এক মহা সাগরের ঢেউ খাচ্ছিল।

অথচ আমাদের জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কতনা দুর্দশার শিকার। মনোখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শালিখা, মাগুরা। কাটিগ্রাম গঙ্গারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শালিখা, মাগুরা। পুলুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শালিখা, মাগুরা। বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা দেশের আধুনিকতা বিবেচনায় মোটেও মানসম্মত স্তরে পেীঁছাতে পারে নাই। একটা স্কুলেও দেখলাম না ছেলে মেয়েদের বিনোদন সামগ্রীর উপস্তিতি। তারপরও এই স্কুল গুলোর পরিবেশ মোটামুটি ভাবে হলেও কিছুটা পাঠদান ও পাঠ গ্রহন উপযোগী। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় হলো গঙ্গারামপুর দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা কতটা শোচনীয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।সারা দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে অনেক আগেই। তাছাড়া সারা দেশে শিক্ষার মিছিল চলছে তো চলছেই। জাতিকে শিক্ষিত করে তুলবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে আমাদের উপরি সমাজ। কিন্তু যে স্কুলটা দীর্ঘ ১৮টা বছর নিজেকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে মত্ত রেখেছেন সে স্কুলের কোনও পরিবর্তন মিলছে না।এটাকে কি হিসাবে ধরা যেতে পারে। সরকারের ব্যর্থতা নাকি সরকারের চোখকে ফাঁকি দিয়ে উপরি কর্মকর্তাদের অবহেলা ও জালজুয়াচুরির বলিদান এই গংগারামপুর দক্ষিণপাড়া প্রাইমারি স্কুল। তাই যথাযথ কতৃপক্ষের নিকট আকুল আবেদন আপনারা আর যাই করেন অন্তত মানুষ গড়ার কারখানা গুলোকে বেহাল দশা থেকে মুক্ত করুন। শিশুদের প্রাপ্তি নিশ্চিত করুন। শিশুদের আনন্দ বিনোদনের মধ্যে থেকে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ দিন।

পিডিএসও/রিহাব