রক্তস্নাতে অপবিত্র সড়ক

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:৪৭ | আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:০৭

সাজ্জাদ হোসেন, লেখক

২৯ জুলাই ঘটে যাওয়া দুজন স্কুল ছাত্রছাত্রীর সড়ক দুর্ঘটনায় পথে নেমেছিল এ দেশের তরুণত্ব। সাথে ছিল মুখরিত স্লোগান, প্ল্যাকার্ড আর সাথে ছিল দৃষ্টি গোচরীভূত একরাশ আশার উজ্জীবিত দাবিদাওয়া। অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রীত্বের পক্ষ থেকে যে আইনগুলোর কল্প পাশ হয়, সেটাকেও অযথার্থতা বলার কোনও সম্ভাব্যতা নেই। তাহলে কেন প্রতিনিয়ত বন্ধ হচ্ছে না মানুষখেকো যানগুলোর শ্বাসঘাত? কেনই বা শুষ্ক হয় না সড়কে লেগে থাকা রক্তিম বন্যা? দুর্ঘটনার হেডলাইনগুলোর মাধ্যমে দৈনন্দিন খবরের কাগজগুলোর যেন এটিকে ঘিরেই সুসজ্জিত হচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক চাই নামে একটি সংগঠনের তথ্যানুসারে ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে  ৫ হাজার ৬৪৫ জনের। সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৬ সালের চেয়ে দেড় হাজার মৃত্যু বেড়েছে ২০১৭  সালে। এ বছরেও যেন এর ছুট বাড়ছে লাগামহীন। যতো দোষ নন্দঘোষ বলে যে মার্জিত কথাটি, পুরোটার বাস চালকগুলোর ক্ষেত্রে একটুও কমতি পড়ে না। কারণ বাসটা যখন ঝুঁকিহীনভাবে আস্তে আস্তে চালানোর প্রয়াস চালায়। ঠিক তখন তার মতো আর খারাপ ড্রাইভার নেই। তখন বাঙালির টনক নড়ে, গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হচ্ছে। গুটিকয়েকের মুখ থেকে যে শ্রাব্য ভাষাগুলো বের করে, তারা হয়তো ভুলেই যায় আশপাশ মহিলা সিটও আছে। আবার যখন সময়ের নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রুত পরিচালনার প্রচেষ্টা করে, তখন ও শালা বর্বর, অসভ্য, অর্বাচীন।

কিন্তু কপালের দোষে হোক কিংবা অসতর্কতাবশত হোক সড়ক দুর্ঘটনায় যে চালকদেরও দোষ আছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, এর বাইরেও যে একরাশ সমস্যা বিদ্যমান সে বিষয়গুলোও একটু খতিয়ে দেখা যাকঃ

আমরা যদি গভীরভাবে নজরদার করি বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুবীজ বপণ হয় মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে। এক বাস আরেক বাসে, ট্রাকের সাথে ট্রাক; কখনোবা এক বাস অন্য ট্রাকের সঙ্গে সামনাসামনি তীব্র ধাক্কায় সৃষ্টি হয় মৃতের ঢল। প্রতিনিয়ত কেন হচ্ছে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা? শুধুই কি চালকের অসতর্কতাবশতার কারণে? প্রত্যেকদিন হাজার হাজার মানুষ পাড়ি দিচ্ছে ঢাকার বুকে। জমছে বহুল বেকার জনতার ভীড়, বাড়ছে শ্রমিকের পদতলসহ, অজস্র সম্মানিত চাকরিজীবীরা। এসব মানুষদের চাহিদা পূরণে একমাত্র যান হচ্ছে  বাস। শুধু ঢাকায় না পুরো বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষই ভিন্ন বড় বড় শহর যাওয়ার অদ্বিতীয় বাহন হচ্ছে বাস। কিন্তু সেসব যাত্রীদের যখন আকাঙ্ক্ষা মেটাতে তৈরি হচ্ছে অজস্র যানবাহন, উদ্ভব হয় ট্রাফিক জ্যামের। সময় আর অর্থাভাব মেটাতে যখন সৃষ্টি হয় দ্রুতবেগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, মৃত্যুকুপ তো বিরাজমান হয় তখনি। কারণ গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও, বাড়তে থাকে না রাস্তার সংকীর্ণতা। অথচ সড়ক তৈরির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি কিলোমিটার বাবদ খরচ কতোটুকু? তা পরিসংখ্যানের দিকে স্থির দৃষ্টি ফেললেই দেখা যাবেঃ

বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় বলা হয়, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়কে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ২৫ লাখ ডলার। ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনেও একই ব্যয় হয়েছে। রংপুর-হাটিরুমরুল চার লেনে ৬৬ লাখ ডলার, ঢাকা-সিলেট চার লেনে ৭০ লাখ ডলার এবং ঢাকা-মাওয়া চার লেনে কিলোমিটার প্রতি এক কোটি ১৯ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে চার লেনের এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরিতে (জমি অধিগ্রহণসহ) খরচ হয় ১১ লাখ থেকে ১৩ লাখ ডলার এবং চীনে ১৩ লাখ থেকে ১৬ লাখ ডলার। ইউরোপের দেশগুলোতে খরচ হয় ৩৫ লাখ ডলার। ইউরোপে দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ২৫ লাখ ডলার। বাংলাদেশ সরকার অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি যখন, বিশ্ব পরিচালনাকারী দেশগুলোর চেয়ে উপরন্তু ব্যয়ের যোগান দিচ্ছে  এ দেশের সড়ক নির্মাণের জন্য, তাহলে এতো অর্থ কোথায় যাচ্ছে? সে প্রশ্ন না হয় বুদ্ধিজীবী মহলের কাছেই থাক!

আবার গাড়ির ফিটনেসের জন্যও যে নিহতের অভিগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটি সাম্প্রতিক রংপুরে বিআরটিসির সাথে রুবি পরিবহণের সংঘর্ষের চিত্রের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। গাড়ি থাকলে থাকে না ফিটনেস, ফিটনেস থাকলেও সিট বেল্ট থাকার কল্পনা করাটা অনেকটা 'ব্যাঙের সর্দির' মতই।

এখন আসি একটু দক্ষতার প্রসঙ্গে। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোতে একটু আড়চোখ ফেললেই দেখা যাবে কমবয়সী গাড়ি চালকদের। সেটা প্রশাসনের গাফিলতি নাকি আমার মত সাধারণ জনগণের সেটাও দেখবার বিষয়! নামেমাত্র লাইসেন্সধারী বিপুল চালকেরা যখন মাত্রার অতিরিক্ত যাত্রী কিংবা মালামাল নিয়ে, নিদৃষ্ট গতিসীমার বাইরে গাড়িকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, জান নিয়ে টানাটানির আরম্ভ কালটাও তখনি। পাশাপাশি সঙ্কুচিত রাস্তায় এক গাড়ি অন্য গাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে ওভারটেকের মাধ্যমে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করার মত ভুল প্রচেষ্টারত থাকে অনেকেই।

এছাড়াও অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, এতো অসংখ্য পরিমাণ যানবাহন চলাচলে ট্রাফিক সিস্টেমের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অভাব, অবৈধ হাটবাজার, পর্যাপ্ত রোড ডিভাইডার না থাকা, অনুরুপভাবে, অপ্রশস্ত সড়কে দিনদিন উত্থান জমে প্রচুর নসিমন, করিমনের মত অবৈধ বাহনগুলোও। এমনকি জনসাধারণের অসতর্কতা সাথে রাস্তা পারাপারেও জন্ম নেয় মরণ ফাঁদ।

উপরিউক্ত সমস্যাগুলোর প্রতিকাররুপে, প্রশাসনের দূরদৃষ্টি বাড়াতে হবে কঠোর পরিমাণে। শুধুমাত্র লিগ্যাল লাইসেন্সকরণেই ক্ষান্ত হলে চলবে না, সাথে বাড়াতে হবে ক্যাম্পেইন। গড়ে তুলতে হবে বহুল জনসচেতনতা। পাশাপাশি বন্ধ করতে হবে সকল ফিটনেসহীন গাড়িগুলো। নিয়োগ দিতে হবে অভিজ্ঞ চালকদেরকেও। সব অবস্থানেই ওভারটেক করার চিন্তা-চেতনা ঝেড়ে ফেলতে হবে। পক্ষান্তরে, সুদীর্ঘ পরিকল্পনা হলেও, বাংলাদেশের সব মূল সড়কগুলো ৪ লেন করা অতীব জরুরি।

বেঁচে থাকুক সকল তাজা প্রাণ। প্রাণবন্ত থাকুক সব পরিস্ফুট হাসিগুলো। দীর্ঘজীবী হোউক ভোরের আলো!

পিডিএসও/রিহাব