ঝড়ুর বাজারে একদিন

প্রকাশ | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৫:৩৭ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:০৫

এস আর শানু খান

এমন কিছু চেনা মুখ থাকে যে মুখগুলোর সাথে কোনও দিন কথাবার্তা না হলেও রোজ দেখা হওয়ার দরুণ কেমন যেন একটা এনটেন্স সম্পর্ক হয়ে যায় নিজের অজান্তেই। কয়েকদিন দেখা না হলেই মানুষের কাছে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু হয়। এই রকম এই সেই মানুষগুলোকে তো আর দেখা যায় না। কেন দেখা যায় না। কোথায় গেছে এরকম বিভিন্ন প্রশ্ন জাগে। এমনই এক ঘটনা। বাজারে গেলেই আড্ডা দেওয়ার একমাত্র জায়গা শান্তু কাকার দোকান নয়তো রোকন ভাইয়ের দোকান। রোকন ভাইয়ের দোকান থেকে পত্রিকা নিয়ে শান্তু কাকার দোকানে বসে পড়া আর কাকার সাথে ফাজলামী করা। রোকন ভাই নয়াদিগন্ত পত্রিকা রাখেন। বেশ কয়েকজন সহজ সরল লোক আসতো নদীর ওপার থেকে। ওরা বেশির ভাগই শান্তু কাকার দোকানে এসে পান, চা, সিগারেট খেতো। বেশির ভাগই ছিলো বারোই সম্প্রদায় আর গুটি কয়েকজন জেলে। শান্ত কাকা রসিক মানুষ। ওরা সবাই শান্ত কাকাকে দোস্ত বলতো। বড্ড মিশুক মানুষ শান্তু কাকা। তাইতো দুনিয়ার মানুষের সুখ দুঃখের গল্পের ভান্ডার তিনি। মানুষ মনের কথা বলেন তার কাছে। জেলে কয়েকজন মাছ নিয়ে আসতো শান্ত কাকার দোকানে। রোকন ভাই, শান্তু কাকা, গিরিলের দোকানদার ইমদাদ ভাই নানা ভাবে রহস্য করতো ওদের সাথে।

হঠাৎ সেদিন বাজারে শান্তু কাকার দোকানের সামনে বসে ঐ মানুষগুলোকে খুব মনে পড়ছিলো। বিষয়টা জানতে চাইলে শান্তু কাকা জানালেন যে ওরা এখন আর সেই আগের মত বাজারে আসে না। ওরা ওপারেই বাজার মেলাই নিছে। আমি অবাক হলাম। বলেন কি বাজার মেলাই নিছে? কবে থেকে? কোথায়? কাকা বললো তোদের খেয়াঘাটের উপরেই। মানে আমাদের খেয়াঘাটের উপরে। আমার বিস্ময় আরো বেড়ে গেলো। শান্তু কাকা আরও বললো ওখানে সব কিছু পাওয়া যায়। সকাল বিকাল মাছ উঠে, পানের হাট বসে, ঔষুধের দোকানসহ বিভিন্ন দোকান উঠেছে। বাজারের নাম দিছে ঝড়ুর বাজার।

আমার জানা মতে ওপারে কয়েকঘর বারোই, হাতে গোনা কয়েকঘর জেলে আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখান সেখান থেকে এসে কিছু মুসলমানেরা বাড়ি বানিয়েছে। দোকান প্রাসাদ কিছু ছিলো না। সেখানে বাজার হয়েছে। এটা যেমন কিউরিসিটির জন্ম দিচ্ছিলো তার থেকে বেশি কিউরিসিটি হচ্ছিল নাম নিয়ে কি মজার নাম ঝড়ুর বাজার।
সুযোগ হচ্ছিল না। সেদিন হঠাৎ করে আমার সহপাঠী নাজমুল আর ছোট ভাই রিয়াজকে নিয়ে ঝড়ৃর বাজার দেখার জন্য বের হলাম। মনোখালী খেয়াঘাটে গিয়ে পড়লাম অগ্নী পরীক্ষায়। খেয়া আছে মাঝি নাই। একজন কলেজ পড়ুয়া মেয়ে উঠে বসে আছে। আমাদের কেউই খেয়া চালাতে জানে না। আর মেয়েটি খেয়াই উঠে শুধু আমাদের দিকে তাকাচ্ছে আর হয়তো মনে মনে ভাবছে আমরা খেয়া চালিয়ে নিয়ে যাবো। মেয়েটা তাকাচ্ছে আমাদের দিকে আর ওরা দু’জন তাকাচ্ছে আমার দিকে। সাহস করে উঠে পড়লাম। খেয়ার হাল ধরলাম আমি। আর ওদের দুইজনকে বললাম তোরা সামনে থেকে আস্তে আস্তে ছোট বৈঠা মার। জীবনে কোনও দিন খেয়া চালিয়েছি কিনা মনে নেই তবে একদমই অনুভিজ্ঞ। তিন চার বার হাল হাত থেকে পড়ে গেল পানিতে। মেয়েটি হেঁসে একাকার। যাই হোক কষ্টে মষ্টে পৌঁছালাম। মেয়েটি খেয়া থেকে নেমে হেসে দিয়ে বললো আমি আপনাদের থেকে অনেক ভালো পারি । বলে চলে গেল। বোকা বানিয়ে গেল তিনজনকে। পার হয়ে সামান্য উপরে যেতেই বেশ কয়েকটা দোকান চোখে পড়লো। এগিয়ে গিয়ে দেখি বিরাট কাণ্ড। স্কুলে পড়াকালীন যখন বিভিন্ন ললনা, রুপসীদের দেখতে আসতাম তখন যে সব রাস্তায় হাঁটু অবদি কাদা হতো সেখানে পীচ হয়েছে। আর দোকান প্রাসাদের কোনও অস্তিত্ব যেখানে ছিলো না সেখানে প্রায় ২০-২৫টা দোকান। একটা বটগাছকে মধ্যে রেখে পীচের রাস্তার দুই পাশ দিয়ে দোকান উঠেছে। বাজারের বেশির ভাগ মানুষই পরিচিত। কেননা ঊনাদের বরজ সবই আমাদের ঐপারে ছিলো আগে। আমার গলায় ঝুলানো ক্যামেরা দেখে অপরিচিত জনেরা অনেকই ভাবছিলেন হয়তো আমি সাংবাদিক। একজন বাড়ি ও আব্বুর নাম জিজ্ঞেস করতেই আত্মীয় হয়ে গেল। চা বিস্কুট খাওয়ার জন্য জোড়ালো অনুরোধ রাখলেন। কোনোভাবে এড়িয়ে গেলাম। উনাকেই পুঁজি করলাম। নানা তথ্য নিলাম। যেটা আমার দরকার ছিলো। বাজারে রয়েছে দুইটা ফার্মেসি সেখানে সকল প্রকারের ঔষুধ পাওয়া যায়। একটাতে একজন ডাক্তারও বসেন। রয়েছে একটা মুরগীর দোকান। মুরগী বিক্রি হয়। চার-পাঁচটার মত চায়ের দোকান। কোনও কোনও চায়ের দোকানের সাথে রয়েছে আরও বিভিন্ন আইটেম। দোকান ছাড়াও বেশ কয়েকজনকে দেখলাম বিভিন্ন জিনিস নিয়ে দাড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। কেউ আশফল নিয়ে, কেউবা পুইশাক, একজনকে দেখলাম চাল কুমড়া নিয়ে বসে আছেন। দেখলাম হঠাৎ করে বাজারের দক্ষিণপাশে রাস্তার উপর বেশ কয়েকজন জড়ো হয়েছে। এগিয়ে গেলাম দেখি মাছের ভাগ দিচ্ছেন এক জেলে। বিশ টাকা করে ভাগ। মুহুর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। তার একটু দক্ষিণে রাস্তার পূর্ব পাশে তাকাতেই দেখি সেলুন। দুইজন নাপিত কাজ করছেন। এগিয়ে গিয়ে ছবি তুললাম। দেখি সেলুনে হাফিজার ভাই। হাফিজার ভাইর বাড়ি আগে আমাদের ওখানে ছিলো। হাফিজার ভাইর সাথে কিছু সময় কথা বললাম। হাফিজার ভাই কাছে জানতে চাইলাম বাজারের নাম ঝড়ুর বাজার হওয়ার যুক্তি কি? এই জায়গাটাকি ঝড়ুর? হাফিজার ভাই বললেন না। এখানে প্রথম চায়ের দোকান দিয়েছিলো ঝড়ু। সাত বছর ধরে এখানে একটা দোকানই ছিলো সেটা হল ঝড়ুর। তারপর এই এক বছর এই অবস্থা। তাইতো সেই ঝড়ুর নামই রয়ে গেছে। সেই ঝড়ুর দোকান কি আছে এ বাজারে এখন। না সেই আসল মানুষটাই নেই বললো হাফিজার ভাই। 

বাজার এতো দিনে অনেক উন্নত হয়ে যেত। অনেক দোকান হয়ে যেত অনেক আগে থেকেই। কিন্তু জায়গার অভাবে হচ্ছে না। দোকান দেওয়ার জন্য মানুষ জমির মালিকদের তেল মারতেছে দিনের ভিতর অনেকবার। কিন্তু এই বাজারের আশেপাশের সব জমির মালিক হিন্দুরা কেউই জায়গা দিতে চাচ্ছে। আবার বিক্রিও করতে রাজি নয়। হাফিজার ভাই চার অর্ডার দিয়েই বসলেন। কিন্তু আমি সেটা নিষেধ করলাম দোকানদারকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে চারপাশ থেকে। হাফিজার ভাইর সাথে কথা শেষ করে বিদায় নিলাম। ছবি তুললাম বাজারের। বিশ টাকার পেয়াজু কিনে নাজমুল আর রিয়াজকে দিলাম। বেচারিরা আমার পাগলামীর সাথী হয়েছে। কিছু না খাওয়ালে হয়। খেয়াঘাটে এসে আবার মাঝিশূণ্য খেয়া কপালে জুটলো। অন্ধকারে বেয়ে চেয়ে কায়ক্লেশে পার হলাম। এই পারে এসে ফ্রিজের থেকে একটা ঠান্ডা কিনে ওদের দিলাম। প্রচন্ড গরম আর আমার পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে হাফসায়ে গেছে ওরা দু’জন।  

পিডিএসও/রিহাব