মানিক দোহায় মানিকের টুপি ও লাঠি ভাসতে দেখা যায়

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৮, ১৫:২৭

এস আর শানু খান, লেখক

সেই ছোট্ট বেলায় আম্মুর আর নানীর সাথে যখন খালামণির বাসায় বেড়াতে যেতাম তখন নানীর মুখে শুনতাম মানিক দোহার কথা। হাত দিয়ে দেখাতে চলন্ত গাড়ি থেকে। কিছু না বুঝেই হা করে দেখতাম খানেকটা। শুধু পানি আর পানি। রাস্তার ঠিক পাশেই। খালামণির বাসায় যেতে ডান পাশে। ফিরতে বাম পাশে। নানীর মুখে শোনা ছোটবেলায় ছোট মামার নাকি বিরাট এক সমস্যা হয়েছিল। পাড়ার কোনও এক মহিলার কথা শুনে মানিক দোহায় দুই কেজি কলাই ফুট মেনে ছিলেন। আর মনে মনে বলেছিলেন সমস্যা সেরে গেলে নিজে হেঁটে এই কলাই ফুট মানিক দোহায় দিয়ে আসবেন এবং ছেলেকে মানিক দোহায় গোসল করিয়ে নিয়ে আসবেন।

যশোর জেলার বাঘারপাড়া থানায় মানিক দোহা। নানা বাড়ি থেকে তা প্রায় ৭/৮ মাইলের রাস্তা। ছোটমামার সমস্যা সেরে গেলে নানী আর ছোটমামা নাকি পায়ে হেঁটে মানিক দোহায় গিয়ে মান্নত পুরুণ করেছিলেন। এখনও বলেন শুধু নানী। অনেকই নাকি খুব ভালো ফল পেয়েছিলেন। 

বয়সের সাথে বলা যেতে পারে অনেকটা প্রাকৃতিক নিয়মেই মানুষের ভিতর নানান কৌতূহলের জন্ম নেয়। ঠিক তেমনটাই হয়েছিল আমার ভিতর। আমার একটা মাত্র খালামণি। আর তাইতো খালামণির যাওয়া হতো খুব। বাড়ির কাজ কর্ম গুছিয়ে নানী আর মা জোট বেধে এক সাথে বেড়াতে যেতেন খালামণির বাসায়। আর আমি তো ছিলাম একটা কমন পারসন। ক্লাস টেনে উঠে মায়ের বিছানা ছেড়েছি। ইন্টার পাশ করবার আগ পযর্ন্ত মায়ের মাখানো ভাত খেয়েছি। মাকে ছেড়ে কখনও এক মুহুর্ত থাকতে পারতাম না।

তখন আমি কিছুটা বুঝি। ভ্যানে যাচ্ছিলাম খালামণিদের বাসায়। আমি মা, নানী আর ছোট মামা। নানা একটা ভ্যান রিজার্ভ করে দিলেন বাড়ি থেকেই। নানী বাড়ি থেকে বের হবার সময়ই মাকে গুনগুন করে বলছিলেন কোনও কিছু। এবং আমি দেখলাম নানী একটা ব্যাগে একটা তোয়ালে নিলেন। রাস্তায় গিয়ে বুঝতে পারলাম কারণটা। আমার মায়ের পায়ে একটা ফাটা রোগ আছে। শীত কালে পায়ের গোড়ালী ফেটে চৌচির হয়ে যায়। লেপের ভিতর পা দিতে খুব সমস্যা হয়। শুধু শীতকাল বললে ভুল হবে গরম কালেও পায়ের পা ফেটে থাকে। নানী ফন্দি এঁটেছেন মাকে মানিক দোহার পানিতে নামিয়ে পা ধোয়াবেন। আর সেজন্যই বাড়ি থেকে তোয়ালে ব্যাগে ভরেছেন। শুনে মনের ভিতর একটা ভালো লাগা তৈরি হলো। নিজের চোখে মানিক দোহা দেখবো।

সেদিন কেমন যেন পথই ফুরাতে চাচ্ছিলো না। অবেশেষে ঠিক মানিক দোহার সামনে দিয়ে ভ্যানটা থামালো। নানী মাকে নিয়ে গেলেন। আর পিছন পিছন আমি আর ছোট মামা গেলাম। নিজে চোখে দেখলাম মানিক দোহা। অনেক বড় একটা জায়গা জুড়ে বসে আসেন মানিক দোহা। চারিদিকে নানা রকমের গাছপালা। ভিতরে নৌকায় করে ডুঙ্গায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অনেক মানুষ। কেউ বা গরু মহিষ গোসল করাচ্ছেন। আশপাশের ছেলে মেয়েরা আরামছে হৈল খেলে বেড়াচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে দারুণ লাগছিলো। মার খুব ভয়। নানী হাত ধরে মাকে একটু পানিতে নামিয়ে পা ধোয়ালেন। পরে তোয়াল দিয়ে মুছে আবার ভ্যানে গিয়ে বসলাম সবাই। নানীর অগাদ বিশ্বাস দেখে আমিও ভেবে নিয়েছিলাম হয়তো মায়ের পা ফাটা রোগটা সেরেই যাবে এবার।

কিন্তু তখনও একবারও মনে আসেনি সেই ভাবনাটা যে আসলে কিভাবে এই মানিক দোহার জন্ম। খালামণির বাসা থেকে ফিরে এলাম। এভাবে যখন যেতাম মনে করে তাকিয়ে দেখে আসতাম মানিক দোহাকে। যাইতে ফিরতে দুইবার। পরে ছোটমামা একটা বাইক কিনলেন। আমি বাইকে যেতাম খালামণির বাসায়। মামাদের খালে প্রচুর মাছ ধরা পড়তো শীতের সময়। খালামণিকে দিতে যেতাম আমি। প্রায়ই খালামণিকে আনতে যেতাম বাইকে করে। দেখতে ভুলতাম না মোটেও মানিক দোহাকে।

তারপর বেশ কয়েক বছর আর ঐ পথ দিয়ে যাওয়া হয়ে উঠেনি। অন্যরাস্তা দিতে যেতাম। ঠিক সাত বছর পরে এইতো সেদিন মামার বাইক নিয়ে গিয়েছিলাম খালামণির বাসায়। সকালে গিয়ে বিকালে ফিরছিলাম। যাবার আগেই আমার প্ল্যানে ছিলো মানিক দোহায় গিয়ে অনেক কিছু জানতে চেষ্টা করবো। আর তাইতো বাসা থেকে বের হবার সময়ই ঘাড়ে ক্যামেরা ঝুলিয়েছিলাম। যাবার সময় আর মানিক দোহায় থামলাম না। বিকালে ফেরার পথে বাইকটা রাস্তার পাশের রেখেই গুড়ি গুড়ি পায়ে এগিয়ে গেলাম মানিক দোহার একদম পানির কাছে। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছিলাম আর আশে পাশের কোনও একজন মুরব্বী লোক খুঁজছিলাম যার কাছে মানিক দোহার একটু গল্প শুনবো। আল্লাহুর ইচ্ছায় মিলেও গেলো। একটা মুরব্বী লোক এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। আমি ঘুরে কিছু জিজ্ঞস করবরা আগেই চাচা জিজ্ঞেস করে বসলেন ,”বাবা তোমার বাড়ি কোথায়?” আমি বললাম। উনি বললেন, তুমি কি সাংবাদিক নাকি বাবা। আমি হেসে বললাম ”না চাচা আমি কোনও সাংবাদিক নয় এই টুকি টাকি একটু লেখালেখি করি। উনি বললেন ভালো বাবা লেখালেখি করা খুব ভালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, চাচা আমাকে একটু সময় দিবেন। চাচা বললেন, কেন দিবো না বাবা। কি বলো।

আমি বললাম, চাচা এই মানিক দোহার আসল কাহিনীটা কি? আসলে কিভাবে এলো এই মানিক দোহা। আগে নাকি এই জায়গায় মাঠ ছিলো। উনি বললেন, হ্যাঁ মাঠ ছিল এখানে এবং মাঠের পাকেন একটা বাগান ছিল। এই মাঠে গ্রামের লোকজন গরু ছাগল চরাতে আসতো রোজ। তার পর তাদের মধ্যে এক ছেলের নাম ছিল মানিক। তবে মানিক এ গ্রামের কোনও ছেলে নয়। ওরা এখানে এক বড় বাড়িতে হাইলো থাকতো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই হাইলো টা কি? উনি বললেন, ঐ যে এখানে পেটে ভাতে থাকতেন। আর মালিকের গরু ছাগল মাঠে চরিয়ে বেড়ানোই ছিল ওর একমাত্র কাজ। তা একদিন ঐ মানিক ঠিক প্রতিদিনের মতই মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন। হঠাৎ একদিন সে লক্ষ্য করলো তার গরুর পালের একটা গরু রোজ একবার করে মাঠের পাশের বাগানের ভিতরে যায় আবার কিছু সময়পর তৃপ্তি মাখা মুখে ফিরে আসে আবার। হঠাৎ একদিন মাথায় আসলো মানিকের আসলে গরুটি কেন যায় ঐ বাগানের ভিতরে ? কি করে রোজ সেখানে গিয়ে? একদিন সে খেয়াল করে গরুটির পিছন পিছন বাগানের ভিতর গেলো। সেখানে গিয়ে দেখলো এক আশ্চর্য জিনিস। দেখলো একটা ছোট কুয়ার মত। সেখানে একদম স্বচ্ছ পানি। গরুটি সেখানে গিয়ে মনের সুখে পানি খাচ্ছে।পরিষ্কার কাচের মত পানি দেখে মানিকের মনে কৌতূহল জাগলো আসলে ওটা কি? মন চাইলো পানির গভীরতা মাপার জন্য। গরুটির মুখ সরিয়ে হাতের লাঠি দিয়ে পানির গভীরতা মাপতে। মুহুর্তের মধ্যে ঘটে গেলো এক অদ্ভুদ কান্ড। ঐ কুয়া থেকে পানি উঠতে উঠতে বিস্তুত জায়গা জুড়ে পানি আর পানি হয়ে গেল। পানির ভিতর হারিয়ে গেল মানিক ও তার গরুর পাল। অবাক হয়ে গেল আশ পাশের লোকজন। সাড়া পড়ে গেল সব জায়গায়।

আমি জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছ চাচা, এই মাঠে তো অনেক লোকেই গরু চরাতেন তো মানিকই যে এ কাজ করেছিলেন সেটা কিভাবে জানলো সবাই। চাচা বললেন, এই দোহার নাম প্রথমে মানিক দোহা ছিল না। এ কাণ্ড ঘটার কয়েকদিন পরে জানা গেল মানিকে আর তার গরুকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে লোকজন নিজের চোখে দেখলো মানিকের মাথার টুপি ও হাতের লাঠি পানিতে ভেসে আসে। ভেসে আছে গরুর গোবর ও গরুর লেজ। প্রথমে ভয়ে কেউই এ পানিতে নামতেন না। পরে আস্তে আস্তে মানুষ এখানে নামা শুরু করলো। গোসল করা শুরু করলো। গরু মহিষ গোসল করাতে লাগলো। এখন মানুষ মাছও ধরে এখান থেকে। ঐ যে দেখছেন না কত নৌকা আর ডুঙ্গা। তারপর বছরের নির্দিষ্ট একটা দিনে এই দোহার পানিতে ভেসে উঠতো মানিকের মাথার টুপি আর লাঠি সঙ্গে গরুর লেজ আর গোবর। আবার ডুবে যেত। এখন আর দেখা যায় না। আর ভাসে না সেগুলো। এসব মানুষের জন্যই। মানুষের অকর্মের জন্যই সব বিলীন হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম চাচা আপনি এই গল্প কার কাছ থেকে শুনেছেন? চাচা আবেগী মন নিয়ে বললেন ”আমার বাপ দাদার মুখে শুনেছি।” আচ্ছা চাচা উনাদের কাছে যখন শুনতেন এই গল্পটা তখন কি একবারও জানতে চেয়েছেন- তারা এই গল্পটা কার কাছ থেকে শুনেছিলেন?

চাচা বললেন উনারাও বলতেন উনারা উনাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকেই শুনেছিলেন। রোজ কত মানুষ যে আসেন বাবা এখানে মান্নত দিতে। অনেক বালা মুসিবাদ থেকে মুক্তি পায় মানুষ এই মানিক দোহায় মান্নত করে।

আর সামনে বাড়ালাম না। চাচার মুখের গল্পটা কেমন যেন কাল্পনিক দিকে যাইতে ছিল। চাচার সাথে কথা শেষ করে চলে আসলাম ।

পিডিএসও/রিহাব