জয়ের শীর্ষে নারী

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ১৭:৩৬

সাহিদা সাম্য লীনা, লেখক

নারী নামক অবলার গুগলটা বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে। তার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের নারীদের পূর্বের চিত্র। আজকে নারীকে নারী বললে ভুল হবে। আজ অনেকটা নারী মানুষ হতে পারছে। নারীর মূল্যায়ণ বেড়েছে। নারীকে অবলা বলাও বন্ধ হয়েছে ৮০%। বাকি সময়ের অপেক্ষা। যেসব নারী বঞ্চিত হয়েছেন তাদেরও সামনে এনে উৎসাহিত করা হচ্ছে নানা ভাবে!

যেমন, পঞ্চাশ ,ষাট, সত্তর দশকে জন্ম যাদের তারাও মর্যাদা পাচ্ছে কোনো না কোনোভাবে। সে বিষয়ে আসছি পরে। 

একসময় নারীদের রাখা হতো নির্জন আঁধারে। বলা হতো অন্দরবাসিনী। সহজে দেখা মিলা ছিল দুঃসাধ্য। এর মধ্যে অনেকে আড়াল থেকে উঁকি দিয়েছেন সংগ্রাম করে তিলে তিলে। অনেকটা উন্নত পরিবেশ যারা পেয়েছেন তারা হয়তো এই জাল থেকে বের হয়ে ছিলেন খুব সহজে। আবার অনেক ভালো পরিবার ছিল কুসংস্কারে আবদ্ব। যেমন বেগম রোকেয়া ভালো পরিবারের মেয়ে হয়েও তাকে লেখাপড়ার জন্য লড়তে হয়েছিল। সেসময় নারীদের লেখাপড়া করা বা বাইরে যাওয়া ছিল রীতিমতো নিষিদ্ধ। যদিও কখনো নারীরা বাইরে যেতে হতো তাও আত্বীয় বাড়ি বেড়াতে বা অন্য সব কারণে তখন বিশেষ ব্যবস্থায় নারী বাইরের উন্মুক্ত পথ পাড়ি দিতেন। 

আমাদের নোয়াখালি অঞ্চলে সেই বিশেষ ব্যবস্থা ছিল রিকশার চারিদিকে কাপড় পেঁচিয়ে ঢেকে রাখা হতো।  সেই কাপড় ছিলো কিন্তু ঐ নারীর বা ঘরের আর কারো। রিকশাওয়ালাকে আগেই কাপড় দিতো যাত্রী উঠার আগে। ঢেকে দিবার পর রিকশাওয়ালা এক পাশে সরে যেতেন। তখন যাত্রী এসে রিকশায় উঠে বসতো। এভাবে নামার সময়েও রিকশাওয়ালা সরে যেতেন। এমনি ছিলো নারীর চলাচল। কতনা বদ্ধ খাঁচা থেকে আজকের নারীদের উত্থান। সে কথা আধুনিক নারী কল্পনাও করতে পারবেনা; যত না ভেবেছেন, ভুগেছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সহ তখনকার নারীরা। মা,খালা,দাদী নানীদের মুখে সেসময়ের অন্দরবাসিনীর কাহিনী শোনা রীতিমতো রোমঞ্চকর। 

অসম্ভব ভয়ানক সময়গুলো, নারীরা তখন ডিঙ্গিয়ে এসেছেন। তবে অভ্যস্ত হতে হয়েছিলো নারীদের তখন। তাই দিনাতিপাত সহজ হয়েছিলো। কঠিন প্রথাগুলো থেকে বের হয়ে আসাটা আসলে একটা চ্যালেঞ্জ আমরা মনে করি। নারীদের সাফল্য যে একদিনে হয়নি। তিলে তিলে রন্দ্রে রন্দ্রে নারী তার স্বপ্ন খুঁজেছে দিগন্তে । বদ্ধ খাঁচার পাখি স্বাধীন হলে কেমন লাগে। তেমনি নারীরও তার জীবন মনকে স্বাধীন রসে ঘুরতে দেখে নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে। সেই প্রথম নারীটি এই উপলব্দির প্রথম পাঠকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকারী নারী,পরবর্তীতে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নারী, যাদের পথ রেখায় অবতীর্ণ হাজার নারী। খোদ নব্বই দশক পর্যন্ত এ দেশে নারী শিক্ষা এতো গণহারে কম ছিলো যে, মেয়ে মানুষ লেখাপড়া করানো মানেই হচ্ছে অযথা টাকাপয়সা ফেলা। রান্নাবান্না.ঘর-গৃহস্থালি,স্বামী-সংসার-সন্তান সামলানো নারীর জন্য বরাদ্দ ছিলো। এই ঘোর থেকে নারীদের মুক্তি দিয়েছে একসময় আমাদের সমাজপতিরাই। মিডিয়াবান্ধব হয়ে উঠে প্রতি ঘরে ঘরে। অপারেশন সার্চ লাইট চলে শিক্ষার উপর। চলে অনুকরণ ও বাড়তে থাকে সচেতনতা মেয়েদের লেখাপড়া শিখানোতো। 

এখন গ্রামের কোনো মেয়ে লেখাপড়া ছাড়া নেই। বাল্য বিবাহও কমে গেছে অনেক। মেয়েরা এখন টিভি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখে অনেক সচেতন বিয়ের ক্ষেত্রে।  একজন নারী যা পারে এবং তার সক্ষমতা ও আইকিউ একজন পুরুষ অপেক্ষা বেশি তাও প্রমাণিত হয়। নারীদের নিয়ে আশার আলো দেখেছেন কবি সাহিত্যিকগণ। লেখকের প্রেরণা, শক্তি আর উৎসাহের গাঁথুনিতে নারীদের নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনায় ফুটে উঠেছে নারীর শৈল্পিকতাও। পুরুষের সাথী, সহকমীর্, লক্ষী সে তো নারী। আমরা সাহিত্যিকদের অনেক লেখায় পাই নারীদের অবদান কোনো অংশে কম নয়। এক্ষেত্রে কবি সাহিত্যিকরাও সমাজের চোখে আঙ্গুল তুলে বলে দিয়েছে নারীদের অধিকারের কথা।

যে নারীর হাতে খুন্তি, সে নারীর হাতে এখন পিস্তল-রাইফেল, একটি দেশের নেতৃত্ব!  রিকশা-বাস-বাইক, ট্রেন। উড়োজাহাজ চলে নারী পাইলটের মাধ্যমে, খেলাধুলায় অংশ নিয়ে দেশ ও বিদেশে করছে সুনাম ও সোনা-রুপার ম্যাডেল জয় করছে।  নারী উদ্যোক্তা এখন রাজধানী ছাড়িয়ে জেলা-উপজেলায়। অনেক নারী ম্যাজিস্ট্রেট দেখা গিয়েছে সেই আশির দশক হতে! রাজনীতির প্রধান পথ হতে শুরু করে আজ স্পিকার নারী। মানবাধিকার নেত্রী নারী। বাংলাদেশের প্রথম নারী সি.এ সুরাইয়া জান্নাত। সেটি ১৯৮৪ সালের কথা। এখন সেই সংখ্যা গুণাতে হয়না। নারী ব্যাংক কর্মকর্তা এখন ভুরি ভূরি দেশের প্রতিটা ব্যাংকে।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পুলিশে প্রথম নারী পুলিশ সদস্য করার তাগিদ দেন। আজ থেকে এক যুগ আগে থেকে নারী পুলিশ দেশের বাইরে বিশেষ করে হাইতি,কঙ্গোতে নারী সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কমিটিতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছে। নারী বান্ধব বাংলাদেশ এখন সময়ের দাবী। বেশ কিছু দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে নারীর জয়জয়কার দেখা মিলবে শীঘ্রই। চ্যালেঞ্জিং পেশা সাংবাদিকতায় নারী । সারাদেশে মোট আটশ নারী সংবাদকর্মী রয়েছে। একসময় নারী সাংবাদিক দেখলে মানুষ চোখ কপালে তুলতো। এখন সেটি স্বাভাবিক পর্যায়ে গেছে।অন্য ৮/১০ টা পেশার মতোই এখন নারী সাংবাদিকতা!

বিভিন্ন চ্যানেলে নারী সাংবাদিক নিয়োগ আগের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। তেমনি প্রিন্ট মিডিয়াতে নারী সাংবাদিক কাজ করছেন। কেউ মাঠ পর্যায়ে খবর তুলে আনছেন। কেউ আবার অফিসিয়াল পোষ্টে রত আছেন। টিভি চ্যানেল খুললেই অনেক নারী নিউজ প্রেজেন্টার চোখে পড়ে। অধিকাংশ চ্যানেলে খবর পাঠিকার খবর শুনতে আগ্রহী দর্শক। সাজ-পোশাক , আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে নারীরা বীরের বেশে কাজ করে যাচ্ছেন মিডিয়া হাউজ হতে শুরু করে কর্পোরেট হাউজ,সরকারী-বেসরকারী সংস্থায়। 

নারীদের শ্রম,মেধার মূল্যায়ণ ঘটছে প্রতিনিয়ত।  আজকের নারী এগিয়ে চল এই শ্লোগান ধারণ করে প্রাণ আচার প্রতিযোগিতা, রাঁধুণী হাউজের আয়োজনে রান্নার উপর প্রতিযোগিতা,মিজান মালয়শিয়ান সেরা রাঁধুণী, এমন কিছু তাক লাগানো অনুষ্ঠান সেসব নারীদের জন্য যারা ছিলেন পরিবার এবং পারিপার্শি¦ক চাপে ঘরকুণো তাদের মূল্যায়ন। 

অর্থাৎ পঞ্চাশ, ষাট দশকের নারীদেরও আনা হচ্ছে এতে। সব বয়সী নারী সুযোগ পাচ্ছে এইসব প্রতিযোগিতায়।  তারা ঘরে আপনজনদের জন্য যা করেন তার একটা প্রাপ্য সন্মাণ ও স্বীকৃতি প্রদান এইসব আয়োজকদের উদ্দেশ্য এবং দেশীয় খাবার ও বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের চিত্র উপস্থাপন শৈল্পিকতায় এটাও  মুখ্যতা। নারী তার পারদর্শিতা সেখানে বিচরণ করেও দেখাচ্ছে।

এভারেস্ট জয় করছে নারী। নিশাত মজুমদারের পরই বেরিয়ে আসছে আরো কিছু আলোকিত মুখ। সব পথের একটা শুরু থাকে। নারীদের সূচনা তেমন একজন নারীর পথ ধরেই। বেগম রোকেয়া থেকে প্রীতিলতা মুৎসুদ্দি, নুরজাহান বেগম, সুফিয়া কামাল,বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ।  একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধেও নানা কাজে নারী মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে অংশ নিয়েছেন। প্রথম প্রথম এই বিষয়টা অনেকটা আড়ালেই ছিলো। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় এই সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। শহীদ হয়েছেন একমাত্র নারী সাংবাদিক বুদ্ধিজীবি সেলিনা পারভীন। ভাষা আন্দোলনে বহু নারীর অবদান অনস্বীকার্য।

আর্কাইভে দেখা যায়, ৫২এর ভাষার দাবি নিয়ে রাজপথে আন্দোলন রত নারীদের ব্যানার হাতে সামনের কাতারে। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন  রওশন আরা বাচ্চু। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীরা পোস্টার বানিয়ে রাস্তায় নেমেছে! মিছিল মিটিং করেছে! বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলছে। ঢাকা মেডিকেলের ছাত্রীরা আহতদের চিকিৎসায় এগিয়ে এসেছে! জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক পরিচিত -অপরিচিত পুরুষ যোদ্ধাকে ঘরে আশ্রয় ও রান্না করে খাইয়েছেন নারীরা। 

বলা যায়, পুরুষের সহযোদ্ধার ভূমিকায় নারীর অবদান বেশ পুরনো!। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে নানারকম বিপর্যয় থেকে নারীরা পুরুষকে বাঁচিয়েছেন। আজ গার্মেন্টস,কল-কারখানা, শিল্পে যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে তার পিছনে নারীদের অসামান্য শ্রমের অবদান রয়েছে। নারীর জয় হোক। নারীর আরাধ্য স্বপ্ন এখন সফলতার দুয়ার ছুঁই ছুঁই !

পিডিএসও/রিহাব