মাহবুব আলতমাস আমাদের আইডল

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৮, ১৭:২৩

সাহিদা সাম্য লীনা, লেখক

মানুষ কিছু শিখে জন্ম নেয়না । জগতে এসে ধীরে ধীরে শিখে, জীবনের নানা উপমা, ছন্দ,বাঁক। সব মানুষ গুণী হয়ে জন্ম নেয়না। কিছু কিছু গুণীকে সৃষ্টিকর্তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখেন। তাই তারা জগতের গুণীজন স্বীকৃতি নিয়েই এ জগতের মায়া ছাড়েন।

ফেনীর সাহিত্যকাশের যে ক’জন গুণী তার মধ্যে অন্যতম কবি মাহবুব আলতমাস। প্রথমে একজন মানুষ, শিক্ষক, কবি তারপর বোদ্ধা। সর্বোপরি এক বর্ণাঢ্য জীবন অতিবাহিত করে পরপারে পাড়ি জমালেন তিনি। লিখেছেন দুহাতে। গল্প, উপন্যাস, নিবন্ধ, প্রবন্ধ। সংবাদ রচনায়ও কৃতিত্ব এই মানবের এক বিশেষ গুণ। ফেনীর সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য তার অবদান অনস্বীকার্য।  

মাহবুব আলতমাস মানেই ফেনীর সাহিত্য; মাহবুব আলতমাস মানেই ফেনীর সংস্কৃতি। ফেনীর বর্তমান সাহিত্যের এই ধারা তার মাধ্যমেই গঠিত হয়েছে। মুলধারার লেখার জোয়ার তিনি না হলে হতোনা। তরুণ লেখকদের তিনি বড্ড ভালোবাসতেন। বইমেলা এলে লাফাতেন! কি যে আনন্দ আসছে যেন, খিল খিল করে হাসতেন। হাসিটা তার যেন মেইন উপকরণ। বই বের করবেন কি করবেন না সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় কষ্ট হতো। বই বের করার খুব ইচ্ছা। কিন্তু টাকার জন্য পারতেন না । যে কটা বই বের করেছিলেন প্রায়ই এদিক সেদিক করে কষ্ট করে করেছেন। ‘জনকের প্রতিকৃতি ও কবিতা’ বইটা বের করে খুব উৎফুল্ল ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এই বই-এ বেশ কটা কবিতা লিখেছেন। চমৎকার চয়নে। একদিন আমাকে বললেন, এই বইটা আমি প্রধানমন্ত্রীর জন্য পাঠাবো। পরে আর জিজ্ঞেস করবো করবো করা হয়ে উঠেনি যে, তিনি বইটি পাঠাতে পেরেছেন  কিনা। 

বই মেলার প্রাঙ্গন মুখরিত করতেন একমাত্র তিনিই। কারো বই বের হলে মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থা করতেন। অতিথিকে দাওয়াত দেয়া, লেখকের পরিতৃপ্তি অনুযায়ী প্রচারের  ব্যাপারেও মুখ্য ভূমিকা নিতেন। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজে চোখটা বুলানো তার প্রিয় একটা নেশা ছিল । সব বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন। পড়তেন যে বেশি তাও বোঝা যেত। তবে বেশ আড্ডাবাজ ছিলেন। ফেনীর নির্দিষ্ট কিছু জায়গা তার আড্ডার স্থান ছিল। 

ফেনীর আপামর না হলেও মিডিয়া ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন ধ্রুপদী নায়ক ছিলেন এই কবি মাহবুব আলতমাস। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতো। হয়তো কেউ কোনও কারণে অকসমাৎ, কথা না শুনলে বলতেন এই হার্মাদ। আমাদের তরুণ সংবাদকর্মী, লেখক, সাহিত্যিকদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ শাহাদাত হোসেন তৌহিদ। তৌহিদ কবিকে দুলাভাই ডাকতো। কবি এই ডাকে যেন রোমাঞ্চ অনুভব করতেন। হার্মাদ  এই একটা ধমকে সবাই তার কাছে মাথা নত করতো। কড়া কড়া কিছু কথা বলেই আবার হাসি। দুর্দান্ত! এক যুবক যেন। পৌঢ় চিন্তা তার মনে কখনো বাসা বাঁধেনি। শক্ত সামর্থ এক জোয়ান । মৃত্যুর কদিন আগেও তেমনই ছিলেন। নিজেই সব করতেন। খাওয়া, গোসল, লেখালেখি সব। 

হঠাৎ দৈব মেঘ তার রাঙা জীবনে আঘাত হানে। প্রিয় একমাত্র ছেলে বাবু মারা যাওয়া যেন তিনি সইতে পারেননি। যন্ত্রণার আগুনে তিনি মাস ছয়েক ছটফট করেছেন। যখন ফোন আসতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। পরিবারের  শোক কবির ভেতরে ভেতরে এক অনিবার্ণ শিখা হয়ে  জ্বলছিল। তারপরেও  জেগে উঠতেন। মাতাতেন ফেনী শহরকে। 

কবি আসবেন বারবার আমাদের মাঝে । কবি থাকবেন  চিরতরে বুকের ঘরে নীরব সুরে । কেউ কবিকে মনে রাখুক আর নাই রাখুক  সাম্য তাকে খুঁজবে অন্ধকারেও বাতি জ্বেলে। তিনি ছিলেন আমার শক্তি, আমার সাহস, বল।  তিনি ছাড়া কোনও অনুষ্ঠানে হয়তো আমাকে ভীরু ভীরু মন নিয়ে থাকতে হবে। কেউ আমাকে আর তাড়া করবেনা এখানে যাও, ওখানে যাও। যেতে হবে তোমাকে। সুজনের সন্মেলনে, পিটিআই মাঠে পোয়েট সোসাইটির পোগ্রামে।  সাংবাদিকতায় পরিপূর্ণ হতে তোমাকে অনেক কিছু শিখতে হবে। আর বলবেন না এসব।  উনার তাড়ায় ভাল জামা না পরে গেলেও রাগ করতেন। দেরি হলেও রাগ করতেন। সুন্দর জামা পরলে ভীষণ খুশি থাকতেন। সবুজ শাড়িতে একবার সুন্দর লেগেছিল বলে কবিতা লিখেছিলেন আবার তা ফোনে পাঠ করেও শোনালেন। আমি মাঠে কাজ করি মফস্বলে কলম সৈনিক ভূমিকায় তিনি বেশ প্রাউড ছিলেন এতে। নারীদের চ্যালেঞ্জিং পথ তৈরির মোটিভ আমার মধ্যে স্বপ্ন দেখতেন। বলতেন অনেক কে এমন কিছু সাম্যকে বলবেনা যাতে ওকে ঘরে ঢুকে যেতে হয়। আবার কোনও যুবকের হৃদয়ে বসতে না পারি তাতে ছিল তার মৌন আপত্তি। ২০১৭ তে কোনও ঘটনা কারো কাছে শুনে তিনি তাই ভেবে আকুল ছিলেন। ছুটে আসলেন একাই আমার বাসায়। নানা কথায় বোঝালেন উনার যে ইর্ষে হচ্ছে ! আবার আমার নৈতিকতায়ও আশ্চর্য হতেন। পুরুষের সাথে কাজ করেও আমার স্থির, ধৈর্য দেখে, কিভাবে কোনও অনাকাঙ্খিত গসিপ ছাড়া কাজে এগুনোকে। তাই বুঝি একদিন দেখতে চেয়েছেন আমার বরকে। কেমন লোকের বৌ আমি! আগলে রাখতেন তাই আমার নীতিটাকে স্যালুট করে। মাঝে মাঝে হেসে আবার একটু ভয়ে বলতেন তুমি আমার তো বান্ধবী, আমার সাথেই প্রেম করো। রিপ্লে দিতাম উমপ! আপনি বুড়ো! তখনি রেগে যেতেন। বুকে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলতেন আমাকে কি তোমার বুড়ো মনে হয়? অভিমান করতেন, বলতাম না....আপনি অনেক ইয়ং! খুশিতে আটখানা হয়ে যেতেন। ফেনীর সময়ের স্টাপরা বলতো কি হয়েছে? বুড়া এটা আপনার পিছনে ঘুরে কেন! কবি তখন যা রোমান্টিক হাসতেন। তখন তিনি যেন ত্রিশ বছরের যুবক হয়ে যেতেন। এমনই ছিলেন কবি। তিনি আসলে এগুলো করতেন আমাকে কারো নজরের বাহিরে রাখতে। আবার গসিপ ছড়ানো যাতে না  হয় সতর্ক ছিলেন।

কবি থাকবেন  চিরতরে বুকের ঘরে নীরব সুরে। সব কিছুই মিস করবো কবি। ফেনীর সব অনুষ্ঠানে আপনি আমার ছায়া হয়ে থাকবেন। আপনার আত্বা আমাকে পাহারা দিবে। আপনি আমাদের আইডল। আইডল হয়েই সমসময় বেঁচে থাকবেন। অনেক শিখেছি আপনার কাছে। এখন আপনার বইগুলোই আমাদের সম্বল।

পিডিএসও/রিহাব