১১ বছরেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি হাসপাতালের

‘আর এক বচ্ছর গেলেই তো এক যুগ পার’

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৭, ১৩:৫০

পাঠান সোহাগ

দীর্ঘ ১১ বছরেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি রাজধানীর মিরপুরের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের। ২০০৬ সালে শুরু হওয়া কাজ ২০০৯ সালে নানা অনিয়ম ও ত্রুটির কারণে বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সে সময় দাঁড়িয়ে থাকা ছয়তলা ভবনটি এখনো ওই অবস্থাতেই রয়েছে। দরজা-জানালা লাগানো হয়নি। পলেস্তারাও পড়েনি ভবনগুলোর গায়ে। উল্টো দেখভালের অভাবে হাসপাতালের জায়গায় গড়ে উঠেছে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ির গ্যারেজ ও গরুর খামার। চলে ছিনতাই-খুনখারাবিও। চিকিৎসকদের আবাসিক ভবনে অবৈধভাবে থাকছেন আনসার সদস্যরা। নির্মাণাধীন ভবনে চলছে নানা অসামাজিক কাজ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৬ সালে রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর মাজার রোডের লালকুঠিতে ২ দশমিক ৩ একর জমিতে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মূল হাসপাতাল ভবনসহ চারটি ভবন ছয় তলা পর্যন্ত তৈরি হওয়ার পর ২০০৯ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ভবনের নকশা পরিবর্তনের অভিযোগে নির্মাণকাজ মাঝপথে বন্ধ করে দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, ছয় তলাবিশিষ্ট একটি মূল ভবন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোয়ার্টার নির্মাণের জন্য ১৯ কোটি ৪২ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ৪০ লাখ টাকা আসবাব কেনার জন্য বরাদ্দ ছিল। কিন্তু চারটি ছয় তলা ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের কাছে নকশা পরিবর্তনের বিষয়টি ধরা পড়ে। তখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সূত্র আরো জানায়, সম্প্রতি নতুন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছয় তলা মূল হাসপাতাল ভবনের জায়গায় ১০ তলা ভবন, ১০০ শয্যার পরিবর্তে ২০০ শয্যার হাসপাতালসহ অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনে প্রকল্প পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে কাগজপত্র জমা দিয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা। ভবনগুলো নতুনভাবে মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদফতর।

এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপপরিচালক (সার্ভিসেস) ডা. ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদ প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এ কাজ মূলত একনেক থেকে মন্ত্রণালয় হয়ে প্রকল্প পরিচালক ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ হয়ে তাদের কাছে আসে। তারপর মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জনসাধারণের সেবার জন্য হাসপাতাল হস্তান্তর করা হলে এর পর থেকে তারা দেখভালের দায়িত্ব পান। সুতরাং, অবকাঠামো পূর্ণাঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালের বিষয়ে তাদের কিছুই করার থাকে না। এ ব্যাপারে তিনি প্রকল্প পরিচালক ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন।

বিগত ছয় মাসে সরেজমিনে কয়েকবার গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের মূল ফটকের জায়গা দখল করে চা, লন্ড্রি ও জুয়েলার্সের দোকান বসানো হয়েছে। ভবনের নিচে ও বাউন্ডারি ঘেঁষে ভেতরে তৈরি করা হয়েছে গরুর খামার। যেখানে চড়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকটি গরু-বাছুর। গোবর-চনা ও আবর্জনায় চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আর সন্ধ্যার পর থেকেই এলাকাটি পরিণত হয় ‘বিশাল গ্যারেজে’। রিকশাভ্যান, বাস, ট্রাক, লরি ও লেগুনায় ভরে যায় পুরো জায়গা।

লালকুঠি এলাকার স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেসমেন্টের (গ্যারেজের জন্য নির্ধারিত স্থান) দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় বৃষ্টির পানি ও মলমূত্রে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। দূষিত পানি জমে থাকায় মশার বংশ বিস্তার বাড়ছে। ভবঘুরে ও নেশাখোররা রাতে ভবনের বিভিন্ন কক্ষে অবস্থান নেয়। বসে মাদকের আড্ডা। চলে অসামাজিক আরো নানা কর্মকাণ্ড।

হাসপাতালের মূল ফটক ঘেঁষে দোকান গড়ে তুলেছেন রফিক মৃধা নামের এক ব্যক্তি। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে দোকান চালান। রফিকের স্ত্রী জানান, এখানে প্রতিনিয়ত বখাটে, ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের নানা কার্যকলাপ দেখতে হয়। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় নানা অসামাজিক কাজ। প্রায়ই চলতি পথে নিরীহ মানুষের সর্বস্ব কেড়ে এখানে ভাগবাটোয়ারা করে ছিনতাইকারীরা।

রাস্তার পাশের আরেক দোকানদার মো. সজিব মিয়া বলেন, ‘এগারো বচ্ছর তো পার হয়া গেল, আর এক বচ্ছর গেলেই তো এক যুগ পার। বিএনপি আমলে হাসপাতালের কাজ শুরু হইছিল; কিন্তু ক্ষমতা বদলানোর পর শেষ টাইমে কাজ আটকায়া গেল। বিএনপি আবার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত হয়তো এর উদ্বোধনই হইবো না।’

তিন বছর ধরে এখানে খামার করছেন ফরহাদ সরকার। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জায়গাটি দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকার পর প্রায় তিন বছর ধরে গরুর খামার করছি। ছোট বড় মিলিয়ে দশটি গরু আছে।’ তিনি আরো বলেন, প্রতিষ্ঠানটির গ্যারেজে নিয়মিত পুকুরের মতো পানি জমে থাকে। সেখানে মৌ নামে এক শিশু ডুবে মারা যায়। ভবনের ভেতর জনৈক সামছুর রহমান ছাড়াও অজ্ঞাত আরো দুজনের লাশ পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে আরো দেখা যায়, চিকিৎকদের জন্য বানানো আবাসিক ছয় তলার ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বিগত কয়েক বছর ধরে দারুস সালাম থানার ২৬ জন আনসার সদস্য থাকছেন। সেখানে পানির ট্যাংক বসিয়ে সিঁড়িতে গোসলখানা ও কাপড় ধোয়ার কাজ করছেন। পাশাপাশি দেয়াল ফুটো করে বিপজ্জনকভাবে বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে আলোর ব্যবস্থা ও কক্ষের ভেতর হিটার ব্যবহার করে রান্নার কাজ করছেন।

পশ্চিম ব্লকের আবাসিক ভবনে ২০১০ সাল থেকে চার তলা জুড়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মিরপুর জোনের অস্থায়ী কার্যালয় করা হয়েছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কয়েকজন কর্মচারী পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

এ বিষয়ে সেখানকার সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আয়শা খানমের কাছে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় মিরপুর জোনের টিএফপিআই অলিউর বলেন, অধিদফতরের মিরপুর জোনের কোনো স্থায়ী কার্যালয় ছিল না। একটি ভাড়া বাসায় অস্থায়ী অফিসে কার্যক্রম চলত। পরে ২০১০ সালে মিরপুরে লালকুঠিতে বিল্ডিং খালি থাকা সাপেক্ষে অস্থায়িভাবে কার্যক্রম চলছে। আর ম্যাটারনিটি চাইল্ড হেলথের যে ভবনগুলো হচ্ছে তার সঙ্গে এটি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ফিল্ড সার্ভিসেস ডেলিভারি) নির্মাণাধীন ভবনটির বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. শামছুল করিম জানান, অনিয়ম ধরা পরায় কাজটি মাঝ পথে থেমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি অকেজো পরে আছে সত্য। তবে নতুনভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদফতর ভবনের কাজ করছে। তাদের নির্মাণকাজ শেষ করার পরপরই জনবল নিয়োগসহ হাসপাতাল চালু করা হবে। পাশাপাশি তিনিও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর এইচইডি বিভাগের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

এইচইডি বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। বলেন, বরং প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী ভালো বলতে পারবেন। এভাবে একাধিক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে সবাই কাজের ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এ ব্যাপারে কেউই দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি।

ঢাকা সিটি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, নকশা পরিবর্তনের জন্য কাজ বন্ধ হয়নি বরং এটি মূলত ডিপিপির কাজ ছিল। কাজ শেষ করার আগেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হেড অফিস থেকে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এখন শুধু ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে তাদের হাতে বুঝিয়ে দিলেই কাজ শুরু করা হবে।

পিডিএসও/হেলাল