দেশে প্রথমবারের মতো প্লাজমা সংগ্রহ শুরু

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২০, ০৯:০৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে প্লাজমা সংগ্রহ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) করোনাজয়ী চিকিৎসকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে এই প্লাজমা। করোনাজয়ী যে তিনজন চিকিৎসক প্লাজমা দিয়েছেন, তারা হলেন ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক দিলদার হোসেন বাদল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসক পিয়াস এবং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের আতিয়ার রহমান।

গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ও প্লাজমা থেরাপি সাব কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার এম এ খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, বেলা সোয়া ১১টায় শুরু করা হয় প্লাজমা সংগ্রহ। ঢামেকের (নতুন ভবন) ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে করোনাজয়ীদের প্লাজমা সংগ্রহ হয়েছে। তিন চিকিৎসকের দেহ থেকে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে এই প্লাজমা। সংগ্রহ করা প্লাজমা পরীক্ষা করে দেখা হবে এন্টিবডি কতটুকু আছে। পরে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হবে এই প্লাজমা। প্রাথমিকভাবে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪৫ জন গুরুতর অসুস্থ করোনা রোগীর ওপর আশা জাগানিয়া ‘প্লাজমা থেরাপি’ প্রয়োগ করা হবে। ‘প্লাজমা থেরাপি’ প্রয়োগের বৈজ্ঞানিক গবেষণার (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) কাজটি আগামী জুন মাসে শেষ হতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনায় আক্রান্ত গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সুস্থ করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশে প্লাজমা থেরাপির ব্যবহার শুরু হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের করোনায় আক্রান্ত গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সারিয়ে তোলার জন্য প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে গবেষণা করার (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলোজি বিভাগের অধ্যাপক এম এ খান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা রোগীদের সুস্থ করে তোলার জন্য প্লাজমা থেরাপির পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল শনিবার থেকে তা শুরু হয়েছে। প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কাজটি শেষ হতে পারে আগামী জুনে।

প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে কীভাবে করোনা রোগী সুস্থ হতে পারেন, সে ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেলের হেমাটোলোজি বিভাগের অধ্যাপক এম এ খান বলেন, প্লাজমা থেরাপি হলো শতবর্ষের পুরোনো চিকিৎসাপদ্ধতি। প্লাজমায় অনেক ধরনের অ্যান্টিবডি থাকে। যখন কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত হন, তখন সেই ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে তার রক্তে এক ধরনের অ্যান্টিবডি প্রোটিন তৈরি হয়। ওই প্রোটিন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের চারপাশে আবরণ তৈরি করে, যা ভাইরাস-ব্যাবটেরিয়াকে অকেজো বা নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। এভাবে অ্যান্টিবডি শরীরের ভেতর সক্রিয় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম ধ্বংস করে দেয়। এটাই হলো বেসিক মেকানিজম।

চিকিৎসকেরা জানালেন, করোনায় সংক্রমিত যাদের শ্বাসকষ্ট রয়েছে, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কমে গেছে, সেসব রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণত প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। করোনা যাদের ফুসফুস একেবার নষ্ট করে ফেলেছে, যাদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছে, এমন রোগীদের বেলায় প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগে খুব বেশি ভালো ফল আসছে না বলে জানতে পেরেছি।

তবে আইসিউতে নেওয়ার আগে করোনা থেরাপি প্রয়োগ করলে অল্প সময়ের ব্যবধানে রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। কারণ করোনাজয়ীর অ্যান্টিবডি করোনা রোগীর শরীরে গিয়ে ভাইরাসকে অকেজো করে দেবে। ফলে ফুসফুসে তীব্র সংক্রমণ (একিউট লাং ইনজুরি) হবে না। এসব রোগীর আইসিইউতে নেওয়া লাগবে না। এমনকি ভেন্টিলেশনও দেওয়া লাগবে না। তবে এমন না যে শতভাগ রোগীর ক্ষেত্রে এটা কাজ করবে। করোনার চিকিৎসায় কার্যকর উপায় না থাকায় বিশ্বে প্লাজমা থেরাপির ব্যবহার শুরু হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে ভালো ফল পেয়েছে চীন। ১০ জন করোনা রোগীর ওপর প্লাজমা থেরাপি চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করে প্রত্যেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সফলতা পেয়েছে ভারতও। প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগের অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও (এফডিএ)। করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য করোনাজয়ীদের কাছে প্লাজমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এফডিএর প্রতিবেদন বলছে, ‘আপনি যদি করোনাকে পরাজিত করে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি প্লাজমা দান করেন। আপনার প্লাজমায় করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি আরেকজন করোনা রোগীকে সুস্থ হতে সাহায্য করতে পারে।’

পিডিএসও/তাজ